ডেস্ক রিপোর্টার ।
অ্যাগ্রিমেন্ট অন রেসিপ্রোকাল ট্রেড (আর্ট) বা পারস্পরিক বাণিজ্যচুক্তি বাস্তবায়নের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে আশ্বস্ত করেছে বাংলাদেশ। গতকাল বুধবার মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি এস পল কাপুরের সঙ্গে বৈঠকে এ বিষয়ে আশ্বস্ত করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান।
সফররত পল কাপুরের সঙ্গে গতকাল বুধবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে বৈঠক হয়েছে খলিলুর রহমানের। পল কাপুর গত মঙ্গলবার রাতে তিন দিনের সফরে ঢাকা এসেছেন। মার্কিন এ দূত গতকাল বিভিন্ন দপ্তরে বৈঠক করেন। পরে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে নৈশভোজে অংশ নেন।
বৈঠকে আর্ট চুক্তি নিয়ে আলোচনার বিষয়ে জানতে চাইলে খলিলুর রহমান বলেন, চুক্তির বিষয়ে পল কাপুরকে আশ্বস্ত করা হয়েছে। বাংলাদেশ সরকার এ চুক্তির বাস্তবায়ন অব্যাহত রাখবে। বর্তমানে বাংলাদেশের ওপর ধারা ১২২-এর আওতায় ১৫ শতাংশ শুল্ক রয়েছে। যখন ধারা ৩০১ বাস্তবায়ন হবে, তখন যাতে শুল্ক ১৯ না হয়ে কিছু কম হয়, সে আবেদন বাংলাদেশ করেছে।
নির্বাচনের তিন দিন আগে আর্ট সই নিয়ে মার্কিন কোনো চাপ ছিল কিনা–এ প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি বাংলাদেশের প্রধান দুটি দলের নেতাদের সঙ্গে নির্বাচনের আগেই কথা বলেছেন। দলগুলো এতে সম্মতি দিয়েছিল। এমন না যে চুক্তিটি আমরা অন্ধকারে করেছি। চুক্তিতে একটা প্রবেশের ধারা এবং বের হওয়ার ধারা রয়েছে। প্রবেশের ধারা হচ্ছে– আনুষ্ঠানিকভাবে না জানালে এ চুক্তি কার্যকর হবে না। এখনও আমরা আনুষ্ঠানিকভাবে জানাইনি। সরকার ইচ্ছা করলে পর্যালোচনা করতে পারে। বের হওয়ার ধারা হচ্ছে– ৬০ দিনের নোটিশে বের হওয়া যাবে।
চুক্তিতে বাংলাদেশের স্বার্থ ক্ষুণ্ন হয়েছে কিনা– এ প্রশ্নের উত্তরে খলিলুর রহমান বলেন, চুক্তির দরকষাকষি তিন দিন আগে শেষ হয়েছে, বিষয়টি তা নয়। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রথম বাণিজ্য ঘাটতি নিয়ে আলোচনা হয়। পাল্টা শুল্ক আরোপ করা হয় এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি এবং তারপর থেকে মূল আলোচনা শুরু হয়। জুলাইয়ে দুই দেশের মধ্যে মোটামুটি একটা চুক্তি হয়েছিল। শুধু দুটি বিষয় বাকি ছিল। চুক্তি আমরা করে রেখেছিলাম ৩১ জুলাই, ১ আগস্ট আমরা শুল্ক ২০ শতাংশ পেয়েছি। তাই চট করে নির্বাচনের তিন দিন আগে সই করা হয়েছে, সেটা ঠিক নয়।
তিনি বলেন, এ চুক্তিটি পড়ার ক্ষেত্রে আমাদের একটি বিভ্রাট রয়েছে। শুধু বাংলাদেশের চুক্তি দেখলে চলবে না। পাশাপাশি ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও অন্যান্য দেশগুলো কী কী দিয়েছে, আর কী কী পেয়েছে তা দেখতে হবে। তাদের চুক্তির সঙ্গে মিলিয়ে দেখলে বোঝা যাবে একই ধরনের ভাষা সবখানে। বাংলাদেশের স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে চুক্তি করা হয়নি।
‘সবার আগে বাংলাদেশ’ নীতির সঙ্গে আর্ট চুক্তি সাংঘর্ষিক কিনা– জানতে চাইলে খলিলুর রহমান বলেন, ‘অবশ্যই সাংঘর্ষিক নয়। কারণ, সবার ‘আগে বাংলাদেশ’-এ নীতি অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েও পালন করেছি। এ চুক্তিটি যদি না হতো– ৩৭ শতাংশ শুল্ক দিয়ে মার্কিন বাজারে প্রতিযোগিতা করতে বাংলাদেশ পারত কিনা। আমরা ২২ বিলিয়ন ডলারের ক্রয় প্রতিশ্রুতি দিয়েছি। এর মধ্যে জ্বালানি ১৫ বছর ধরে কিনব। ভারত পাঁচ বছরে ৫০০ বিলিয়ন ডলারের ক্রয় প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। আমাদের পাল্টা শুল্ক ১৯ আর ভারতের ১৮ শতাংশ। এখন মূল্যায়ন করে দেখুন।’
পল কাপুরকে আশ্বস্ত করা হয়েছে আর্ট চুক্তির বাস্তবায়ন নিয়ে, এ চুক্তির দরকষাকষির আর কোনো সুযোগ রয়েছে কিনা– এ প্রশ্নে খলিলুর রহমান বলেন, ‘এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে জানাইনি। দরকার হলে আমরা পুনর্বিবেচনা করব। যে জিনিসটা কাজ করছে না, তা নিয়ে তাদের সঙ্গে বসে আলাপ করে নেব। সেই রাস্তা চুক্তিতে দেওয়া আছে।’
মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশি হতাহতের বিষয়টি পল কাপুরকে জানিয়েছেন উল্লেখ করে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যের সংকট নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এই যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে বাংলাদেশি নিহতের সংখ্যা বাড়তে পারে। আমাদের মতো দেশের পক্ষে এ যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাব বহন করা দুঃসাধ্য। বাংলাদেশ বলেছে, যত দ্রুত সম্ভব আলোচনা ও কূটনীতির মাধ্যমে এ সংঘাত সমাধানের জন্য।’
যুক্তরাষ্ট্র কবে যুদ্ধ বন্ধ করবে, সে বিষয়ে পল কাপুর কিছু জানিয়েছেন কিনা– এ প্রশ্নে খলিলুর রহমান বলেন, যুদ্ধ কবে বন্ধ হবে, সেটা তো সম্পূর্ণভাবে তাদের (যুক্তরাষ্ট্র) হাতেও নেই। এটা তো কেউ বলতে পারবে না।
মৌলিক প্রতিরক্ষা চুক্তিগুলো নিয়ে কী আলোচনা হয়েছে– জানতে চাইলে তিনি বলেন, বৈঠকে সামরিক সহযোগিতা নিয়ে কোনো আলোচনা হয়নি। ভূরাজনীতি ও অর্থনীতি নিয়ে আলোচনার বিষয়ে জানতে চাইলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ভারত ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের কথা এসেছে, কিন্তু বিস্তৃত আলোচনা হয়নি। প্রশান্ত মহাসাগরীয় কৌশল নিয়ে বাংলাদেশের অবস্থান পরিবর্তন হয়েছে কিনা– জানতে চাইলে খলিলুর রহমান বলেন, ‘আমরা মাত্র দুই সপ্তাহ হলো দায়িত্ব নিয়েছি। পুরো ইন্দো-প্যাসিফিক জিনিসটা আমাদের পুনর্বিবেচনা করতে হবে। তার আগে আমরা এ নিয়ে বলতে পারব না। আমাদের দেশের সুরক্ষা যাতে বিপর্যস্ত না হয়, সেটা আমাদের সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার। আমরা কারও কোনো জোটে প্রবেশ করব না।’ চীনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বৈরী সম্পর্কের মাঝে বাংলাদেশ কিনা– এ প্রশ্নে তিনি বলেন, আমরা এর মাঝে পড়িনি।
পল কাপুরের সঙ্গে বৈঠক প্রসঙ্গে শুরুতে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘বাংলাদেশে নির্বাচন শান্তিপূর্ণ হওয়ায় পল কাপুর অবাক হয়েছেন। এটা মার্কিনিদের আশার বাইরে ছিল। পল কাপুর বললেন উৎসব মুখর নির্বাচন হয়েছে।’
খলিলুর রহমান বলেন, যুক্তরাষ্ট্রকে আমাদের পররাষ্ট্রনীতির মূল বিষয় ‘বাংলাদেশ প্রথম, সবার আগে বাংলাদেশ’ জানিয়েছি। এই নীতিতে আমরা চলব। আমাদের স্বার্থ আমরা সম্পূর্ণভাবে বজায় রেখে অন্যান্য দেশের সঙ্গে কাজ করব। পল কাপুর দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। আশা প্রকাশ করেছেন, আগামী দিনগুলোতে সম্পর্ক আরও দৃঢ় ও বিস্তৃত হবে। বৈধ কাগজপত্রবিহীন যে বাংলাদেশিরা যুক্তরাষ্ট্রে আছেন, তাদের ফিরে আনার ব্যাপারে কথা হয়েছে। প্রক্রিয়া যাতে সহজ হয় এবং সম্মানের সঙ্গে তারা আসতে পারেন, তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। রোহিঙ্গা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এই সংকট সমাধানের দিকে এখন তাকাতে হবে, এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র একমত। তারা এ নিয়ে সব ধরনের সহযোগিতা দেবে।
সফরের শেষ দিনে আজ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময় করবেন মার্কিন এ দূত। সকালে জামায়াতে ইসলামী এবং পরে বিএনপির সঙ্গে বৈঠক করবেন তিনি। দুপুরে বাংলাদেশে থাকা বিভিন্ন কূটনৈতিক মিশনের প্রধানদের সঙ্গে বৈঠক করবেন। এরপর সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার কবরে শ্রদ্ধা জানাতে যাওয়ার কথা। বিকেলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবিরের সঙ্গে বৈঠক করবেন পল কাপুর। এরপর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আয়োজিত ইফতার অনুষ্ঠানে অংশ নেবেন। আজ রাতে তাঁর ঢাকা ছাড়ার কথা।