মোঃ জাহিদুর রহিম মোল্লা রাজবাড়ী জেলা প্রতিনিধি ,
বাবার আদর ও মায়ের স্নেহ নিয়ে বেড়ে উঠার কথা যখন, ঠিক তখনই স্বপ্নের মতো মাত্র ৮ মাসের ব্যবধানে পৃথিবী থেকে চির বিদায় নিয়েছে বাবা-মা দু’জনই। বাবা-মা হারিয়ে দুই নাবালক শিশু রিয়ান ও তাসকিন একদম নির্বাক হয়ে পড়েছে। তাদের কান্নায় আজও ভারি হয়ে আছে রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দি উপজেলার ইসলামপুর ইউনিয়নের শেকাড়া গ্রামের বাতাস। আর তাদের আর্তচিৎকারে ব্যাকুল হয়ে পড়েছে বৃদ্ধ নানি, অর্ধ বয়স্ক মামা-মামি সহ প্রতিবেশিরা। শত চেষ্টাতেও থামছে না যমজ দুই শিশু সন্তান রিয়ান আর তাসকিন (৯) এর অশ্রু বিসর্জন। শিশু রিয়ান ও তাসকিন ২০২৫ সালে বহরপুর অক্সফোর্ড আইডিয়াল স্কুল এন্ড ক্যাডেট একাডেমি থেকে ৪র্থ শ্রেণীর পরীক্ষা দিয়ে ভালো ফলাফল করে ৫ম শ্রেণীতে উর্তিন্ন হয়েছে।
শেকাড়া গ্রামে বাবা মায়ের আদর স্নেহ হতে চিরবঞ্চিত এ দুই শিশুর জীবন-জীবিকা কেমন করে চলবে। কে নেবে তাদের লেখাপড়া, অন্নবস্ত্র বাসস্থানের দায়িত্ব। এ ভাবনা কেবল এখন তাদের নানি, মামা- মামির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। ছড়িয়ে পড়েছে তাদের প্রতিবেশীসহ গ্রামের সবার মাঝে।
প্রতিবেশী নুরুল ইসলাম ও আব্দুল গফ্ফারসহ অন্যান্যরা বলেন, এ গ্রামের মনিরুল ইসলাম খোকন পেশায় ছিল সাধারণ ব্যবসায়ী। ব্যবসা থেকে প্রতিদিন যা রোজগার করতো তাই দিয়েই খেয়ে পড়ে চলতো খোকন আর বাবলী পারভীন ওরফে লতা বেগম ও যমজ দুই সন্তানের সংসার। আকস্মিকভাবে গত ১ মে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান খোকন। সে যখন মারা যায় তখন রিয়ান- তাসকিনের বয়স মাত্র নয় বছর। স্বামী মারা যাওয়ার পর স্ত্রী বাবলী পারভীন ওরফে লতা বেগম দুই ছেলে সন্তান নিয়ে ভাই-বোনদের সহযোগিতায় বহু কষ্টে দিনাতিপাত করছিলেন।
প্রতিবেশিরা বলেন, ছোট ছোট সন্তান আর স্ত্রীকে রেখে মনিরুল ইসলাম খোকন হঠাৎ হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। আর স্বামী মৃত্যুর মাত্র ৮ মাসের মাথায় অবুঝ দুই শিশু সন্তান হারায় মা বাবলী পারভীন ওরফে লতা বেগমকে। মৃত স্বামী-স্ত্রীর অতি স্বল্প পরিমাণ জায়গা-জমি ছাড়া আর কিছুই নেই। সেই স্বল্প জমি থাকলেও বহরপুর বাজার এলাকায় ছোট একটি ঘর ভাড়া নিয়ে সন্তানদেরকে নিয়ে বসবাস করতেন মনিরুল ইসলাম খোকন ও বাবলী পারভীন লতা দম্পতি। গত ১৫ ডিসেম্বর বিকালে চন্দনী এলাকায় বোনের বাড়ীতে যাওয়ার সময় রাজবাড়ী নতুন বাজার মুরগি ফার্মের নিকট রাজবাড়ী-কুষ্টিয়া আঞ্চলিক মহাসড়কে মোটরসাইকেলের সাথে ধাক্কা লেগে গুরুতর আহত হন বাবলী পারভীন ওরফে লতা। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত ১৬ ডিসেম্বর ভোর ৩টায় মৃত্যুবরণ করেন বাবলী পারভীন ওরফে লতা বেগম। তাকে শেকাড়া গ্রামের কবরস্থানে দাফন করা হয়।
মা-বাবা হারানো দুই শিশুর নানি সৈয়দা বেগম বলেন, পিতা-মাতা হারা এদের কিভাবে লালন-পালন করবো, তা ভেবে কুলকিনারা করতে পারছি না। কারণ আমি নিজেও একজন বিধবা এখন সন্তানের উপর নির্ভরশীল। আমি আমার বড় ছেলের রোজগারে মোটামুটি কোনো রকম দিনাতিপাত করছি। এর মধ্যে আমি নিজেও অসুস্থ হয়ে পড়ে আছি। এখন এ অসহায় নাতি দুটোকে লালন পালন করব কিভাবে, তা নিয়ে ভেবে কিনারা পাচ্ছি না।
রিয়ান-তাসকিন মামা এস.এম হেলাল খন্দকার বলেন, আমার আপা বাবলী পারভীন ওরফে লতা বেগম ও দুলাভাই মনিরুল ইসলাম খোকনের যমজ দুই ছেলেকে নিয়ে কাটছিলো সুখের জীবন। হঠাৎ করে গত ১ মে হৃদরোগে আক্রান্ত হলে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে নিয়ে গেলে তার মৃত্যু হয়। দু’টি সন্তান নিয়ে আপা দিনপার করছিলেন। গত ১৫ ডিসেম্বর চন্দনী বোনের বাড়ীতে যাওয়ার সময় রাজবাড়ী নতুন বাজার মুরগি ফার্ম এলাকায় মোটরসাইকেল ধাক্কা দিলে গুরুতর আহত হন। তাকে উদ্ধার করে রাজবাড়ী সদর হাসপাতালে নিয়ে গেলে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার্ড করেন। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। অসহায় হয়ে পড়ে ছোট দুই ভাগিনা রিয়ান- তাসকিন। এখন কিভাবে চলবে তাদের জীবন। কেমনে হবে লেখাপড়া। এ বছরে বহরপুর অক্সফোর্ড আইডিয়াল স্কুল এন্ড ক্যাডেট একাডেমি থেকে বার্ষিক পরীক্ষা দিয়ে ৫ শ্রেণীতে উত্তীর্ন হয়েছে তারা।