সমকাল
দৈনিক সমকালের প্রথম পাতার খবর ‘জ্বালানি পরিস্থিতি: এলএনজি আমদানি অনিশ্চিত, কমছে দেশীয় উৎপাদনও’। প্রতিবেদন বলা হয়, চলমান গ্যাস সংকট কবে মোচন হবে– এ প্রশ্ন এখন শুধু বিশেষজ্ঞ, শিল্পোদ্যোক্তা বা বিদ্যুৎ উৎপাদনকারীদের নয়, সাধারণ মানুষেরও। শিল্পকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হওয়া, বিদ্যুৎকেন্দ্রে জ্বালানি সংকটে লোডশেডিং, সিএনজি স্টেশনে গাড়ি নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা– সব মিলিয়ে সংকটের প্রভাব পড়ছে অর্থনীতির প্রায় সব স্তরে। সরকার বলছে, স্থায়ীভাবে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে অন্তত দুই বছর লাগবে। কিন্তু দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন কমছে, অন্যদিকে এলএনজি আমদানিও নির্ভর করছে আন্তর্জাতিক বাজার ও বৈদেশিক মুদ্রার ওপর। ফলে দুই বছর পর পরিস্থিতি কোথায় দাঁড়াবে, তা নিয়ে উঠছে প্রশ্ন।
গ্যাস ও বিদ্যুতের অনিয়মিত সরবরাহের কারণে কোথাও কারখানার উৎপাদন কমেছে, কোথাও বন্ধ হয়ে গেছে। ব্যবসায়ীদের আশঙ্কা, দীর্ঘস্থায়ী জ্বালানি সংকট নতুন বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
রাজধানীর সিএনজি স্টেশনগুলোতে গাড়ির দীর্ঘ সারি এ সংকটের তাৎক্ষণিক চিত্র। কম চাপের কারণে অনেক চালক নির্ধারিত পরিমাণ গ্যাসও নিতে পারছেন না। ফলে একই গাড়িকে দিনে একাধিকবার স্টেশনে যেতে হচ্ছে। এতে সময় ও আয় দুটিই কমছে। আবাসিক লাইনে গ্যাস পাওয়া যায় না বললে চলে। এ কারণে রান্নাঘরে নিয়মিত জ্বলছে না চুলা।
চাহিদার তুলনায় ঘাটতি ১৭০ কোটি ঘনফুট
পেট্রোবাংলার গতকাল শুক্রবারের হিসাব অনুযায়ী, দেশে মোট গ্যাস সরবরাহ হয়েছে ২৩৩ কোটি ৬০ লাখ ঘনফুট। এর মধ্যে দেশীয় উৎস থেকে এসেছে ১৬২ কোটি ৪০ লাখ এবং এলএনজি থেকে ৭১ কোটি ২০ লাখ ঘনফুট। বিপরীতে দৈনিক চাহিদা প্রায় ৪০০ কোটি ঘনফুট। ফলে ঘাটতি দাঁড়ায় প্রায় ১৭০ কোটি ঘনফুট।
সবচেয়ে বেশি চাপ পড়ছে বিদ্যুৎ খাতে। জাতীয় গ্রিডের গ্যাসচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর দৈনিক চাহিদা ছিল ২৫২ কোটি ৫০ লাখ ঘনফুট। পাচ্ছে মাত্র ৭০-৯০ কোটি ঘনফুট। অর্থাৎ, চাহিদার এক-তৃতীয়াংশের মতো গ্যাস পায় কেন্দ্রগুলো।
দেশে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ১২ হাজার মেগাওয়াটের বেশি। অথচ গ্যাসের অভাবে উৎপাদন হচ্ছে ৫ হাজার মেগাওয়াটের কম। কয়লাভিত্তিক কয়েকটি কেন্দ্রের কারিগরি সমস্যা ও জ্বালানি ঘাটতিও রয়েছে। ফলে বিদ্যুতের ঘাটতি সামাল দিতে বাড়ছে লোডশেডিং।
গ্রীষ্মে সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ চাহিদা প্রায় ১৮ হাজার মেগাওয়াট। বছরে ১০ শতাংশ হারে চাহিদা বাড়লে দুই বছর পর তা প্রায় ২১ হাজার ৬০০ মেগাওয়াটে পৌঁছাতে পারে। অর্থাৎ, তখন গ্যাসের বর্তমান ঘাটতি কমলেও বাড়তি বিদ্যুৎ চাহিদা নতুন চাপ সৃষ্টি করবে।
কমছে দেশীয় গ্যাস
সংকটের বড় কারণ দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন কমে যাওয়া। ২০২০ সালের জানুয়ারিতে দেশে দৈনিক মোট গ্যাস সরবরাহ ছিল প্রায় ৩১৬ কোটি ৮০ লাখ ঘনফুট। এর মধ্যে দেশীয় উৎসের সরবরাহ ছিল ২৫৭ কোটি ৮০ লাখ ঘনফুট। গতকাল মোট সরবরাহ নেমেছে ২৩৩ কোটি ৬০ লাখ ঘনফুটে। দেশীয় উৎসের সরবরাহ ১৬২ কোটি ৫০ লাখ ঘনফুট। প্রায় সাড়ে ছয় বছরে মোট গ্যাস সরবরাহ কমেছে ৮৩ কোটি ২০ লাখ ঘনফুট (২৬.২ শতাংশ)।
অর্থাৎ কয়েক বছরে দেশীয় উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। এলএনজি আমদানি বাড়িয়ে ঘাটতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা হলেও মোট সরবরাহ আগের পর্যায়ে রাখা সম্ভব হয়নি। সরকার অবশ্য উৎপাদন বাড়াতে নতুন কূপ খনন ও পুরোনো কূপে ওয়ার্কওভারের কর্মসূচি নিয়েছে। ১৫০টি কূপের কর্মসূচির মধ্যে ৩০টির কাজ শেষ হয়েছে। এতে প্রায় ১৪ কোটি ঘনফুট গ্যাস যুক্ত হয়েছে। আরও সাতটি কূপের কাজ শেষ হলে বাড়তে পারে প্রায় সাড়ে ৮ কোটি ঘনফুট।
তিতাস, বাখরাবাদ, মোবারকপুর ও সুনেত্র এলাকায় গভীর কূপ খননের উদ্যোগ রয়েছে। পাশাপাশি ৪ হাজার ৫০০ কিলোমিটার টু-ডি এবং ৪ হাজার ২০০ কিলোমিটার থ্রি-ডি ভূকম্পন জরিপের পরিকল্পনা করা হয়েছে। বাপেক্সের সক্ষমতা বাড়াতে দুটি নতুন রিগ কেনার উদ্যোগও রয়েছে। তবে অনুসন্ধান, কূপ খনন ও উৎপাদনে যেতে সময় লাগে। ফলে এসব উদ্যোগের সুফল কত দ্রুত পাওয়া যাবে, সেটিই বড় বিষয়।
লএনজিতেও অনিশ্চয়তা
দেশীয় উৎপাদনের ঘাটতি পূরণে এলএনজি এখন গুরুত্বপূর্ণ ভরসা। আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা এ পথকেও অনিশ্চিত করে তুলেছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে সরবরাহ বিঘ্ন ঘটছে। দাম বাড়ার পাশাপাশি প্রয়োজনমতো কার্গো সংগ্রহ করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।
চলতি বছরের প্রথম আট মাসে দেশে ৬৮টি এলএনজি কার্গো এসেছে। গত বছরের একই সময়ে এসেছিল ৭১টি। জুলাই ও আগস্টে এসেছে ১৫টি, যেখানে আগের বছরের একই সময়ে এসেছিল ২১টি। একটি এলএনজি টার্মিনাল অগ্নিকাণ্ডের কারণে ১৬ দিন বন্ধ থাকায় পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়েছে। সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে গরম থাকায় বিদ্যুতের চাহিদাও বেশি থাকার কথা। এ দুই মাসে অন্তত ২০টি কার্গো প্রয়োজন হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টদের ধারণা। কিন্তু চাহিদা অনুযায়ী কার্গো নিশ্চিত করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
নতুন টার্মিনালে কতটা স্বস্তি
আমদানির সক্ষমতা বাড়াতে মহেশখালীতে ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট ক্ষমতার নতুন এলএনজি টার্মিনাল তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। চীনা প্রতিষ্ঠান সিএমইসিকে কাজ দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির তথ্য অনুযায়ী, চুক্তির পর প্রায় ২১ মাসে টার্মিনাল চালু করা সম্ভব। সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৮ সালের ডিসেম্বর থেকে সেখান থেকে গ্যাস সরবরাহ শুরু হতে পারে। এতে আমদানি সক্ষমতা বাড়বে প্রায় ৬০ কোটি ঘনফুট।
তবে টার্মিনাল নির্মাণ করলেই সংকটের সমাধান হবে না। বাড়তি সক্ষমতা ব্যবহার করতে নিয়মিত এলএনজি কিনতে হবে। এজন্য বৈদেশিক মুদ্রা, সরবরাহকারী এবং দীর্ঘমেয়াদি আমদানি পরিকল্পনা সব নিশ্চিত করতে হবে।
আপাতত বিকল্প জ্বালানির ভরসা
গ্যাসের ঘাটতি সামাল দিতে বিদ্যুৎ উৎপাদনে তেল ও কয়লার ব্যবহার বাড়ানোর উদ্যোগ রয়েছে। তেলচালিত কেন্দ্রগুলোর মোট সক্ষমতা ৬ হাজার মেগাওয়াটের বেশি। সরকার এ খাতে প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে।
ফার্নেস তেল দিয়ে বর্তমানে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনে খরচ প্রায় ২১ টাকা ৫১ পয়সা। এলএনজির দাম প্রতি এমএমবিটিইউ ২৪ ডলার হলে গ্যাসভিত্তিক উৎপাদন ব্যয় ২৩ টাকার বেশি হতে পারে। ফলে সংকটকালে কিছু ক্ষেত্রে তেলচালিত কেন্দ্র ব্যবহার অর্থনৈতিকভাবে তুলনামূলক সুবিধাজনক হতে পারে।
কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলোরও সক্ষমতা রয়েছে। দেশে এসব কেন্দ্রের মোট সক্ষমতা প্রায় ৭ হাজার মেগাওয়াট। কারিগরি সমস্যা ও কয়লা সরবরাহের ঘাটতিতে সাম্প্রতিক সময়ে উৎপাদন ৫ হাজার ২০০ মেগাওয়াটের নিচে ছিল।
তবে তেল বা কয়লা দিয়ে সাময়িকভাবে ঘাটতি সামাল দেওয়া গেলেও এগুলো দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয়। আমদানি বাড়লে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ এবং সরকারের ভর্তুকি ব্যয় দুটিই বাড়বে।
স্থায়ী সমাধান কী?
