June 2, 2026, 2:55 pm

স্থানীয় সরকার নির্বাচন বিধিতে পরিবর্তনের প্রস্তাব ইসির . আওয়ামী লীগের প্রার্থী ঠেকানোর উদ্যোগ

আগামী অক্টোবরে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর নির্বাচন শুরুর লক্ষ্য নিয়ে প্রস্তুতি নিচ্ছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। স্থানীয় সরকারের পাঁচ স্তরে ধাপে ধাপে নির্বাচনের আয়োজন করা হবে। এরই অংশ হিসেবে বিধিমালা সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

সংশোধিত বিধিমালায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীকে নির্বাচনের বাইরে রাখার পাশাপাশি অনলাইনে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার সুযোগ বন্ধ, পোস্টার ব্যবহার নিষিদ্ধ, প্রবাসীর জন্য পোস্টাল ব্যালট বাতিলসহ নির্বাচনী প্রচারে উপজেলা চেয়ারম্যান ও পৌর মেয়রকে বাদ দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। এ ছাড়া বেশিসংখ্যক প্রার্থীর মনোনয়ন ঠেকাতে জামানতের পরিমাণ বাড়ানোসহ বড় পরিবর্তন আনা হচ্ছে বিধিমালায়।

এদিকে, স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে প্রতীক বিধিমালায় সংশোধনী এনে স্থানীয় নির্বাচনে সংরক্ষিত প্রতীকের সংখ্যা কিছুটা বাড়ানো হচ্ছে। অন্যদিকে, কয়েক ধাপে নির্বাচন আয়োজনের পরিকল্পনা নিয়ে এসব নির্বাচনে সেনা মোতায়েনের পরিকল্পনাও বাদ দেওয়া হচ্ছে।

ইসি সচিবালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কমিশনের যে প্রস্তুতি আছে, তাতে সরকারের চাহিদা অনুযায়ী নির্বাচন আয়োজন সম্ভব। সম্প্রতি স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম সেপ্টেম্বর-অক্টোবর থেকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু করার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন। ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, উপজেলা, সিটি করপোরেশন ও জেলা পরিষদ– এই পাঁচ ধরনের স্থানীয় সরকার নির্বাচন ধাপে ধাপে সম্পন্ন করার সরকারের পরিকল্পনার কথাও জানান প্রতিমন্ত্রী।

যেসব পরিবর্তনের প্রস্তাব
টানা ঈদের ছুটি শুরুর আগেই স্থানীয় সরকার নির্বাচন পরিচালনা বিধিমালা, আচরণ বিধিমালা এবং নির্বাচনী প্রতীক সংরক্ষণ আইন সংশোধনের কাজ অনেকটাই এগিয়ে রেখেছে ইসি। এ বিষয়ক কমিটি দুদফা বৈঠকও করেছে। সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা খসড়া প্রণয়নের কাজ প্রায় শেষ করে এনেছেন।

ঈদের ছুটি শেষে এখন বিধিমালা সংশোধনের এই কাজই জোরদার করেছে ইসি। খসড়া হাতে পেলে কমিশন বৈঠক করে চূড়ান্ত করার কথা রয়েছে। তবে সব কিছু চূড়ান্ত করার আগে রাজনৈতিক দলগুলোসহ অংশীজনের সঙ্গে বৈঠক করে তাদের মতামতও নেবে ইসি।

সূত্র বলছে, প্রস্তাবিত আচরণবিধি চূড়ান্ত হলে সংসদ নির্বাচনের মতো স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীর প্রার্থী হওয়ার পথ বন্ধ হতে যাচ্ছে। কারণ কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগ ও নিষিদ্ধ দলগুলোর নেতাকর্মীরা যাতে প্রার্থী হতে না পারেন, সেজন্য নির্বাচন আচরণ বিধিমালাগুলোতে নতুন বিধি যুক্তের প্রস্তাব করেছে ইসি। প্রস্তাবিত ওই বিধিতে বলা হয়েছে, নির্বাচনে সম্ভাব্য প্রার্থীকে নিষিদ্ধ বা নিষেধাজ্ঞার আওতাধীন কোনো রাজনৈতিক দল বা সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ততা নেই– এই মর্মে ইসির তৈরি করা অঙ্গীকারনামায় সই দিতে হবে। সংশ্লিষ্টরা জানান, অঙ্গীকারনামায় সঠিক তথ্য না দিলে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ থাকবে ইসির। ফলে পদধারী আওয়ামী লীগ নেতা ও কর্মীর নির্বাচন থেকে দূরে থাকতে হবে। কারণ সন্ত্রাসবিরোধী আইনে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ রয়েছে।

