পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক মানচিত্রে এবার আমূল পরিবর্তনের হাওয়া। দীর্ঘ পনেরো বছর ধরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের একচ্ছত্র আধিপত্যে থাকা এই রাজ্যটিতে ভারতীয় জনতা পার্টির ভূমিধস বিজয় শুধু ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির বিষয় নয় এটি বাংলাদেশের জন্যও গভীর মনোযোগের দাবি রাখে। কারণ ভৌগলিক, সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিকভাবে পশ্চিমবঙ্গ এবং বাংলাদেশ এমন এক অদৃশ্য সুতোয় বাঁধা, যা কোনো রাজনৈতিক সীমারেখা পুরোপুরি ছিন্ন করতে পারেনি।
রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে, বিজেপির এই জয় বাংলাদেশ-ভারত দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে একটি নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ঐতিহাসিকভাবে বাংলাদেশের সঙ্গে তুলনামূলকভাবে সহানুভূতিশীল অবস্থানে ছিলেন, বিশেষত তিস্তা চুক্তির প্রশ্নে তিনি কেন্দ্রের সঙ্গে বারবার দ্বন্দ্বে জড়িয়েছেন। কিন্তু বিজেপি শাসিত পশ্চিমবঙ্গ মানে কেন্দ্র ও রাজ্যের মধ্যে সেই টানাপড়েন আর থাকবে না। ফলে তিস্তার পানি বণ্টন প্রশ্নে দিল্লির সঙ্গে সরাসরি আলোচনার পথ যেমন সহজ হতে পারে, তেমনি নতুন শর্তও আসতে পারে। বাংলাদেশের কূটনৈতিক মহলকে তাই এখনই নতুন বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নেয়ার প্রস্তুতি নিতে হবে।
ব্যাংকগুলোকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রেখে শক্ত মনিটরিং ও তদারকির আওতায় নিয়ে আসা উচিত
মুখ্যমন্ত্রী পদের দৌঁড়ে এগিয়ে থাকা শুভেন্দু অধিকারী পরিচিত একজন কঠোর হিন্দুত্ববাদী মুখ হিসেবে। নন্দিগ্রামে মমতাকে পরাজিত করে তিনি যে রাজনৈতিক পরিচিতি তৈরি করেছেন, তাতে বাংলাদেশ বিষয়ক তার অবস্থান কখনোই নমনীয় ছিল না। অন্যদিকে সমিক ভট্টাচার্য বা স্বপন দাসগুপ্তের মতো ভদ্রলোক ঘরানার নেতারা যদি ক্ষমতায় আসেন, তাহলে সম্পর্কের ধরনটা হয়তো কিছুটা ভিন্ন হতে পারে তবে মূল মতাদর্শগত কাঠামো একই থাকবে।
সামাজিক প্রেক্ষাপটে এই পরিবর্তন বাংলাদেশের জন্য আরও সংবেদনশীল। পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির উত্থানের সঙ্গে সঙ্গে সেখানকার মুসলিম সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী এবং বাংলাদেশ থেকে যাওয়া হিন্দু শরণার্থীদের প্রশ্নটি নতুনভাবে সামনে আসবে। নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন বা সিএএ-র প্রয়োগ এবার রাজ্য প্রশাসনের সহযোগিতায় আরও জোরালো হতে পারে। এতে সীমান্তবর্তী বাংলাদেশি পরিবারগুলোর মধ্যে যে উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তা তৈরি হবে, তা অস্বীকার করার উপায় নেই।
অর্থনৈতিক বিবেচনায় পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের মধ্যে অনানুষ্ঠানিক বাণিজ্যের পরিমাণ বিশাল। পেট্রাপোল-বেনাপোল সীমান্ত দিয়ে যে বাণিজ্য প্রবাহ, তা দুই দেশের সাধারণ মানুষের জীবনমানের সঙ্গে সরাসরি জড়িত। বিজেপি সরকার যদি সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় কড়াকড়ি আরোপ করে, তাহলে এই বাণিজ্যিক সম্পর্কে ভাটা পড়তে পারে। তবে এটাও সত্য যে, একটি স্থিতিশীল ও কেন্দ্রের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ রাজ্য সরকার দীর্ঘমেয়াদে বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নত করতে পারে, যা পরোক্ষভাবে বাংলাদেশের পণ্যের বাজারেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি থেকে এই পরিবর্তনটি সবচেয়ে স্পর্শকাতর। বিজেপির রাজনীতির কেন্দ্রে হিন্দুত্বের যে আদর্শ, তা পশ্চিমবঙ্গে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় প্রতিষ্ঠিত হলে বাংলাদেশের সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়কে ঘিরে নানা রাজনৈতিক বয়ান আরও সোচ্চার হবে। এই বয়ানগুলো অনেক সময় বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিকে চাপে ফেলে। একই সঙ্গে বাংলাদেশের মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ জনমানসে ভারত-বিরোধী অনুভূতি আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। এই পারস্পরিক সন্দেহের বৃত্তটি ভাঙতে না পারলে দুই বাংলার মানুষের সম্পর্ক ক্রমশ আনুষ্ঠানিকতার খোলসে বন্দী হয়ে পড়বে।
শেষ কথা হলো, পশ্চিমবঙ্গে গেরুয়া পতাকা ওড়ার মানে শুধু একটি রাজ্যের ক্ষমতা পরিবর্তন নয় এটি বাংলাদেশের জন্য একটি নতুন কূটনৈতিক বাস্তবতার সূচনা। ঢাকার নীতিনির্ধারকদের এখনই সতর্ক ও দূরদর্শী পদক্ষেপ নিতে হবে। আবেগের রাজনীতি নয়, বরং বাস্তববাদী কূটনীতিই হোক আমাদের পথচলার ভিত্তি। কারণ প্রতিবেশী বদলানো যায় না, কিন্তু সম্পর্কের ভাষা বদলানো যায় এবং সেই ভাষাটি আমাদেরই বেছে নিতে হবে।
লেখক: সুইজারল্যান্ডভিত্তিক বেসরকারি ব্যাংকিং আর্থিক অপরাধ বিশেষজ্ঞ কলামিস্ট ও কবি
ইমেইল: shahidul.alam@bluewin.ch