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, জ্বালানি অবকাঠামো উন্নয়ন ও প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনতে প্রায় দুই বছর সময় লাগবে। এই সময়ের মধ্যে গ্যাস ও বিদ্যুতের চাহিদাও বাড়বে। ফলে শুধু বর্তমান ঘাটতি পূরণ করলেই হবে না, বাড়তি চাহিদার ব্যবস্থাও করতে হবে।
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে গ্যাস সংকট মোকাবিলায় দেশীয় উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি প্রয়োজনীয় এলএনজি আমদানি নিশ্চিত করতে হবে। শুধু আমদানিনির্ভর হলে আন্তর্জাতিক বাজারের ঝুঁকি বাড়বে, আবার দেশীয় উৎস থেকেও ভবিষ্যতের পুরো চাহিদা মেটানো সম্ভব নয়। তাই পুরোনো গ্যাসক্ষেত্রের উৎপাদন ধরে রাখার পাশাপাশি নতুন এলাকায় অনুসন্ধান ও কূপ খনন দ্রুত এগিয়ে নিতে হবে। এলএনজি আমদানির জন্যও দীর্ঘমেয়াদি ও নির্ভরযোগ্য ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাসের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে তেল, কয়লা ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়নে পেশাজীবী ও বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি টাস্কফোর্সও গঠন করা যেতে পারে। কারণ, গ্যাস সংকট এখন শুধু জ্বালানি খাতের সমস্যা নয়; এর প্রভাব পড়ছে বিদ্যুৎ, শিল্প, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও বৈদেশিক মুদ্রার ওপরও।
দুই বছর পর সংকট পুরোপুরি মোচন হবে–এমন নিশ্চয়তা নেই। তবে এই সময়ের মধ্যে দেশীয় জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ম তামিমের মতে, এলএনজি ব্যয়বহুল হলেও প্রয়োজন অনুযায়ী তা আমদানি করতে হবে। পাশাপাশি কোন খাতে কত গ্যাস দেওয়া হবে, তা অগ্রাধিকার দিয়ে ঠিক করার পাশাপাশি তেল ও কয়লাভিত্তিক কেন্দ্র থেকেও উৎপাদন বাড়াতে হবে।
প্রথম আলো
‘ছোট হয়ে গেছে বড় শ্রমবাজার’—এটি দৈনিক প্রথম আলোর প্রধান শিরোনাম। খবরে বলা হয়, সেনানিবাসে বাবুর্চির কাজ দেওয়ার কথা বলে গত বছর রাশিয়ায় পাঠানো হয় লক্ষ্মীপুরের জাহাঙ্গীর আলমকে। কিন্তু খাবার তৈরি নয়, তাঁকে পাঠিয়ে দেওয়া হয় সরাসরি ইউক্রেনের সঙ্গে যুদ্ধক্ষেত্রে।
সাত মাস পর বাংলাদেশ দূতাবাসের মাধ্যমে দেশে ফিরে আসেন জাহাঙ্গীর। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, শুরুতে প্রশিক্ষণ ছাড়াই অস্ত্র ধরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। পরে এক দিন তা চালানো শেখানো হয়। তাঁরা একসঙ্গে ১৬ জন ছিলেন যুদ্ধের ক্যাম্পে। চারজন মারা যাওয়ার পর তাঁর দিন কাটছিল আতঙ্কে। অসুস্থ হয়ে দুই মাস হাসপাতালে কাটান। সেখান থেকে পালান এবং দূতাবাসের মাধ্যমে দেশে ফেরেন।
রাশিয়া কখনোই বাংলাদেশের বড় শ্রমবাজার ছিল না। বাংলাদেশি অদক্ষ শ্রমিকেরা মূলত মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে যান। মালয়েশিয়ায়ও অনেকেই যেতেন। আর্থিক দিক দিয়ে বেশি সচ্ছলেরা যান ইউরোপের দেশগুলোতে। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলো রাশিয়া ও কম্বোডিয়ার মতো দেশগুলোতে অনেকে যাচ্ছেন। গিয়ে অনেকেই প্রতারণার শিকার হচ্ছেন।
অন্যদিকে অবৈধ পথে ইউরোপের দেশে গিয়ে বহু মানুষ প্রতিবছর প্রাণ হারাচ্ছেন। তার মধ্যে বাংলাদেশিরাও রয়েছেন। কিন্তু অবৈধ পথে লাখ লাখ টাকা ব্যয়ে যাত্রা থামছে না।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, ওমান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মালয়েশিয়া, বাহরাইনের মতো বাংলাদেশের কিছু বড় শ্রমবাজার দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ অথবা কর্মী যাওয়া কমে গেছে। সমস্যাটি নতুন নয়, বেশ কয়েক বছরের। বিএনপি সরকার মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার খোলার চেষ্টা করছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গত জুন মাসে মালয়েশিয়া সফর করেন। এরপর সম্প্রতি দেশটি শ্রমবাজার খোলার ঘোষণা দেয়। তবে এখনো খোলেনি। ইউরোপের দেশগুলোতেও যথেষ্টসংখ্যক কর্মী যেতে পারছে না। ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোতে কর্মীদের যাওয়ার আগ্রহ তৈরি হওয়ার এটা একটা বড় কারণ।
বাংলাদেশ জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে কম্বোডিয়ায় ১২ হাজার ২৬৩ জন বাংলাদেশি যাওয়ার ছাড়পত্র নিয়েছেন। দেশটি ২০২৫ সালে বাংলাদেশের বৈদেশিক শ্রমবাজারে ৮ নম্বর অবস্থানে উঠে এসেছে। রাশিয়ান ফেডারেশনে গেছেন ৪ হাজার ৭২৭ জন। রাশিয়া রয়েছে ১৩ নম্বর অবস্থানে। মালয়েশিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া, লেবাননের মতো দেশের চেয়ে ২০২৫ সালে রাশিয়ায় গেছেন বেশিসংখ্যক বাংলাদেশি।
সার্বিকভাবে বাংলাদেশি কর্মীদের বিদেশ যাওয়া কমছে। বিএমইটি বলছে, বিদেশে যেতে এ বছরের প্রথম আট মাসে (জানুয়ারি-আগস্ট) ছাড়পত্র নিয়েছেন প্রায় ৫ লাখ কর্মী। গত বছর একই সময়ে সংখ্যাটি ছিল প্রায় ৭ লাখ ৪০ হাজার। তার মানে এ বছর কর্মীর ছাড়পত্র কমেছে ১ লাখ ৪০ হাজারের মতো।
রিক্রুটিং এজেন্সি মালিকদের সংগঠন বায়রার সাবেক মহাসচিব আলী হায়দার চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, আরব আমিরাত ও কাতারের বাজার সংকুচিত। মালয়েশিয়ায় বন্ধ। দেশেও কাজ না থাকায় যেকোনো উপায়ে বিদেশে যেতে গিয়ে প্রতারিত হচ্ছেন অনেকে, পাচারের ঘটনা ঘটছে। তাঁর দাবি, ৭০ শতাংশ কর্মী সৌদি আরবে যাচ্ছেন স্বল্প মেয়াদে। গিয়ে অনেকেই কাজ পান না।
আলী হায়দার চৌধুরী আরও বলেন, বন্ধ শ্রমবাজার চালু এবং নতুন বাজার তৈরি করতে না পারলে পাচার ও প্রতারণা কমবে না। সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বে কাজ করতে হবে এ খাতে।
বিদেশে কর্মী পাঠানো কেন জরুরি
বাংলাদেশ থেকে ১৯৭৬ সালে বিদেশে কর্মী পাঠানো শুরু হয়। মূলত এটি বাড়তে শুরু করে নব্বইয়ের দশকে। অন্যদিকে ২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত সময়ে বছরে কর্মী পাঠানোর গড় সংখ্যা ১০ লাখ ছাড়িয়ে যায়। এর মধ্যে ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি কর্মী গেছেন ২০২৩ সালে, ওই বছর বিদেশে যান ১৩ লাখের বেশি কর্মী। সংখ্যাটি যত বড়ই হোক না কেন, বিদেশ যেতে আগ্রহী তরুণের তালিকা কখনোই ছোট হয়নি।
বাংলাদেশের তরুণ ও যুবাদের বড় অংশ বিদেশে গিয়ে নিজেদের ভাগ্য যেমন বদলাতে পেরেছেন, তেমনি তাঁদের পাঠানো অর্থে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার মজুত বড় হয়েছে। গত পাঁচ অর্থবছরে বাংলাদেশিরা বছরে গড়ে ২ হাজার ৬৪৯ কোটি ডলারের সমপরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা দেশে পাঠিয়েছেন। রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয়ে বিশ্বে সপ্তম অবস্থানে বাংলাদেশ।
দারিদ্র্য বিমোচন ও অভ্যন্তরীণ বাজার বড় হওয়ার ক্ষেত্রে দেশের তরুণদের বিদেশ যাওয়াকে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম বলে মনে করা হয়।
যুগান্তর
দৈনিক যুগান্তরের প্রধান শিরোনাম ‘সেবার ঘরেই আঁধার’। প্রতিবেদনে বলা হয়, রোগীকে সুস্থ করে জীবনে আশা আর আলো ফিরিয়ে আনে হাসপাতাল। অথচ ভয়াবহ লোডশেডিংয়ের কবলে পড়ে জীবন বাঁচানোর সেই ‘আলোর ঘর’গুলোই এখন অন্ধকারে নিমজ্জিত। বিদ্যুৎ-বিভ্রাটের কারণে রাজধানী থেকে শুরু করে জেলা-উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসাসেবা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, জেনারেটর বা আইপিএসের পর্যাপ্ত ব্যাকআপ না থাকায় অনেক সময় অপারেশন থিয়েটারে (ওটি) টর্চ বা মোবাইল ফোনের আলো জ্বালিয়ে সারতে হচ্ছে ছোটখাটো অস্ত্রোপচার।
জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের রক্ত পরিসঞ্চালন বিভাগে কাজ করেন মো. রবিউল ইসলাম। তিনি জানালেন, প্রতিদিন গড়ে প্রায় এক ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে না। এতে রেডিওথেরাপির মেশিন বন্ধ হয়ে যায়। ব্লাডব্যাংকের বিভিন্ন যন্ত্র চালানো এবং রক্ত সংরক্ষণেও সমস্যা তৈরি হয়। তার ভাষ্য, আইপিএস ও জেনারেটরের ব্যাকআপ থাকলেও হাসপাতালের সক্ষমতার তুলনায় তা অপ্রতুল। ফলে বিদ্যুৎ চলে গেলে প্রয়োজনীয় সব সরঞ্জাম একসঙ্গে চালানো সম্ভব হয় না।
২৫০ শয্যাবিশিষ্ট চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর হাসপাতালের একাধিক চিকিৎসক জানান, ৬ থেকে ১২ ঘণ্টার রোস্টার ডিউটির মধ্যে প্রায় তিন ঘণ্টাই বিদ্যুৎ থাকে না। কিছুদিন আগে পরিস্থিতি আরও খারাপ ছিল। জেনারেটর নষ্ট থাকলে টর্চ ও মোবাইল ফোনের আলো জ্বালিয়েও ছোটখাটো ওটির কাজ করতে হয়। তাদের অভিযোগ, নতুন ভবনে জেনারেটর থাকলেও সব জায়গায় এর সুবিধা পাওয়া যায় না। জরুরি বিভাগে একটি আইপিএস আছে। তীব্র গরমের মধ্যে বিদ্যুৎ না থাকা এবং অতিরিক্ত রোগীর চাপ মিলে হাসপাতালের পরিবেশ গুমোট হয়ে ওঠে। এতে রোগীদের কষ্ট আরও বাড়ে।
একটি-দুটি হাসপাতাল নয়, দেশজুড়ে হাসপাতালগুলোতে লোডশেডিংয়ের ভয়াবহ প্রভাব পড়ছে। তীব্র গরমে কষ্ট পাচ্ছেন রোগী ও স্বজনরা। ব্যাহত হচ্ছে জরুরি চিকিৎসা, ওটিতে অস্ত্রোপচার, পরীক্ষা-নিরীক্ষাসহ বিভিন্ন কার্যক্রম। বেশি দুর্ভোগে পড়েছেন উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালের রোগীরা। এসব প্রতিষ্ঠানের অনেকটিতে পর্যাপ্ত জেনারেটর বা বিকল্প না থাকায় বিদ্যুৎ চলে গেলে কার্যত অচল হয়ে পড়ছে গুরুত্বপূর্ণ এই সেবা।
জাতীয় ক্যানসার ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের পরিচালক ডা. মোস্তফা আজিজ সুমন যুগান্তরকে বলেন, রেডিওথেরাপি, সিটি স্ক্যান, এমআরআই, আইসিইউ, প্যাথলজি ও ব্ল্যাডব্যাংকের মতো গুরুত্বপূর্ণ সেবায় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ অপরিহার্য। বিশেষ করে রেডিওথেরাপির মেশিন ৩০ মিনিটের বেশি বন্ধ থাকলে এর পুরো ব্যবস্থাই শাটডাউন হয়ে যেতে পারে।
অস্ত্রোপচার ও প্যাথলজি পরীক্ষায় বিঘ্ন: যুগান্তরের অনুসন্ধানে ঢাকা ছাড়াও জেলা-উপজেলা পর্যায়ের বিভিন্ন স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে চিকিৎসাসেবায় সমস্যার তথ্য পাওয়া গেছে। এসব হাসপাতালের চিকিৎসক, রোগী ও স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কোথাও দিনে একাধিকবার, আবার কোথাও দীর্ঘ সময় ধরে লোডশেডিং হচ্ছে। ফলে জরুরি বিভাগ, অপারেশন থিয়েটার ও প্যাথলজি পরীক্ষায় বিঘ্ন ঘটছে। ল্যাবে দামি রিএজেন্ট নষ্ট হচ্ছে। পরীক্ষার রিপোর্ট ভুল হওয়ার শঙ্কা বাড়ছে। ব্যাহত হচ্ছে চিকিৎসাসেবা।
কথায় কথায় চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. মাহবুবুর রহমান যুগান্তরকে ভয়াবহ তথ্য দিলেন। হাসপাতালটির জেনারেটরের ম্যাগনেটিক এটিএস নষ্ট হয়ে প্রায় ২০-২৫ দিন ব্যাকআপ বন্ধ ছিল। পরে গণপূর্ত বিভাগের (পিডব্লিউডি) সহযোগিতায় মেরামত করা হয়েছে।
জেনারেটর পরিচালনায় আরেক সংকটের কথা জানালেন ওই চিকিৎসক। তার তথ্যমতে, বড় জেনারেটরটি চালাতে প্রতি ঘণ্টায় প্রায় ১৭ লিটার তেল লাগে। কিন্তু এ খাতে বরাদ্দ সীমিত। ফলে সবসময় জেনারেটর চালানো সম্ভব হয় না। সাধারণত সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত হাসপাতালের পিক আওয়ারে জেনারেটরের ব্যাকআপ দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। এ সময় বহির্বিভাগে রোগীর চাপ থাকে এবং অপারেশন থিয়েটারও সচল রাখতে হয়। বিকালের দিকে প্রয়োজন অনুযায়ী অল্প সময়ের জন্য জেনারেটর চালানো হয়।
ঢাকার বাইরে কয়েকটি হাসপাতালের রোগী ও স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিদ্যুৎ চলে গেলে তীব্র গরমে হাসপাতালে অবস্থান করাই কঠিন হয়ে পড়ে। বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক ও গুরুতর অসুস্থদের কষ্ট বাড়ে। হাতপাখা দিয়ে রোগীর পাশে বসে বাতাস করতে হয়। রাতের দিকে দুর্ভোগ আরও বাড়ে। অনেক ক্ষেত্রে বিদ্যুৎ এলেও ১০ থেকে ২০ মিনিটের মধ্যে আবার চলে যাচ্ছে। সিসিইউ ইউনিট, নিউমোনিয়া ওয়ার্ডের রোগীরা বেশি ঝুঁকিতে পড়ছেন।
ঝুঁকিতে জীবনরক্ষাকারী সরঞ্জাম: হাসপাতালের বিদ্যুৎ সংকট শুধু রোগীর স্বাভাবিক ভোগান্তিতেই সীমাবদ্ধ নয়; ঝুঁকিতে পড়ছে জীবনরক্ষাকারী বিভিন্ন যন্ত্রপাতিও। বাংলাদেশ শিশু হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. মোহাম্মদ খালেদ বিন ইসমাইল যুগান্তরকে বলেন, প্রতিটি হাসাতালের আইসিইউ, সিসিইউ, আরআইসিইউ, এইচডিইউ, এনআইসিইউ, পিআইসিইউর বিভিন্ন যন্ত্রই বিদ্যুৎনির্ভর। ভেন্টিলেশন সাপোর্টের রোগীদের ভেন্টিলেটর মেশিন, সিরিঞ্জ পাম্প, নবজাতকদের ফটোথেরাপি, ওয়ার্মারসহ বিভিন্ন যন্ত্র চালাতে সার্বক্ষণিক বিদ্যুৎ প্রয়োজন। কিছু যন্ত্র আইপিএস বা ইউপিএসের সঙ্গে সংযুক্ত করা যায়; কিন্তু সব ক্ষেত্রে এ ব্যবস্থা পর্যাপ্ত নয়। নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণেও বিদ্যুৎ প্রয়োজন। দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকলে এসব ইউনিটে চিকিৎসাসেবা চালু রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।
কালের কণ্ঠ
‘অস্ত্রোপচার বন্ধ ৮০% উপজেলায়’—এটি দৈনিক কালের কণ্ঠের প্রধান শিরোনাম। খবরে বলা হয়, অপারেশন থিয়েটার, আধুনিক যন্ত্রপাতি সবই আছে, কোথাও কোথাও প্রশিক্ষিত চিকিৎসকও আছেন; কিন্তু নেই অস্ত্রোপচার চালানোর মতো সমন্বিত জনবল ও ব্যবস্থাপনা। ফলে দেশের উপজেলা পর্যায়ের সরকারি স্বাস্থ্যসেবায় অস্ত্রোপচার কার্যক্রম প্রায় বন্ধ।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট ৪৩৩টি উপজেলার ৩৪৪টি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে রোগীদের অস্ত্রোপচার বন্ধ রয়েছে। শতাংশের হিসাবে যা প্রায় ৭৯.৪৪। এসব অপারেশন থিয়েটারে কোথাও কয়েক মাস, কোথাও বা কয়েক বছর ধরে তালা ঝুলছে।
অস্ত্রোপচার বন্ধে সবচেয়ে বড় সংকট—অ্যানেসথেসিয়া বিশেষজ্ঞের। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সার্জন ও গাইনি বিশেষজ্ঞের ঘাটতি, ওটি সহকারী ও কারিগরি জনবলের সংকট এবং প্রয়োজনীয় ওষুধসামগ্রীর অভাব। আবার কোথাও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক পদায়িত থাকলেও সংযুক্তিতে অন্য হাসপাতালে দায়িত্ব পালন করছেন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যে আরো জানা গেছে, দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোয় জনবলের ৬৯ হাজার ১১৭টি পদের মধ্যে ২৫ হাজার ৮৬টি পদ শূন্য। ৪৩৩ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মধ্যে ১০১টিতে হয় না এক্স-রে, যা মোট স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ২৩. ৩২ শতাংশ।
আলট্রাসনোগ্রাম হয় না ১৯৬ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে, যা মোট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ৪২.২৬ শতাংশ। ইসিজি হয় না ৭০ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে।
এতে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও অপারেশন থিয়েটার এবং কোটি টাকার মূল্যবান যন্ত্রপাতি পড়ে থেকে নষ্ট হচ্ছে। আর এসব স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে কম খরচে অস্ত্রোপচারের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়ে রোগীদের ছুটতে হচ্ছে বেসরকারি ক্লিনিকে। এতে বাড়ছে চিকিৎসা ব্যয়, ভোগান্তি ও স্বাস্থ্যঝুঁকি।