সংশোধিত বিধিমালায় সংসদের মতো স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও প্রচারণায় পোস্টার ব্যবহার বাদ দেওয়া হচ্ছে। তবে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মতো কাপড় ও চটের তৈরি ব্যানার-ফেস্টুন ব্যবহার করা যাবে। প্রার্থী ও প্রতীকের ছবি থাকবে। বিলবোর্ডের মাধ্যমেও প্রচার চালাতে পারবেন প্রার্থীরা। সে ক্ষেত্রে ওয়ার্ডে একটি বিলবোর্ড স্থাপন করা যাবে।

অন্যান্য সংশোধনীর মধ্যে দলীয় প্রতীকে নির্বাচনের বিধান বাতিল হওয়ায় স্বতন্ত্র প্রার্থীর ভোটারের সমর্থন যুক্ত তালিকা বাদ যাচ্ছে। অনলাইনে মনোনয়ন জমা দেওয়ার বিষয়টি বাদ দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে নির্বাচনী প্রচারে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের অনুমোদন দেওয়া হচ্ছে। ফলে ডিজিটাল ও সামাজিক মাধ্যমে প্রচার করা যাবে। অনেকটা জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আদলে এ সুযোগ দেওয়া হচ্ছে।

ইসির খসড়ায় ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে কোনো প্রার্থীর পক্ষে উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যান এবং পৌরসভার মেয়রের প্রচারে অংশ নেওয়ার ওপর বিধিনিষেধ আরোপের প্রস্তাব করা হয়েছে। ‘সরকারি সুবিধাভোগী অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি’র সংজ্ঞায় উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যান এবং পৌর মেয়রকে যুক্ত করা হচ্ছে। ফলে মন্ত্রী, এমপি ও সিটি করপোরেশনের মেয়রের পাশাপাশি তারা ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন কর্মকাণ্ডে যুক্ত হতে পারবেন না।

এ ছাড়া সংশোধিত বিধিমালায় উপজেলা পরিষদে এমপির জন্য কক্ষ বরাদ্দের কথা বলা হচ্ছে। এটি বাস্তবায়িত হলে তপশিল থেকে ভোটের ফল প্রকাশ পর্যন্ত এমপিদের উপজেলার অফিস ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা আসতে পারে। এ সময় এমপিরা শুধু ভোট দিতে কেন্দ্রে যেতে পারবেন। প্রচারণায় অংশ নিতে পারবেন না।

স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থীদের মনোনয়ন ফরমেও বেশ কিছু পরিবর্তনের আভাস পাওয়া গেছে। হলফনামায় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থীরা যেভাবে হলফনামা জমা দেন তার আদলে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের হলফনামা করার চিন্তা করা হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে সংসদ সদস্য প্রার্থীর মতো স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও প্রার্থীকে দেশের সম্পদের পাশাপাশি বিদেশের সম্পদের তথ্য দেওয়ার বিষয়টি যুক্ত করা হতে পারে।

এদিকে, সংশোধিত বিধিমালায় স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে প্রার্থীর জামানত ও নির্বাচনী ব্যয়ের পরিমাণ বাড়তে পারে। অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমন্বয় রেখে উপজেলায় কিছুটা কমতে পারে। প্রার্থীদের জামানত বাজেয়াপ্তে বাড়ানো হতে পারে প্রদত্ত ভোটের হার। বিদ্যমান নিয়মে ১২ শতাংশের কম ভোট পেলে জামানত বাজেয়াপ্ত হয়, সংশোধিত বিধিমালায় তা ১৫ শতাংশ করা হতে পারে। অর্থাৎ নির্বাচনে প্রদত্ত ভোটের ১৫ শতাংশের কম পেলে ওই প্রার্থীর জামানত বাজেয়াপ্ত হবে।

