April 9, 2026, 11:19 am

যুদ্ধবিরতি নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দেওয়ায় বিশ্ববাজারে আবারও বাড়তে শুরু করেছে তেলের দাম।

যুদ্ধবিরতি নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দেওয়ায় বিশ্ববাজারে আবারও বাড়তে শুরু করেছে তেলের দাম। গত বুধবার যুদ্ধবিরতির ঘোষণায় তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে তেলের দাম কমে ৯২ মার্কিন ডলারের নেমে এসেছিল। আজ বৃহস্পতিবার তা আবার ব্যারেল প্রতি ৫ ডলারের বেশি বেড়েছে।

বিশ্বের তেল ও জ্বালানি পণ্যের বাজারের দরদাম প্রকাশকারী শীর্ষ ওয়েবসাইট অয়েলপ্রাইস ডটকমের তথ্য অনুযায়ী, আজ বৃহস্পতিবার (বাংলাদেশ সময়) বেলা সাড়ে ১১ টায় ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম বেড়ে ব্যারেল প্রতি উঠেছে ৯৭ ডলারে।

বাংলাদেশের জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ বলছে, যুদ্ধের কারণে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। এতে সরকারি পরিশোধনাগারের উৎপাদন বন্ধের পথে। দ্বিগুণ দামে পরিশোধিত জ্বালানি তেল কিনতে হচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় কাতার ও ওমান থেকে যে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আনা হতো, সেটার সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেছে। দ্বিগুণের বেশি দামে খোলাবাজার থেকে কেনা হচ্ছে এলএনজি। যুদ্ধবিরতির ফলে পরিস্থিতির উন্নতি হতে শুরু করেছে।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত গতকাল বুধবার রাতে প্রথম আলোকে বলেন, এটা অবশ্যই স্বস্তির খবর। আটকে থাকা ১ লাখ টন অপরিশোধিত তেল চলে আসছে। জ্বালানি তেল ও এলএনজির দাম কমতে শুরু করেছে বিশ্ববাজারে। এতে আমদানি খরচ কমবে, ডলার সাশ্রয় হবে এবং ভর্তুকি কমবে। সব মিলে দেশের অর্থনীতিতে স্বস্তি নিয়ে আসবে।

এদিকে বিবিসির খবর বলছে, যুদ্ধবিরতির খবরে বিশ্ববাজারে গতকাল অপরিশোধিত জ্বালানি তেল বা ব্রেন্ট ক্রুডের দাম প্রায় ১৫ দশমিক ৯ শতাংশ কমে প্রতি ব্যারেল ৯২ ডলারের কাছাকাছি নেমে যায়। যদিও যুদ্ধের আগের পরিস্থিতির তুলনায় দাম এখনো বেশি। যুদ্ধ শুরুর আগে জ্বালানি তেলের দাম ছিল প্রতি ব্যারেল গড়ে ৭০ ডলার, যা একপর্যায়ে ১১৯ ডলারে ওঠে।

বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠান আলফাসেন্সের বিশ্লেষক জ্যাভিয়ার স্মিথ বিবিসিকে বলেন, জ্বালানির দাম আরও বাড়লে বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য নিজের পায়ে কুড়াল মারার মতো হবে। বিষয়টি রাজনৈতিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ।
বিবিসির প্রতিবেদনে বিশ্লেষকেরা বলেন, যুদ্ধবিরতির কারণে জ্বালানি তেল ও গ্যাসের সরবরাহে এখনকার মতো সংকট থাকবে না। যদিও পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে দীর্ঘ সময় লাগতে পারে। কারণ, যুদ্ধে জ্বালানি স্থাপনার ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। সংঘাত আরও বাড়ালে জ্বালানির দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যেতে পারে—যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই ঝুঁকি নিতে চাননি।

বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠান আলফাসেন্সের বিশ্লেষক জ্যাভিয়ার স্মিথ বিবিসিকে বলেন, জ্বালানির দাম আরও বাড়লে বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য নিজের পায়ে কুড়াল মারার মতো হবে। বিষয়টি রাজনৈতিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ।

এশিয়ার দেশগুলোর ক্ষতি বেশি

বিবিসি বলছে, ইরান যুদ্ধের কারণে সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছে এশিয়ার দেশগুলো। কেননা এ অঞ্চলের দেশগুলোই উপসাগরীয় জ্বালানির ওপর বেশি নির্ভরশীল। জ্বালানির উচ্চ মূল্য ও সরবরাহের সংকট মোকাবিলায় গত কিছুদিনে বিভিন্ন দেশের সরকার ও কোম্পানি নানা পদক্ষেপ নিয়েছে। ফিলিপাইনের কথাই বলা যায়। দেশটির জ্বালানি আমদানির ৯৮ শতাংশই আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। হরমুজ বন্ধের পর প্রথম দেশ হিসেবে গত ২৪ মার্চ তারা জাতীয় জ্বালানি জরুরি অবস্থা ঘোষণা করে। দেশটিতে পেট্রলের দাম বেড়ে দ্বিগুণের বেশি হয়ে গিয়েছিল।

