February 23, 2026, 2:30 pm

যশোরের মনিরামপুরে রহস্যজনক মৃত্যুর আড়াই মাস পর কবর থেকে মরদেহ উত্তোলন: পুত্রের বিরুদ্ধে পিতাহত্যার অভিযোগ

জেমস আব্দুর রহিম রানা, যশোর: যশোরের মনিরামপুরে হত্যার অভিযোগে দায়ের হওয়া মামলার অধিকতর তদন্ত নিশ্চিত করতে আড়াই মাস পর কবর থেকে মৃত মজিদ দফাদারের মরদেহ উত্তোলনকে কেন্দ্র করে এলাকায় ব্যাপক আলোচনা, আতঙ্ক এবং ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছে। রোববার (৭ ডিসেম্বর) সকালে আদালতের নির্দেশে নেহালপুর গ্রামের কবরস্থান থেকে মরদেহ উত্তোলনের মাধ্যমে নতুন করে তদন্তের দ্বার উন্মোচিত হয়, যা স্থানীয়দের মাঝে মামলাটিকে ঘিরে বহুদিনের জমে থাকা প্রশ্নগুলোকে আবার সামনে নিয়ে আসে।

মজিদ দফাদারের মৃত্যু প্রথম থেকেই রহস্যজনক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছিল। পরিবারিক দ্বন্দ্ব ও সামাজিক প্রভাবের কারণে ঘটনাটি স্বাভাবিক মৃত্যু হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা হয়েছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। কিন্তু মৃত্যুর পর তার দেহে আঘাতের চিহ্ন দেখে গ্রামের মানুষ সন্দেহ করতে শুরু করে। পরিস্থিতির অবনতি হয় যখন নিহতের জামাই সাত্তার মোল্যা আদালতে পুত্র সোহরাব দফাদারের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করে। স্থানীয় সূত্র বলছে, পিতা–পুত্রের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন বিষয়ে বিরোধ চলছিল, যা এই ঘটনার পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে।

মরদেহ উত্তোলনের সময় কবরস্থানে অনেক স্থানীয় উপস্থিত ছিলেন। তাদের চোখে ছিল বিস্ময়, ক্ষোভ এবং সত্য জানার প্রত্যাশা। স্থানীয় দোকানি শহিদুল ইসলাম বলেন,
“আমরা প্রথম থেকেই বলেছিলাম বিষয়টা ঠিক নেই। কিন্তু কেউ শুনতে চায়নি। এখন অন্তত তদন্তের নতুন পথ খুললো।”

কবরস্থানে উপস্থিত এক যুবক আল আমিন বলেন, “গ্রামজুড়ে একটা ভয়ানক পরিবেশ তৈরি হয়েছিল। কেউ কারও সঙ্গে ঠিকমতো কথা বলত না। এখন সত্য বের হলে মানুষ স্বস্তি পাবে।”

এলাকার শীর্ষ স্থানীয় বিশিষ্টজন ও শিক্ষক মনোয়ার হোসেন বিষয়টিকে সামাজিক অবক্ষয়ের উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, “পিতাকে হত্যা—এটি শুধু একটি পরিবারের ট্রাজেডি নয়; এটি পুরো সমাজের জন্য লজ্জাজনক। তদন্তে সঠিক সত্য উদ্‌ঘাটন মানবিক বিচার নিশ্চিত করবে।”

গ্রামের নারীরাও বিষয়টি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করছেন। রওশন আরা নামের এক নারী বলেন, “আমরা রাতে ঠিকমতো ঘুমাতে পারতাম না এই ঘটনাটার পর। এখন আবার লাশ তোলায় ভয় বাড়ছে, কিন্তু সত্য জানার অপেক্ষায় আছি।”

মরদেহ উত্তোলনের পর স্থানীয় মানুষের মধ্যে আরও একটি বিষয় নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে—কেন এত দেরিতে আদালতে মামলা হলো, কেন শুরুতেই ময়নাতদন্তের উদ্যোগ নেওয়া হয়নি, এবং যদি সত্যিই আঘাতের কারণে মৃত্যু হয়ে থাকে, তবে প্রথম অবস্থাতেই তা কেন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরে আসেনি। এসব প্রশ্ন ঘিরে স্থানীয়দের মধ্যে প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও নানা মতামত দেখা যাচ্ছে।

বর্তমানে মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য যশোর জেনারেল হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনই এখন পুরো ঘটনার মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে। স্থানীয়রা মনে করছেন—এটি শুধু একটি হত্যাকাণ্ডের তদন্ত নয়, বরং একটি পরিবারের ভেতরকার লুকানো সত্য উদ্‌ঘাটনের প্রক্রিয়া। এলাকাবাসীর আশা, তদন্তে যেন কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তি বাধা সৃষ্টি করতে না পারে এবং বিচার যেন রাজনৈতিক বা সামাজিক প্রভাব থেকে মুক্ত থাকে।

এখন সবার দৃষ্টি ময়নাতদন্তের রিপোর্ট এবং পরবর্তী তদন্তের অগ্রগতির দিকে। মনিরামপুরের মানুষ অপেক্ষা করছে—মজিদ দফাদারের মৃত্যু স্বাভাবিক ছিল, নাকি নির্মম হত্যাকাণ্ড—সেই সত্য জানার জন্য।

এই বিভাগের আরও খবর


ফেসবুকে আমরা