এদিকে, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর নির্বাচনের তপশিল যথাসময়ে ঘোষণার সুবিধার্থে নির্বাচনী ক্যালেন্ডার-বিষয়ক সফটওয়্যার প্রস্তুত করা হয়েছে। স্থানীয় সরকারের সর্বশেষ নির্বাচনের তারিখ, গেজেট প্রকাশের তারিখ, শপথ গ্রহণের তারিখ, প্রথম সভার তারিখ, ওয়ার্ড বিন্যাস, ভোটার তালিকা পুনর্বিন্যাস, মামলাসহ নানা বিষয়ে তথ্য অন্তর্ভুক্ত করে হালনাগাদ করা হচ্ছে।

থাকছে না পোস্টাল ব্যালটে ভোট
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটে পোস্টাল ব্যালটে আশানুরূপ সাড়া মেলেনি, পাশাপাশি ব্যয় হয় বিপুল অর্থ। এ পটভূমিতে আসছে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রবাসীর জন্য পোস্টাল ব্যালটে ভোট না রাখার চিন্তা করছে ইসি।

ইসি কর্মকর্তারা বলছেন, জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট সামনে রেখে প্রথমে প্রবাসী বাংলাদেশি এবং পরে দেশের অভ্যন্তরে তিন শ্রেণির ব্যক্তির জন্য আইটি সাপোর্টেড পোস্টাল ব্যালটে ভোটের পদ্ধতি চালু করে ইসি। এতে প্রবাসী ভোটারের আগ্রহ কম দেখা যায়। সৌদি আরবসহ কয়েকটি দেশে এ নিয়ে উৎসবের আমেজ দেখা গেলেও অধিকাংশ দেশের প্রবাসীরা বিষয়টিকে গুরুত্ব দেননি। আবার এটি বাস্তবায়ন করতে গিয়েও বিশাল অঙ্কের অর্থের অপচয় হয়েছে। নিবন্ধন করেও অনেকে ভোট না দেওয়ায় এবং প্রক্রিয়াগত জটিলতায় এমন পরিস্থিতির তৈরি হয়।

স্থানীয় সরকার নির্বাচনের সার্বিক প্রস্তুতি প্রসঙ্গে নির্বাচন কমিশনার ও ইসির আইন ও বিধিমালা সংস্কার কমিটির প্রধান আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেন, আপাতত সংসদে পাস হওয়া আইনের আলোকে স্থানীয় সরকার বিধিমালার কোন কোন জায়গায় সংশোধন করা যেতে পারে, সেগুলো নিয়ে কাজ করছি। আইন-কানুন চূড়ান্ত হওয়ার পরই ভোটের তপশিল বিষয়ে ভাবব। তবে সরকার সেপ্টেম্বর-অক্টোবরের কথা বলেছে। আমরাও সেটা নিয়ে চিন্তাভাবনা করছি।

পোস্টাল ব্যালটে ভোট না রাখার চিন্তা প্রসঙ্গে এই নির্বাচন কমিশনার বলেন, প্রবাসীদের দীর্ঘদিনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতেই মূলত আইটি সাপোর্টেড পোস্টাল ব্যালট ভোটিংয়ের ব্যবস্থা নিয়েছিল ইসি। তবে সেই অর্থে সাড়া মেলেনি। এ ছাড়া এই প্রকল্পে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় যেমন হয়েছে, তেমনি ভোটারের অজ্ঞতাসহ নানা কারণে বরাদ্দের অর্থের অপচয় হয়েছে।

তিনি বলেন, এখন বাস্তবতা হচ্ছে, জাতীয় নির্বাচনে পোস্টাল ব্যালটে ভোটের আইন হয়ে যাওয়ায় সেখানে এটা আর বাদ দেওয়ার সুযোগ নেই। তবে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে পোস্টাল ব্যালটে ভোটের ব্যবস্থা না রাখার কথা ভাবা হচ্ছে। ইসির বৈঠকেই এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে।

সমকাল থেকে .

এই বিভাগের আরও খবর


ফেসবুকে আমরা