জ্যেষ্ঠ জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ড. আবু জামিল ফয়সাল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সেবা না পেয়ে রোগীরা বাধ্য হয়ে বেসরকারি হাসপাতালে যেতে বাধ্য হচ্ছে। এতে সাধারণ মানুষের চিকিৎসা ব্যয় ও কষ্ট বাড়ছে। ভঙ্গুর এই স্বাস্থ্য ব্যবস্থার কারণে সরকারি চিকিৎসার ওপর থেকে মানুষের আস্থা হারিয়ে যাচ্ছে।’
তিনি বলেন, ‘উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের অস্ত্রোপচারসেবা বন্ধের অর্থ শুধু একটি সরকারি সেবা বন্ধ থাকা নয়, এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে রোগীর আর্থিক সংগতি ও জীবনধারার ওপর। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে কম খরচে সিজারিয়ান, অ্যাপেনডিক্স, হার্নিয়াসহ ছোট ও মাঝারি অস্ত্রোপচারের সুযোগ না থাকায় রোগীদের যেতে হচ্ছে বেসরকারি ক্লিনিকে।’
৪৩৩ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অ্যানেস্থেসিওলজিস্ট আছেন মাত্র ১৪২ জন
উপজেলা পর্যায়ে অস্ত্রোপচারসেবার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা অ্যানেস্থেসিয়া ব্যবস্থায়। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে অ্যানেস্থেসিওলজিস্টের সংখ্যা প্রায় দুই হাজার। এর মধ্যে সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থায় যুক্ত রয়েছেন প্রায় এক হাজার। ৪৩৩টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অ্যানেস্থেসিওলজিস্ট রয়েছেন মাত্র ১৪২ জন। অর্থাৎ অনুমোদিত পদের প্রায় ৭০ শতাংশ খালি।
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের হিসাবে এ সংকট আরো নাজুক। একজন সার্জনের বিপরীতে অ্যানেস্থেসিওলজিস্ট আছেন মাত্র ০.৩৭ জন। আর প্রতি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের বিপরীতে অ্যানেস্থেসিওলজিস্ট মাত্র ০.৪৫ জন। প্রতি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের বিপরীতে সার্জন রয়েছেন ১.২২ জন, আর ল্যাব টেকনিশিয়ান মাত্র ০.১৭ জন। অর্থাৎ গড়ে ছয়টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জন্য ল্যাব টেকনিশিয়ান একজন।
ফলে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক থাকলেও অ্যানেস্থেসিওলজিস্ট না থাকলে অধিকাংশ অস্ত্রোপচার নিরাপদভাবে করা সম্ভব নয়। এতে শুধু একটি পদ খালি থাকার কারণেও পুরো ওটি অচল থাকছে।
মাঠ পর্যায়ের চিত্রও একই
কালের কণ্ঠের প্রতিনিধিদের পাঠানো তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোয় কোথাও অ্যানেস্থেসিয়া বিশেষজ্ঞ আছে তো কোথাও সার্জন ও গাইনি চিকিৎসক নেই, আবার কোথাও পদায়িত চিকিৎসক সংযুক্তিতে অন্য হাসপাতালে কর্মরত।
শরীয়তপুরের গোসাইরহাট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ২২টি চিকিৎসক পদের বিপরীতে কর্মরত মাত্র ১১ জন। নেই সার্জারি, গাইনি ও অ্যানেস্থেসিয়া বিশেষজ্ঞ। ৩১ শয্যার হাসপাতালটি ৫০ শয্যায় উন্নীত করা হলেও অস্ত্রোপচারসেবা চালু হয়নি। সরকারি হাসপাতালে সেবা না পেয়ে রোগীদের যেতে হচ্ছে বেসরকারি ক্লিনিকে।
দিনাজপুরের বিরামপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রায় তিন বছর ধরে সিজারিয়ানসহ সব ধরনের অস্ত্রোপচার বন্ধ। অ্যানেস্থেসিয়া, গাইনি ও সার্জারি কনসালট্যান্ট না থাকায় এ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। ৫০ শয্যার হাসপাতালটিতে ১৮ জন মেডিক্যাল অফিসারের বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র ৯ জন। ১১টি কনসালট্যান্ট পদের বিপরীতে শিশু ও অ্যানেস্থেসিয়া বিশেষজ্ঞ পদায়িত থাকলেও তাঁরা সংযুক্তিতে দিনাজপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে দায়িত্ব পালন করছেন।
হাসপাতালটির আবাসিক মেডিক্যাল কর্মকর্তা ডা. শাহরিয়ার পারভেজ বলেন, ‘আগে এই হাসপাতালে সিজারিয়ানসহ বিভিন্ন অস্ত্রোপচার হতো। কিন্তু অ্যানেস্থেসিয়া, গাইনি ও সার্জারি কনসালট্যান্ট না থাকায় তিন বছর ধরে সব ধরনের অস্ত্রোপচার বন্ধ রয়েছে।’
ঝিনাইদহের হরিণাকুণ্ডু উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রায় সাত-আট মাস ধরে অস্ত্রোপচার বন্ধ রয়েছে। আর ৪১টি চিকিৎসক পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র ১৫ জন। নেই অ্যানেস্থেসিয়া, চক্ষু ও নাক-কান-গলা বিশেষজ্ঞ। হাসপাতালে গাইনি বিশেষজ্ঞ ও সার্জন থাকলেও অ্যানেস্থেসিয়া বিশেষজ্ঞ না থাকায় সিজারিয়ান, অ্যাপেনডিক্স, হার্নিয়া ইত্যাদির অস্ত্রোপচার বন্ধ রয়েছে।
সরেজমিনে গিয়ে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটির অপারেশন থিয়েটারের বাইরে তালা ঝুলতে দেখা গেছে। ভেতরে পড়ে আছে মূল্যবান যন্ত্রপাতি। দীর্ঘদিন ব্যবহার না হওয়ায় সেগুলো নষ্ট হচ্ছে। অথচ প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৫০০ রোগী এই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা নিতে আসে। তাদের মধ্যে প্রায় ৭০ জন নারী গাইনিসংক্রান্ত সমস্যায় চিকিৎসা নেয়।
মেহেরপুরের স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিত্র আরো ভয়াবহ। ২৫০ শয্যার মেহেরপুর জেনারেল হাসপাতাল এবং ৫০ শয্যার মুজিবনগর ও গাংনী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দেড় মাসের বেশি সময় ধরে অস্ত্রোপচার বন্ধ রয়েছে। এগুলোর অস্ত্রোপচারের দায়িত্ব ছিল মাত্র একজন অ্যানেস্থেসিওলজিস্টের ওপর।
গত ১৯ জুন অ্যানেস্থেসিওলজিস্ট মেহেদি হাসানকে চুয়াডাঙ্গা জেনারেল হাসপাতালে বদলি করা হলে ওই এক হাসপাতাল ও দুই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অস্ত্রোপচার সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। একই দিন মেহেরপুর জেনারেল হাসপাতালে এ এম রকিবুর রহমানকে পদায়ন করা হলেও তিনি যোগ দেননি। ফলে জনবল ব্যবস্থাপনার একটি ভুল সিদ্ধান্তে জেলার একটি সরকারি হাসপাতাল ও দুটি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অস্ত্রোপচারসেবা অচল হয়ে পড়ে।
ইত্তেফাক
দৈনিক ইত্তেফাকের প্রথম পাতার প্রতিবেদন ‘মানসিক সুস্থতা পরীক্ষা না করেই আসামির মৃত্যুদণ্ড!’। খবরে বলা হয়, ধর্ষণ ও হত্যা মামলার আসামি নূর মোহাম্মদ ছিলেন অসচ্ছল। তার মানসিক সুস্থতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছিল। আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের পূর্বে নিয়োগ দেওয়া হয়নি কোনো আইনজীবী। অভিযোগ গঠনের পর রাষ্ট্র নিযুক্ত আইনজীবী নিয়োগ দেওয়া হলেও তিনিও ছিলেন অনুপস্থিত। যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ না করেই বিচার প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া ও আসামিকে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড দেয় পিরোজপুরের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল। অবশেষে সাত বছর পর বিচারের নামে এই অবিচারের বিষয়টি ধরা পড়েছে উচ্চ আদালতের বিশেষ বেঞ্চে। যেখানে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের ডেথ রেফারেন্স নিষ্পত্তি হচ্ছে।
