October 6, 2026, 4:24 pm

জোর করে পদত্যাগ, চাকরি ফিরলেও কর্মস্থলে ফিরতে পারছেন না সহস্রাধিক শিক্ষক

বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে জোরপূর্বক পদত্যাগে বাধ্য হওয়া এমপিওভুক্ত স্কুল-কলেজের অধ্যক্ষ, প্রধান শিক্ষকসহ তিন হাজারের বেশি শিক্ষকের চাকরি ফিরিয়ে দিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। তাদের স্বপদে পুনর্বহালের নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে। তবে সরকারি আদেশের পরও প্রায় এক হাজার শিক্ষক এখনো কর্মস্থলে যোগ দিতে পারছেন না।

সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বর্তমান ম্যানেজিং কমিটি ও গভর্নিং বডির বাধার কারণে এসব শিক্ষক কাজে ফিরতে পারছেন না। অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, স্থানীয় রাজনীতি ও প্রভাবশালীদের হস্তক্ষেপও এর পেছনে রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। বিষয়টি শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে জানানো হয়েছে। মাউশিও এ নিয়ে তদন্ত শুরু করেছে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর দেশের বিভিন্ন বেসরকারি এমপিওভুক্ত স্কুল-কলেজে প্রায় ৩ হাজার ১০০ শিক্ষককে জোরপূর্বক পদত্যাগে বাধ্য করা হয়। পরে তাদের চাকরি ফিরিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়। এর মধ্যে প্রায় ২ হাজার ১০০ শিক্ষকের বেতন চালু হলেও প্রায় এক হাজার শিক্ষক এখনো বেতন পাচ্ছেন না এবং কর্মস্থলেও ফিরতে পারছেন না।

বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বেতন ইএফটির মাধ্যমে দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠান থেকে প্রতি মাসে তালিকা পাঠাতে হয়। কিন্তু অনেক প্রতিষ্ঠানের কমিটি ওই শিক্ষকদের নাম তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করছে না। ফলে চাকরি ফিরে পেলেও বেতন-ভাতা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন তারা।

জোরপূর্বক পদত্যাগের বৈধতা নিয়েও উচ্চ আদালতের গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ এসেছে। একটি মামলায় গত ১৩ সেপ্টেম্বর হাইকোর্ট জোর করে নেওয়া পদত্যাগপত্রের কোনো আইনি বৈধতা নেই উল্লেখ করে গাজীপুরের এক শিক্ষককে স্বপদে পুনর্বহালের নির্দেশ দেন। আদালতের নির্দেশ বাস্তবায়ন না করলে পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দেওয়া, সভাপতিকে অপসারণ এবং ভারপ্রাপ্ত প্রধানের এমপিও বন্ধের মতো ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও বলা হয়।

ধামরাইয়ের সুয়াপুর নান্নার স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ আনোয়ারুল ইসলাম তালুকদার জানান, সরকারি নির্দেশ ও আদালতের আদেশের পরও তিনি কর্মস্থলে যোগ দিতে পারেননি। শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও জেলা প্রশাসনের একাধিক তদন্তে তাকে জোরপূর্বক পদত্যাগ করানোর বিষয়টি উঠে এসেছে এবং তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগেরও প্রমাণ পাওয়া যায়নি। এরপরও গভর্নিং বডির বাধায় তিনি কাজে ফিরতে পারছেন না।

মাউশির আইন শাখার তথ্য অনুযায়ী, সারা দেশে অন্তত এক হাজার থেকে এক হাজার ২০০ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মবের ঘটনা ঘটেছে। কোথাও একজন, কোথাও একাধিক শিক্ষক লাঞ্ছিত ও জোরপূর্বক পদত্যাগের শিকার হয়েছেন। তবে এসব ঘটনার কোনো কেন্দ্রীয় ডাটাবেজ না থাকায় প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে।

মাউশির এক পরিচালক জানান, মবের শিকার হয়ে কতজন শিক্ষক এখনো প্রতিষ্ঠানের বাইরে রয়েছেন, তার সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই। বিচ্ছিন্নভাবে অভিযোগ পাওয়ার পর তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তাও জানিয়েছেন, সরকারি নির্দেশের পরও স্থানীয় ব্যবস্থাপনা কমিটি ও রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের বাধায় অনেক শিক্ষক কর্মস্থলে যোগ দিতে পারছেন না।

এদিকে চাকরি ও কর্মস্থলে ফেরার দাবিতে ভুক্তভোগী শিক্ষকদের পক্ষ থেকে তিন শতাধিক মামলা হয়েছে। উচ্চ আদালতেও রিট করেছেন অনেকে। দুই বছর ধরে বেতন-ভাতা বন্ধ থাকায় অনেক শিক্ষক মানবেতর জীবনযাপন করছেন। চাকরি ফিরে পাওয়ার পরও বকেয়া বেতন ও কর্মস্থলে যোগদানের জন্য তাদের নতুন করে প্রশাসনিক ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে।

শিক্ষাবিদদের মতে, কোনো শিক্ষকের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে তদন্ত করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু মবের মাধ্যমে পদত্যাগে বাধ্য করার ঘটনা শিক্ষকতা পেশার মর্যাদা ও দেশের শিক্ষাব্যবস্থার ওপর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

এই বিভাগের আরও খবর


ফেসবুকে আমরা