অন্যদিকে জেট ফুয়েলের দাম বেড়ে যাওয়ায় এশিয়া অঞ্চলের অনেক বিমান সংস্থা ভাড়া বাড়িয়েছে; সেই সঙ্গে অনেক উড়ান বাতিল হয়েছে।

জাপানের ইনস্টিটিউট অব এনার্জি ইকোনমিকসের গবেষক ইচিরো কুতানি বিবিসিকে বলেন, উন্নয়নশীল এশীয় দেশগুলোর অনেকেরই নিজস্ব পরিশোধনাগার বা পর্যাপ্ত তেল মজুত নেই। ফলে তেলের দামের অভিঘাত তাদের গায়েই বেশি লেগেছে। তিনি আরও বলেন, যুদ্ধবিরতি এশিয়ার জন্য স্বস্তির খবর। এ ব্যবস্থা কার্যকর থাকলে তেলের দাম ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হবে, তবে সময় লাগবে।

অন্যদিকে জেট ফুয়েলের দাম বেড়ে যাওয়ায় এশিয়া অঞ্চলের অনেক বিমান সংস্থা ভাড়া বাড়িয়েছে; সেই সঙ্গে অনেক উড়ান বাতিল হয়েছে।
বাংলাদেশে আপাতত স্বস্তি

যুদ্ধবিরতির খবর বাংলাদেশের জন্য আপাতত স্বস্তি এনেছে। যুদ্ধের কারণে পারস্য উপসাগরে তেল ও এলএনজি নিয়ে বাংলাদেশমুখী দুটি ট্যাংকার (জাহাজ) প্রায় এক মাস ধরে আটকে ছিল। যুদ্ধবিরতির সুযোগে এই দুই ট্যাংকার এখন বাংলাদেশে রওনা হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। তবে হরমুজ প্রণালি খুলবে কিনা তা নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে।

জ্বালানি তেল আমদানি করে সরকারি সংস্থা বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। এ সংস্থার দায়িত্বশীল দুই কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলে পারস্য উপসাগর থেকে হরমুজ প্রণালি হয়ে এক লাখ টন অপরিশোধিত তেলবাহী ট্যাংকারটি রওনা দেবে। পাশাপাশি সৌদি আরবের ইয়ানবু বন্দর থেকেও আসবে একটি ট্যাংকার। তাঁরা আরও বলেন, যুদ্ধবিরতির ফলে মধ্যপ্রাচ্যের বাইরের দেশ থেকে যেসব জাহাজ আসেনি, সেগুলো এ মাসে আনার চেষ্টা চলছে। গত মাসে ডিজেলের ছয়টি জাহাজ সূচি অনুসারে আসেনি। এসব জাহাজ এ মাসে আসতে পারে। এ ছাড়া আশা করা যায়, এখন নিয়মিত সূচি অনুযায়ী জাহাজ আসবে।

বাংলাদেশ তেল, গ্যাস, খনিজ সম্পদ করপোরেশন (পেট্রোবাংলা) সূত্র বলছে, এলএনজি নিয়েও কিছুটা স্বস্তিজনক খবর আছে। যুদ্ধবিরতির পর পারস্য উপসাগরে আটকে থাকা এলএনজিবাহী ‘লিব্রেথা’ ট্যাংকারটিও এখন বাংলাদেশের উদ্দেশে রওনা হতে পারবে। অবশ্য দীর্ঘ মেয়াদি চুক্তির আওতায় আগামী মে মাসের মাঝামাঝি পর্যন্ত এলএনজি সরবরাহ বন্ধ রাখার কথা জানিয়েছিল কাতার ও ওমান। উৎপাদন স্বাভাবিক করতে পারলে দেশ দুটি এলএনজি সরবরাহ শুরু করতে পারে। অবশ্য এপ্রিলের চাহিদা পূরণে খোলাবাজার থেকে সরকার এলএনজি কেনা বাড়িয়েছে। মে মাসের জন্যও ইতিমধ্যে কেনা শুরু করেছে।

পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান মো. এরফানুল হক গতকাল রাতে প্রথম আলোকে বলেন, যুদ্ধবিরতির খবর বাংলাদেশের জন্য স্বস্তির। বিশ্ববাজারে এলএনজির দাম কমতে শুরু করেছে। গড়ে প্রতি ইউনিট ২০ ডলারে কিনতে হচ্ছিল। গতকাল বিশ্ববাজারে এটি কমে ১৬ দশমিক ৩৪ ডলারে নেমেছে (কমেছে প্রায় ১৮ শতাংশ)। মে মাসের জন্য খোলাবাজার থেকে কম দামে এলএনজি কেনার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

প্রথম আলো থেকে ।

এই বিভাগের আরও খবর


ফেসবুকে আমরা