নূর মোহাম্মদের আপিল ও ডেথ রেফারেন্সটি নিষ্পত্তি করে হাইকোর্ট বলেছে, আসামির পক্ষে যথাসময়েরে রাষ্ট্র নিযুক্ত আইনজীবী নিয়োগ না দেওয়া এবং তার মানসিক সুস্থতার বিষয়ে নিশ্চিত না হয়ে ট্রাইব্যুনাল বিচারকাজ পরিচালনা করেছে। ট্রাইব্যুনালের এই বিচারকাজটি ছিল ত্রুটিপূর্ণ। এতে আসামি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। ব্যাহত হয়েছে ন্যায়বিচার। বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্ত্তী ও বিচারপতি কে এম রাশেদুজ্জামান রাজার দ্বৈত হাইকোর্ট বেঞ্চ পূর্ণাঙ্গ রায়ে এ পর্যবেক্ষণ দেয়। একইসঙ্গে মামলার বিচারের সময় ফৌজদারি কার্যবিধির ৪৬৫, ৪৬৭, ৪৬৮, ৪৬৯ ও ৪৭১ ধারার বিধানসমূহ ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক পরিপালন না করার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি নূরের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ থেকে তাকে খালাস দেওয়া হয়েছে।
রায়ে হাইকোর্ট বলেছে, ১৪ বছরের শিশু আমেনাকে হত্যার ২৩ দিন পর ২০১০ সাল থেকেই কারাগারে রয়েছেন দণ্ডিত আসামি। ইতিমধ্যে ১৬ বছর অতিবাহিত হয়েছে। এর মধ্যে ৭ বছর কনডেম সেলে রয়েছে সে। কখনই তাকে জামিন দেওয়া হয়নি। এখন যদি আইনের বিধান পরিপালন করে মামলাটি পুনর্বিচারের জন্য রিমান্ডে পাঠানো হয় তাহলে এই আসামির প্রতি চরম অবিচার করা হবে। শুধু অবিচারই নয়, আইনি প্রক্রিয়ার এক পণ্ডশ্রম বা নিষ্ফল প্রয়োগ হবে বলে আমরা (হাইকোর্ট) মনে করি। এ কারণে তাকে খালাস দেওয়াটাই যুক্তিযুক্ত হবে।
যেসব আইনি প্রক্রিয়া লংঘন করেছে ট্রাইব্যুনাল
মামলার নথি পর্যালোচনা করে হাইকোর্ট রায়ে বলেছে, ২০১৪ সালের ২৫ মার্চ ও ১৬ জুন আসামিকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়নি। ঐ বছরের ১৩ আগস্ট, ২৪ সেপ্টেম্বর ও ২৭ অক্টোবর ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক প্রদত্ত তিনটি আদেশে বিচারক লিখেছেন, ‘আসামি নূর চিকিত্সার জন্য পাবনা মানসিক হাসপাতালে চিকিত্সাধীন রয়েছেন’। ২০১৫ সালের ২৫ জানুয়ারি আসামিকে হাজির করে ট্রাইব্যুনালে। ঐদিন কয়েকজন সাক্ষীকে জেরা ও জবানবন্দি গ্রহণ করা হয়। হাইকোর্ট বলেছে, আইনের সুপ্রতিষ্ঠিত নীতি হলো যদি কোনো আসামি মানসিকভাবে অসুস্থ বলে প্রতীয়মান হয় এবং বিষয়টি আদালতের নজরে আসে তখন সংশ্লিষ্ট বিচারক অবিলম্বে মামলার বিচারকাজ স্থগিত রাখবেন। আসামির সুস্থতার বিষয়ে উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের নিকট থেকে ইতিবাচক প্রতিবেদন না পাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করবেন। কিন্তু বিচারক বিচারকাজ স্থগিত না করে বিচার প্রক্রিয়া চালিয়ে গেছেন। মামলার নথিপত্রে আমরা পাবনা মানসিক হাসপাতালের এমন কোনো কাগজপত্র পাইনি যেখানে আসামি মানসিকভাবে সুস্থ হয়ে উঠেছিলেন।
রায়ে হাইকোর্ট আরো বলেছে, ২০১১ সালের ৫ জানুয়ারি আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচারক। মৃত্যুদণ্ডের বিধান রয়েছে এমন মামলায় অভিযোগ গঠনের পূর্বে আসামিকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দিতে হয়—এটাই আইনের বিধান। কিন্তু সেটা না করে অভিযোগ গঠনের পর আসামির পক্ষে রাষ্ট্র নিযুক্ত আইনজীবী নিয়োগ দেন ট্রাইব্যুনালের বিচারক। ফলে অভিযোগ গঠন থেকে অব্যাহতি চেয়ে আসামি কোনো আবেদন দাখিল করতে পারেননি। এতে আসামি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। হাইকোর্ট বলেছে, প্রথম যাকে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী করা হয়েছিল তিনি আসামির পক্ষে কোনো আইনি পদক্ষেপ নেননি। পরবর্তীকালে আরেকজনকে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী করা হয়। ফলে এই আইনজীবী পর্যাপ্ত সময় পাননি আসামির পক্ষে আইনগত সহায়তা দিতে। ফলে যথাসময়ে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী নিয়োগ না দিয়ে সাক্ষী পরীক্ষা করা এবং মানসিক সুস্থতা নিশ্চিত না করেই বিচারকাজ পরিচালনা ও তা শেষ করার বিষয়টি ছিল একটি ত্রুটিপূর্ণ বিচার। এটা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।
মানসিকভাবে সুস্থ থাকলে মুক্তি নইলে আশ্রমে রাখার নির্দেশ
হাইকোর্ট রায়ে বলেছে, স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি, ভিকটিমকে হত্যার কারণ এবং ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক প্রদত্ত আদেশসমূহে আসামির মানসিক অসুস্থতার বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হলো। একই সঙ্গে অন্যান্যদের নিরাপত্তার স্বার্থে মানসিক হাসপাতালের একজন বিশেষজ্ঞ চিকিত্সক দিয়ে আসামি নূরের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করানোর জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেওয়া হলো। স্বাস্থ্য পরীক্ষায় যদি তার সুস্থতার প্রমাণ পাওয়া যায়—তাহলে তাকে কারাগার থেকে মুক্তি দিতে বলা হলো। যদি মানসিকভাবে অসুস্থ থাকে তাহলে তাকে যেন কোনো আশ্রমে রাখা হয়।
প্রসঙ্গত: ১৪ বছরের শিশু আমেনাকে ধর্ষণ ও হত্যার অভিযোগে ২০১০ সালের ২১ মার্চ পিরোজপুরের মঠবাড়িয়া থানায় এজাহার দায়ের করেন ভিকটিমের মা ফাতেমা বেগম। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ৯(২) ধারায় দায়েরকৃত এজাহারে প্রতিবেশী নূর মোহাম্মদকে আসামি করা হয়। এজাহারে বলা হয়, প্রতিবেশী দূরসম্পর্কের চাচা নূর মোহাম্মদ তাকে বাঁশ কাটার কথা বলে বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে গেছে। পরে ভিকটিমের লাশ খালের পাড়ে দেখতে পাওয়া যায়। ঘটনার ২৩ দিন পর স্থানীয় জনতা আসামিকে আটক করে পুলিশের হাতে দেয়। পরদিনই ম্যাজিস্ট্রেটের নিকট স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয় আসামি। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল ২০১১ সালের ৫ জানুয়ারি আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরু করে। আট জন সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে ২০১৯ সালে আসামি নূরকে মৃত্যুদণ্ড দেয় ট্রাইব্যুনাল। এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেন তিনি। যা নিষ্পত্তি করল হাইকোর্ট।
নয়া দিগন্ত
‘ইসলামী ব্যাংকে এস আলমের ৮২% শেয়ার অবরুদ্ধ, হাইকোর্টের রুল’—এটি দৈনিক নয়া দিগন্তের প্রধান শিরোনাম। খবরে বলা হয়, ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির ৮১ দশমিক ৯২ শতাংশ শেয়ার ২৪টি কোম্পানির মাধ্যমে এস আলমসংশ্লিষ্টদের বেআইনিভাবে কেন্দ্রীভূত ও নিয়ন্ত্রণের অভিযোগে দায়ের হওয়া রিটে হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সাথে ওই ২৪টি কোম্পানির নামে থাকা ইসলামী ব্যাংকের এসব শেয়ার আগামী তিন মাসের জন্য ফ্রিজ করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির স্পন্সর শেয়ারহোল্ডার প্রতিষ্ঠান ইসলামিক ইকোনমিক রিসার্চ ব্যুরো (আইইআরবি) এ বিষয়ে রিট আবেদন করলে আদালত এ আদেশ দেন।
বিচারপতি কে এম কামরুল কাদের এবং বিচারপতি মো: লুৎফর রহমানের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বিভাগের বেঞ্চ গত ৩০ আগস্ট এ রুল জারি করেন এবং এ সংক্রান্ত লিখিত রায় প্রকাশ করা হয়। গতকাল শুক্রবার বিষয়টির বিস্তারিত জানান আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির। এর ফলে ইসলামী ব্যাংকের মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ কাঠামো নিয়ে দীর্ঘদিনের বিতর্ক নতুন করে আইনি পর্যায়ে গড়াল।
রিটে অভিযোগ করা হয়, ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১-এর ১৪ক ও ১৪খ ধারার বিধান লঙ্ঘন করে ২৪টি কোম্পানির মাধ্যমে ইসলামী ব্যাংকের বিপুলসংখ্যক শেয়ার কেন্দ্রীভূত করা হয়েছে। এসব শেয়ার ধারণের বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের নিষ্ক্রিয়তাকে কেন বেআইনি ঘোষণা করা হবে না এবং আইন অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট শেয়ার বাজেয়াপ্ত করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিষ্ক্রিয়তা কেন বেআইনি ঘোষণা করা হবে না- তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেন আদালত।
