September 17, 2026, 5:22 pm

গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটে বিপর্যস্ত বাংলাদেশ, চাপে পোশাকশিল্পও

উপসাগরীয় অঞ্চলের চলমান সংঘাত ও গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে ঝুঁকি তৈরি হওয়ায় বাংলাদেশে এলএনজি সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটেছে। এর প্রভাবে দেশে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট তীব্র হয়ে উঠেছে। রান্না থেকে শুরু করে শিল্পকারখানার উৎপাদন, পোলট্রি খামার ও হাসপাতালের কার্যক্রমেও এর প্রভাব পড়ছে।

ঢাকার বাসিন্দা পারভিন আক্তার জানান, এলাকায় পাইপলাইনে কখন গ্যাস আসে, তা দেখে এখন তাকে রান্নার সময় ঠিক করতে হয়। অনেক দিন রাত ১২টা পর্যন্ত অপেক্ষা করে রাতের খাবার রান্না করতে হয়েছে। বিদ্যুৎচালিত ইন্ডাকশন চুলায় রান্নার চেষ্টা করেও সবসময় কাজ হচ্ছে না। কারণ বিদ্যুৎ চলে গেলে খাবার আধসেদ্ধ অবস্থায় থেকে যাচ্ছে।

আন্তর্জাতিক সংকটে বাড়ছে এলএনজির দাম

ছয় মাসেরও বেশি আগে ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলার পর হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল ও গ্যাস রপ্তানিতে বিঘ্ন শুরু হয়। এর পাশাপাশি সৌদি সমর্থিত ইয়েমেনের সরকারি বাহিনী ও ইরান-সমর্থিত হুতিদের সংঘাতের কারণে লোহিত সাগর দিয়ে বাণিজ্যিক চলাচলও ঝুঁকির মুখে পড়েছে।

গুরুত্বপূর্ণ এই দুই নৌপথ ঘিরে সংকটের প্রভাবে এশিয়ার স্পট বাজারে এলএনজির দাম চলতি সপ্তাহে প্রতি মিলিয়ন ব্রিটিশ থার্মাল ইউনিটে (এমএমবিটিইউ) প্রায় ৩০ ডলারে উঠেছে। যুদ্ধ শুরুর আগে এই দাম ছিল প্রায় ১০ ডলার।

শেল-এর হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছর এখন পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্য থেকে বিশ্ববাজারে প্রায় ৩ কোটি ৬০ লাখ টন এলএনজি সরবরাহ কমেছে।

বিদ্যুৎ উৎপাদনেও প্রভাব

বাংলাদেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের ৪০ শতাংশের বেশি আমদানি করা এলএনজিনির্ভর। একসময় এসব এলএনজির প্রায় ৯৫ শতাংশই কাতার থেকে আমদানি করা হতো। কাতার থেকে সরবরাহে বিঘ্ন ঘটায় এখন বাংলাদেশকে স্পট মার্কেট থেকে তুলনামূলক বেশি দামে এলএনজি কিনতে হচ্ছে।

চলতি সপ্তাহে বিদ্যুৎমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, জ্বালানি সংকটের কারণে শিল্পের প্রবৃদ্ধি ধীর হয়ে যাচ্ছে এবং উৎপাদন কমে যাচ্ছে।

পোশাকশিল্পেও বড় ধাক্কা

দেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানি খাত তৈরি পোশাকশিল্পও গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের প্রভাব থেকে বাদ পড়েনি।

বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) এক জরিপে দেখা গেছে, আগস্টের শেষ দিক থেকে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে ৫৫ শতাংশ নিট পোশাক কারখানার ক্রেতারা অর্ডার বাতিল অথবা কমিয়ে দিয়েছেন। একই সময়ে ৭৮ শতাংশ কারখানা আংশিকভাবে উৎপাদন বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছে।

একটি পোশাক কারখানায় গ্যাসের চাপ কম থাকায় উৎপাদনের মাঝপথে বয়লার নষ্ট হয়ে যায়। কারখানাটির মালিক আলভি ইসলামকে চীন থেকে কাপড় সংগ্রহ করতে হয়। উৎপাদনে দেরি হওয়ায় এক ক্রেতা ৫০ হাজার পিসের অর্ডার কমিয়ে ৪০ হাজার পিস করেন।

জ্বালানি সংকটের কারণে উৎপাদনে বিলম্ব হওয়ায় নির্ধারিত সময়ে পণ্য সরবরাহ করতে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করে বিমানপথে পণ্য পাঠাতে হয়েছে।

পোশাকশিল্পের নির্বাহী ফজলে শামীম এহসান জানান, ফ্রান্সের এক ক্রেতার কাছে হুডি জ্যাকেট পাঠাতে তাদের বিমান পরিবহনে ৫০ হাজার ডলার অতিরিক্ত খরচ হয়েছে।

ফতুল্লা অ্যাপারেলস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এহসান বলেন, কারখানা সচল রাখতে ডিজেল বাবদও তাদের অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে।

বিদ্যুৎ সংকটে পোলট্রি খামার

বিদ্যুৎ সংকটের প্রভাব পড়েছে পোলট্রি খাতেও। টাঙ্গাইল শহরের পোলট্রি খামারি সায়েদুল ইসলাম জানান, বিদ্যুৎ না থাকায় খামারের বৈদ্যুতিক ফ্যান চালাতে পারছেন না। এতে অতিরিক্ত গরমে প্রতিদিন ১৫ থেকে ২০টি মুরগি মারা যাচ্ছে।

হাসপাতালেও দুর্ভোগ

গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটের প্রভাব পড়েছে হাসপাতালেও। সিলেটের একটি হাসপাতালে প্রায় প্রতি ঘণ্টায় বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে। জেনারেটরের মাধ্যমে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ) চালু রাখা সম্ভব হলেও ওয়ার্ডগুলোতে সবসময় পর্যাপ্ত বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা করা যাচ্ছে না। ফলে গরমের মধ্যে ঘিঞ্জি কক্ষে থাকতে হচ্ছে রোগীদের।

সংকট মোকাবিলায় সরকারি উদ্যোগ

সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সংকট মোকাবিলায় বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এফবিসিসিআই) ফজলুল হক জানান, একটি অচল এলএনজি টার্মিনাল দ্রুত মেরামতের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। টার্মিনালটি সচল হলে আরও বেশি এলএনজি ট্যাংকার থেকে গ্যাস খালাস করা সম্ভব হবে।

তবে ব্যবসায়ীদের কেউ কেউ জানিয়েছেন, সাম্প্রতিক দিনগুলোতে গ্যাস সরবরাহ কিছুটা বাড়ায় পরিস্থিতির সামান্য উন্নতি তারা লক্ষ্য করছেন।

রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের পাশাপাশি পাকিস্তানেও গ্যাস ও বিদ্যুতের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে।

এই বিভাগের আরও খবর


ফেসবুকে আমরা