১০ শতাংশের সীমা
ব্যাংক কোম্পানি আইন অনুযায়ী একটি ব্যাংকের শেয়ার মালিকানায় নির্দিষ্ট সীমা রয়েছে। একই ব্যক্তি, গ্রুপ বা পরিবারের স্বার্থসংশ্লিষ্ট মালিকানার ক্ষেত্রে ১০ শতাংশের বেশি শেয়ার ধারণের সুযোগ না থাকার বিধান রয়েছে। কিন্তু রিটে দাবি করা হয়েছে, ইসলামী ব্যাংকের ক্ষেত্রে এস আলম-সংশ্লিষ্ট ২৪টি কোম্পানি প্রাতিষ্ঠানিক শেয়ারহোল্ডার হিসেবে যুক্ত হয়ে সম্মিলিতভাবে ব্যাংকের ৮১ দশমিক ৯২ শতাংশ শেয়ার নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে।
রিটকারীর বক্তব্য অনুযায়ী, এভাবে বিভিন্ন কোম্পানির নামে শেয়ার ধারণের মাধ্যমে আইনগত মালিকানা কাঠামোর আড়ালে একটি গোষ্ঠীর হাতে ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রীভূত করা হয়েছে।
আইন অনুযায়ী নির্ধারিত সীমার অতিরিক্ত শেয়ার নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যবস্থা নেয়ার এখতিয়ার রয়েছে। রিটে অভিযোগ করা হয়েছে, বিপুলসংখ্যক শেয়ার নির্ধারিত সীমার বাইরে কেন্দ্রীভূত হওয়ার পরও এ বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া হয়নি।
তিন মাসের জন্য শেয়ার ফ্রিজ
রুল জারির পাশাপাশি হাইকোর্টের অন্তর্বর্তীকালীন আদেশে ২৪টি কোম্পানির নামে থাকা ইসলামী ব্যাংকের ৮১ দশমিক ৯২ শতাংশ শেয়ার তিন মাসের জন্য ফ্রিজ করার নির্দেশ দেয়া হয়। ফলে এ সময় এসব শেয়ার হস্তান্তর, বিক্রি বা মালিকানা পরিবর্তনের মাধ্যমে ব্যাংকের শেয়ার কাঠামোয় নতুন কোনো পরিবর্তন আনার সুযোগ থাকবে না- আদালতের আদেশের কার্যকারিতা অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে তা নিশ্চিত করতে হবে।
এর আগে ইসলামী ব্যাংকের বিপুলসংখ্যক শেয়ার এস আলম-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে যাওয়ার বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা ও বিতর্ক সৃষ্টি হয়। বিশেষ করে একাধিক প্রতিষ্ঠানের নামে শেয়ার ধারণের মাধ্যমে ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ একটি গোষ্ঠীর হাতে কেন্দ্রীভূত করার অভিযোগ ওঠে। এবার সেই মালিকানা কাঠামো নিয়ে সরাসরি আদালতের হস্তক্ষেপের ফলে বিষয়টি নতুন মাত্রা পেল।
বণিক বার্তা
দৈনিক বণিক বার্তার প্রধান শিরোনাম ‘বিদ্যুৎ-গ্যাস খাত সংস্কারে নেই সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা, আমদানি ও নতুন বড় প্রকল্পেই বেশি ঝোঁক’। খবরে বলা হয়, দেশের বিদ্যুৎ খাতের একক ক্রেতা বিপিডিবি। উৎপাদন, ক্রয় ও বিতরণ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত এ সংস্থার আর্থিক চাপ দীর্ঘদিনের। বেসরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ কেনার ওপর নির্ভরতা বাড়ায় বিপিডিবির নিজস্ব অনেক কেন্দ্রের সক্ষমতা পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না।
জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আগামী পাঁচ বছরের জন্য বড় পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। নতুন টার্মিনাল নির্মাণের মাধ্যমে বাড়ানো হবে এলএনজি আমদানির সক্ষমতা, নির্মাণ করা হবে গ্যাসভিত্তিক ও কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র, নেয়া হবে আরো একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের মতো বড় প্রকল্প। ২০৩১ সালের মধ্যে এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
রোডম্যাপে গ্যাস সরবরাহ বাড়াতে নতুন পাইপলাইন নির্মাণ, নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে বড় পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা তৈরি এবং গ্যাস ও বিদ্যুৎ খাতের প্রশাসনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক অদক্ষতার বিষয়ও তুলে ধরা হয়েছে। তবে এসব দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে কাঠামোগত সংস্কার কীভাবে করা হবে এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর দক্ষতা কীভাবে বাড়ানো হবে, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কৌশল ও সময়ভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা কী, তা সুনির্দিষ্ট করে বলা নেই। বরং নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ সক্ষমতার বিষয়টি সামনে রেখে জ্বালানি নিরাপত্তার নামে নতুন অবকাঠামো ও বড় প্রকল্প বাস্তবায়নের দিকেই সরকারের ঝোঁক বেশি বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞ ও অর্থনীতিবিদরা।
কৌশলগত ফ্রেমওয়ার্কে জ্বালানি সরবরাহ বাড়াতে খুলনা ও বরিশালে দুটি নতুন এলএনজি টার্মিনাল বা এফএসআরইউ নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। পাশাপাশি ভোলার গ্যাস ব্যবহার করে ৪০০ মেগাওয়াটের গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র, মাতারবাড়ী ও পায়রায় দুটি বড় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং আরো একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনাও রয়েছে। সরকারের বিবেচনায় এসব নতুন বড় প্রকল্প ভবিষ্যৎ বিদ্যুৎ ও জ্বালানি চাহিদা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। যদিও বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের সংকটের সমাধান শুধু নতুন প্রকল্প নির্মাণে নয়। বরং বিদ্যমান ব্যবস্থার দুর্বলতা চিহ্নিত করে সেখানে সংস্কার করাই প্রথম কাজ হওয়া উচিত।
দেশের গ্যাস চাহিদা মেটাতে এরই মধ্যে এলএনজি আমদানির ওপর নির্ভরতা তৈরি হয়েছে। নতুন দুটি এফএসআরইউ নির্মাণ হলে আমদানির সক্ষমতা আরো বাড়বে। একইভাবে কয়লা ও পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের ক্ষেত্রেও বিদেশী প্রযুক্তি, অর্থায়ন, সরঞ্জাম ও জ্বালানি সরবরাহের ওপর নির্ভরতা থাকবে। আর এ ধরনের পরিকল্পনার সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো আন্তর্জাতিক বাজার। বৈশ্বিক জ্বালানির দাম বেড়ে গেলে কিংবা যুদ্ধ, নিষেধাজ্ঞা বা ভূরাজনৈতিক সংকটে সরবরাহ ব্যবস্থা ব্যাহত হলে দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ব্যয় দ্রুত বেড়ে যেতে পারে। সাম্প্রতিক বছরগুলোর জ্বালানি সংকটই এর বাস্তব উদাহরণ। গ্যাস ও জ্বালানি সংকট মোকাবেলায় গত কয়েক বছরে সরকারকে বড় অংকের অর্থ ব্যয় করতে হয়েছে।
অর্থনীতিবিদ ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এখন আমদানিনির্ভরতা কমানোর পরিকল্পনা করা প্রয়োজন ছিল। অথচ নতুন এলএনজি টার্মিনাল ও বড় বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা সে নির্ভরতা আরো দীর্ঘায়িত করতে পারে। সেক্ষেত্রে স্থানীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়ানো, বিদ্যমান বিদ্যুৎ কেন্দ্রের দক্ষতা উন্নয়ন, সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থার দুর্বলতা দূর করা এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর দিকে বেশি নজর দেয়া উচিত। এসব সংস্কার ছাড়া শুধু নতুন অবকাঠামো নির্মাণ করলে ভবিষ্যতে আমদানি ব্যয় ও আর্থিক ঝুঁকি আরো বাড়তে পারে।
দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার অন্যতম ভিত্তি হতে পারে নিজস্ব গ্যাস। কিন্তু স্থানীয় গ্যাসের উৎপাদন ও অনুসন্ধান বাড়ানোর বিষয়ে দীর্ঘমেয়াদি ও বাস্তবায়নযোগ্য পরিকল্পনা কতটা কার্যকরভাবে নেয়া হচ্ছে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন টার্মিনাল নির্মাণের আগে দেশে কোথায় কী পরিমাণ গ্যাসের সম্ভাবনা রয়েছে, কত দ্রুত তা অনুসন্ধান করা সম্ভব এবং বিদ্যমান গ্যাস ক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন কীভাবে বাড়ানো যায়—এসব বিষয়ে সুস্পষ্ট লক্ষ্য নির্ধারণ করা জরুরি।
আজকের পত্রিকা
‘সরকারি হাসপাতালের খাবার: মুখে রোচে না, মানেও প্রশ্ন’—এটি দৈনিক আজকের পত্রিকার প্রধান শিরোনাম। খবরে বলা হয়, দুপুরের পাতে দুই বাটি ভাত, একটু করে ডাল ও সবজি আর এক টুকরা মুরগির মাংস। খাবারের তালিকায় দৃশ্যত কোনো ঘাটতি নেই। কিন্তু মুখে তুলতেই আসবে হতাশা। মাংসের তরকারিতে স্বাদ নেই। ডাল যেন হলুদ গোলা পানি—তাতে ডালের দানা খুঁজে পাওয়া কঠিন। লাউ, পেঁপে কিংবা আলুর সবজিও বিস্বাদ। রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন হনুফা আক্তারের (ছদ্মনাম) সঙ্গে কথা বলে তাঁর এই মত পাওয়া গেল। ওয়ার্ডের রোগীদের মধ্যে তাঁর কথায় সায় দেওয়ার লোকেরও অভাব হয়নি।
যকৃতের জটিলতা নিয়ে এক মাসের বেশি সময় ধরে সোহরাওয়ার্দী মেডিকেলে ভর্তি হনুফা। কয়েক দিন আগে সার্জারি বিভাগের ১০৪ নম্বর ওয়ার্ডে তাঁর সঙ্গে কথা হয়। চিকিৎসার জন্য দক্ষিণাঞ্চল থেকে ঢাকায় এসেছেন হনুফা। রাজধানীতে ঘনিষ্ঠ কোনো আত্মীয়স্বজন নেই। ফলে হাসপাতালের খাবারের ওপরই নির্ভর করতে হয়েছে তাঁকে।
হনুফা জানান, সকালে তাঁকে তিন পিস রুটি, একটি কলা ও একটি ডিম দেওয়া হয়। বিকেলে চার পিস বিস্কুটের একটি প্যাকেট। দুপুরে ভাত, ডাল, সবজি ও মাংস এবং রাতে ভাত, মাছ ও ডাল দেওয়া হয়। তবে হাসপাতালের রান্না করা খাবার মুখে একেবারেই রোচে না বলে কখনো কখনো এ শহরে থাকা গুটিকয়েক স্বজনের ওপর ভরসা করতে হয়। প্রায়ই বাইরে থেকে খাবার কিনেও আনেন। লম্বা সময় হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে বলে এ বাড়তি খরচ তাঁর সীমিত আয়ের সংসারের ওপর চাপ তৈরি করছে।
হনুফা বেগমের মতোই অভিজ্ঞতা জাতীয় গ্যাস্ট্রোলিভার ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে ভর্তি হওয়া চুয়াডাঙ্গার বাসিন্দা আকবর হোসেনের (ছদ্মনাম)। পিত্তথলির সমস্যার জন্য তাঁর অস্ত্রোপচার হয়েছে। সার্জিক্যাল গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি বিভাগের ৭০৩ নম্বর ওয়ার্ডের রোগী আকবর জানান, সকালে ছয় পিস রুটি, একটি ডিম ও একটি কলা দেওয়া হয়। দুপুরের মেনুতে থাকে ভাত, লাউ-আলুর সবজি, ডাল ও মুরগি এবং রাতে ভাত, ডাল ও রুই মাছ। পদ নিয়ে সমস্যা নেই। সমস্যা একটাই—খাবার নিতান্ত স্বাদহীন। আকবরের ভাষ্য, একজন রোগীর এ খাবার খেয়ে সহজে সুস্থ হওয়ার কথা নয়।
দেশের সরকারি হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের খাবারের দৈনিক বরাদ্দ খুব বেশি নয়। ২০০৯ সালে তা ৪৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৭৫ টাকা এবং ২০১৩ সালে ১২৫ টাকা করা হয়েছিল। তার প্রায় এক দশক পর ২০২২ সালের ১০ অক্টোবর বরাদ্দ বেড়ে ১৭৫ টাকা হয়। ১৫ শতাংশ ভ্যাট বাদ দিলে কার্যকর বরাদ্দ থাকে ১৪৮ টাকা ৭৫ পয়সা। এই অর্থের মধ্যেই একজন রোগীর তিন বেলার খাবারের ব্যবস্থা করতে হয়।
২০১৩ সালের ‘ডায়েট স্কেলে’ সরকারি হাসপাতালে সাধারণ রোগীর জন্য নির্দিষ্ট পরিমাণ খাবারের বিধান ছিল। সকালের নাশতায় ১৫০ গ্রাম পাউরুটি, চার ইঞ্চির একটি কলা, ২০ গ্রাম চিনি ও একটি সেদ্ধ ডিম; দুপুর ও রাতে এক কেজি ওজনের রুই বা কাতলা মাছের ১৪০ গ্রামের একটি টুকরা অথবা ৩৪০ গ্রাম মুরগির মাংসের সঙ্গে ৩৪০ গ্রাম ভাত, ৪০ গ্রাম মসুর ডাল ও ৪০০ গ্রাম সবজি দেওয়ার কথা। তবে কাগজে-কলমে নির্ধারিত এই পরিমাণের সঙ্গে বাস্তবে রোগীর প্লেটে কতটা খাবার পৌঁছায়, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। নির্ধারিত পরিমাণের তুলনায় কম ও স্বাদহীন খাবার দেওয়ার অভিযোগ দীর্ঘদিনের।
এই প্রতিবেদনের জন্য রাজধানীর চারটি সরকারি বিশেষায়িত হাসপাতাল ঘুরে রোগীদের সঙ্গে কথা বলা হয়েছে এবং তাদের খাবার সরেজমিনে দেখা হয়েছে। এ ছাড়া ঢাকার বাইরের একটি বিশেষায়িত, একটি জেনারেল ও একটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের রোগীদের খাবারের বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে ফোনে কথা বলে তথ্য নেওয়া হয়েছে।
দেশ রূপান্তর
দৈনিক দেশ রূপান্তরের প্রধান শিরোনাম ‘শিক্ষকদের সাত হাজার কোটি টাকা লোপাট’। প্রতিবেদনে বলা হয়, এমপিওভুক্ত বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীদের অবসর-সুবিধা ও কল্যাণ তহবিলের প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকা লোপাটের অভিযোগ উঠেছে। শুধু তা-ই নয়, বিধি লঙ্ঘন করে বিভিন্ন বেসরকারি ব্যাংকে টাকা রাখায় আটকে আছে আরও প্রায় ৬৪০ কোটি টাকা। দীর্ঘদিন ধরে তহবিলের অর্থ না পাওয়ায় ১ লাখ ২৩ হাজার অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক-কর্মচারী ভোগান্তিতে রয়েছেন। অভিযোগ উঠেছে, অবসর ও কল্যাণ বোর্ডে বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের শাসনামলে ৭ হাজার কোটি টাকা লোপাট হয়েছে। পুরো বিষয়টি খতিয়ে দেখতে ৩ সদস্যের তদন্ত কমিটি করেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়।
দীর্ঘ চাকরিজীবন শেষে শিক্ষক-কর্মচারীরা যখন অবসর ও কল্যাণ তহবিলের টাকা পেতে পাখির পলকে তাকিয়ে থাকেন তখন ঘটছে লুটপাটের ঘটনা। এক দুই টাকা নয়, প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকা লোপাট হয়েছে। অবসর ও কল্যাণ বোর্ডের শীর্ষ কর্তা থেকে শুরু করে সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও এর মধ্যে রয়েছেন। নিয়ম লঙ্ঘন করে সরকারি ব্যাংকের পরিবর্তে বেসরকারি ব্যাংকে টাকা রাখায় প্রায় ৬৪০ কোটি টাকা আটকে আছে। অন্যদিকে নামে-বেনামে ভুয়া ইনডেক্স তৈরি করে কোটি কোটি টাকা লোপাটের ঘটনা ঘটেছে।
এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের অবসর-সুবিধা ও কল্যাণ তহবিলের ৭ থেকে ৮ হাজার কোটি টাকা লোপাট হয়েছে বলে জানিয়েছিলেন অন্তর্বর্তী সরকারের শিক্ষা ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা অধ্যাপক ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ। একই কথা জানিয়েছেন বর্তমান শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে শিক্ষকদের অবসরভাতা ও কল্যাণ ট্রাস্টের প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। কারা এর পেছনে জড়িত তা খুঁজে বের করবে বর্তমান সরকার।’
শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে অবসর ও কল্যাণ বোর্ডের যাবতীয় অনিয়ম খতিয়ে দেখতে পাঁচ সদস্যের কমিটি করা হয়েছে। কমিটিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নিরীক্ষা ও আইন শাখার অতিরিক্ত সচিবকে আহ্বায়ক করা হয়েছে। সদস্য করা হয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আইন কর্মকর্তা (অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ) ফায়িম ফয়সালসহ আরও তিন উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তাকে। তদন্তের স্বার্থে মুখ খুলতে চান না কোনো সদস্য।
অবসর-সুবিধা বোর্ডের সচিব মোশাররফ হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অবসর ও কল্যাণ বোর্ডে যেসব অনিয়ম-দুর্নীতি হয়েছে তা খতিয়ে দেখতে এ কমিটি হয়েছে। দুর্নীতির সঙ্গে যারা জড়িত তাদের প্রত্যেকের পরিচয় প্রকাশ করা হবে।
এর আগে ২০২৫ সালের শিক্ষা অডিট অধিদপ্তরের বিশেষ নিরীক্ষায় অবসর সুবিধা বোর্ডের অর্থ ব্যবস্থাপনায় নানা অনিয়ম ও অসংগতি ধরা পড়ে। নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আইন লঙ্ঘন করে সরকারি ব্যাংকের পরিবর্তে বিভিন্ন বেসরকারি ব্যাংকে রাখা আমানতের অর্থ ফেরত না পাওয়ায় বোর্ডের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে ৬৩৯ কোটি ৬০ লাখ ৬১ হাজার ৭২৫ টাকা। প্রতিবেদনে বিভিন্ন অনিয়মের চিত্র উঠে আসে। নিরীক্ষা প্রতিবেদন অনুযায়ী, অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের নামে ভুয়া ইনডেক্সে জাল আবেদনের মাধ্যমে টাকা তোলা হয়েছে। এ বাবদ যে কমিশন আসে তা বোর্ডের নামে ভুয়া অ্যাকাউন্ট তৈরি করে হাতিয়ে নেওয়া হয়। ব্যাংক কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগসাজশে এ টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়।
সরকারি ওই প্রতিবেদনে, অবসর-সুবিধা বোর্ডের সাবেক সচিব অধ্যক্ষ শরীফ আহমদের নাম উঠে এসেছে। বর্তমানে তিনি পলাতক। অধ্যক্ষ শরীফ আহমদের নেতৃত্বে পরিচালিত দুর্নীতিতে আরও তিনজনের নাম উঠে এসেছে। তারা হলেন অবসর বোর্ডের প্রোগ্রামার জামাল হোসেন এবং সফটওয়্যার কোম্পানির মালিক গোলাম সারোয়ার ও মোফাজ্জল মওদুদ এলাহী।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০১৭ সাল থেকে আওয়ামী লীগ সরকার পতন পর্যন্ত প্রায় আট বছর অবসর বোর্ডের সচিবের দায়িত্বে ছিলেন অধ্যক্ষ শরীফ। তিনি দুর্নীতির মাধ্যমে টাকা হাতিয়ে নেওয়ার জন্য গ্রিন বি সফটওয়্যারের সঙ্গে চুক্তি করেন। এ কোম্পানির মালিক ছিলেন গোলাম সারোয়ার ও মোফাজ্জল মওদুদ এলাহী। মোফাজ্জল মওদুদী অধ্যক্ষ শরীফ আহমদের ভাতিজা।
অন্যদিকে, শিক্ষা অডিট অধিদপ্তরের নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আইন লঙ্ঘন করে সরকারি ব্যাংকের পরিবর্তে সাতটি বেসরকারি ব্যাংকে রাখা আমানতের অর্থ ফেরত না পাওয়ায় বোর্ডের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে ৬৩৯ কোটি ৬০ লাখ ৬১ হাজার ৭২৫ টাকা। ব্যাংকগুলো হলো ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, সিটিজেনস ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক ও এক্সিম ব্যাংক। এসব ব্যাংকে রাখা অর্থের বড় একটি অংশ এফডিআর ও এসটিডি হিসেবে ছিল।
অডিট প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অবসর সুবিধা বোর্ডের আইন ও সংশ্লিষ্ট প্রবিধান লঙ্ঘন করে বেসরকারি ব্যাংকে এসব অর্থ রাখা হয়েছিল। পরে ব্যাংকগুলো থেকে আমানতের অর্থ ফেরত চাওয়া হলেও তা পাওয়া যায়নি। এতে তহবিলের ওপর তৈরি হয়েছে বড় ধরনের আর্থিক চাপ।
বাংলাদেশ প্রতিদিন
‘ধীর কর্মসংস্থানের গতি’—এটি দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিনের প্রধান শিরোনাম। খবরে বলা হয়, জুলাই অভ্যুত্থানের অন্যতম বড় দাবি ছিল কর্মসংস্থান বৃদ্ধি ও বৈষম্য দূর করা। কিন্তু সেই প্রত্যাশার বড় অংশই অপূর্ণ রয়ে গেছে। এই সময়ে কর্মসংস্থান তো বাড়েইনি, উল্টো শিল্পকারখানা বন্ধ হয়ে চাকরি হারাতে হয়েছে অনেককে। এ ছাড়া সরকারি নিয়োগ দীর্ঘসূত্রতায় আটকে থাকা, বিনিয়োগ আশানুরূপ না বাড়া; অন্যদিকে প্রতি বছর লাখো শিক্ষিত তরুণ চাকরির বাজারে প্রবেশ করতে না পারা-সব মিলিয়ে দেশে বেকারের সংখ্যা দিনদিন বেড়েই চলেছে। এর মধ্যে অনেকেই জড়াচ্ছেন ছিনতাই, চাঁদাবাজিসহ নানা অপরাধে। কেউ কেউ মাদকেও আসক্ত হচ্ছেন।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী, দেশে সরকারি হিসাবে বেকারের সংখ্যা প্রায় ২৭ লাখ এবং বেকারত্বের হার ৩ দশমিক ৬৬ শতাংশ। তবে অর্থনীতিবিদদের মতে এ হিসাব বাস্তব পরিস্থিতির পুরো চিত্র তুলে ধরছে না। কারণ বিপুলসংখ্যক তরুণ আছেন যাঁরা কাজ খুঁজে হতাশ হয়ে শ্রমবাজার থেকে সরে গেছেন, আবার অনেকে যোগ্যতার তুলনায় অনেক কম মানের কাজে নিয়োজিত। দেশের সবচেয়ে উদ্বেগজনক বাস্তবতা হলো উচ্চশিক্ষিত তরুণদের বেকারত্ব। তথ্যানুযায়ী, বিশ্ববিদ্যালয় বা সমমানের গ্র্যাজুয়েটদের মধ্যে বেকারত্বের হার ১৩ দশমিক ৫৪ শতাংশ, যা সব শিক্ষাস্তরের মধ্যে সর্বোচ্চ। প্রতি বছর দেশের বিশ্ববিদ্যালয় এবং উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে গড়ে প্রায় ৭ লাখ শিক্ষার্থী স্নাতক সম্পন্ন করেন। কিন্তু আনুষ্ঠানিক চাকরি তৈরি হয় মাত্র ৩ লাখের মতো। অর্থাৎ প্রতি বছর প্রায় ৪ লাখ নতুন গ্র্যাজুয়েট দীর্ঘমেয়াদি বেকারত্বের ঝুঁকিতে পড়ছেন। অর্থনীতিবিদরা একে স্কারিং ইফেক্ট হিসেবে উল্লেখ করেন, যেখানে দীর্ঘ সময় চাকরি না পাওয়ার কারণে একজন তরুণের আয়, দক্ষতা ও ভবিষ্যৎ কর্মজীবন স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
কর্মসংস্থানের সঙ্গে সবচেয়ে গভীর সম্পর্ক বিনিয়োগ ও শিল্পোৎপাদনের। নতুন শিল্প না হলে নতুন চাকরি সৃষ্টি হয় না। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, জুন শেষে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে মাত্র ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশে, যা দুই দশকের বেশি সময়ের মধ্যে সর্বনিম্ন। একই সময়ে গ্যাসসংকট, জ্বালানি অনিশ্চয়তা এবং উৎপাদন ব্যয়ের কারণে বহু শিল্পপ্রতিষ্ঠান উৎপাদন কমিয়েছে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) তথ্যানুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত গাজীপুর, সাভার-আশুলিয়া এবং নারায়ণগঞ্জ-নরসিংদীর শিল্পাঞ্চলে ৯৫টি কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়েছে। অন্যদিকে প্রথম ছয় মাসের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, বিজিএমইএর সদস্য অন্তত ৮০টি কারখানায় ১৯ হাজার ১৮৮ শ্রমিক চাকরিচ্যুত বা ছাঁটাই হয়েছেন। এর মধ্যে ২৭টি কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে বলে শিল্পপুলিশ, বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর তথ্যের ভিত্তিতে প্রকাশিত বিশ্লেষণে উঠে এসেছে। অন্যদিকে আগস্ট, ২০২৪ থেকে জুন, ২০২৬ পর্যন্ত দেশের সাতটি প্রধান শিল্পাঞ্চলে ৪৫৭টি শিল্প ইউনিট স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়েছে। এর মধ্যে ছিল বিজিএমইএর সদস্য কারখানা ১০৮, বিকেএমইএর ৩৫, বিটিএমএর ৮ এবং বেপজা-সংশ্লিষ্ট ১৯টি। অর্থাৎ পোশাক, নিটওয়্যার, বস্ত্র ও রপ্তানিমুখী শিল্পের সঙ্গে যুক্ত উল্লেখযোগ্যসংখ্যক প্রতিষ্ঠান এই বন্ধের তালিকায় রয়েছে। বাকি ২৮৭টি ছিল পোশাকবহির্ভূত শিল্প।
সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘দেশে বিনিয়োগ এখনো আশানুরূপ পর্যায়ে পৌঁছায়নি। অনেক শিল্পকারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে কিংবা উৎপাদন কমিয়ে দিচ্ছে। ফলে একদিকে নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে না, অন্যদিকে বিদ্যমান চাকরিও ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে।’ তিনি বলেন, ‘বিনিয়োগ ও শিল্পের গতি না বাড়লে বেকারত্ব কমানো কঠিন হবে। শুধু বিদেশে কর্মী পাঠিয়ে এ সংকট মোকাবিলা করা যাবে না। দেশে টেকসই কর্মসংস্থান তৈরির জন্য শিল্পে বিনিয়োগ ও উৎপাদন বাড়াতে হবে।’
বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনের (বিইএফ) সভাপতি ফজলে শামীম এহসান বলেন, ‘সাম্প্রতিক সময়ে প্রকট হয়ে উঠেছে জ্বালানি অব্যবস্থাপনা। এর কারণে নতুন কর্মসংস্থান তৈরির মতো অনুকূল পরিবেশ যেমন গড়ে উঠছে না, তেমন বিদ্যমান অনেক কারখানাও আগামী দিনে বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। বর্তমান সময়ে নতুন কর্মসংস্থানের পেছনে না ছুটে, কীভাবে বিদ্যমান কারখানাগুলো টিকিয়ে রাখা যায় সেদিকে মনোযোগ দিতে হবে।’