মোহাম্মদ আসাদ-জামালপুর ।
জামালপুরের সীমান্তবর্তী উপজেলা বকশীগঞ্জে উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ছিনতাই। প্রতিনিয়ত এমন ঘটনার কারণে চরম আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন অটোচালকরা।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে,বকশীগঞ্জ উপজেলায় প্রায় প্রতি মাসেই কমপক্ষে দুই থেকে তিনটি বা তারও বেশি অটোরিকশা ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটছে। অনেক ক্ষেত্রে চালকদের মারধর করে আহত করা হয়, আবার কখনো কখনো হত্যার ঘটনাও ঘটছে। তবুও অনেক ঘটনায় আইনি পদক্ষেপের অগ্রগতি না থাকায় চালকদের মধ্যে হতাশা বাড়ছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ছিনতাইকারীরা যাত্রী সেজে অটোরিকশায় ওঠে। পরে সুযোগ বুঝে চালককে খাবার বা পান খাওয়ানোর মাধ্যমে উচ্চমাত্রার নেশাজাতীয় দ্রব্য প্রয়োগ করে অচেতন করে অটোরিকশা ছিনতাই করে নেয়। আবার কিছু ক্ষেত্রে ডিবি পুলিশ পরিচয় দিয়েও ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটছে।
বকশীগঞ্জ উপজেলার বেশ কয়েকজন ক্ষতিগ্রস্ত চালকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তাদের পরিবারের একমাত্র আয়ের উৎস ছিল এই ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা। গাড়ি ছিনতাই হওয়ার পর অনেক পরিবারই চরম অভাব-অনটনে দিন পার করছে। যেসব ঘটনায় চালক নিহত হয়েছেন, তাদের পরিবারে এখনো শোকের মাতম কাটেনি।
উপজেলার বিভিন্ন সড়কে প্রতিদিন প্রায় তিন হাজারের বেশি ছোট-বড় অটোরিকশা চলাচল করে। প্রতিনিয়ত ছিনতাইয়ের ঘটনায় স্থানীয় চালকদের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে।
ছিনতাইয়ের শিকার সাধুরপাড়া এলাকার অটোচালক টারু মিয়া বলেন, “প্রায় দুই মাস আগে আমার অটোরিকশাটি ছিনতাই হয়ে গেছে। থানায় অভিযোগ করেছি, কিন্তু এখনো কোনো খোঁজ পাইনি।”
তিনি জানান, প্রথমে কয়েকজন যাত্রী সেজে গাড়িতে ওঠে। পরে নির্জন স্থানে নিয়ে গিয়ে তাকে জোর করে পান খাওয়ানো হয়। কিছুক্ষণ পরই তিনি অচেতন হয়ে পড়েন। পরে স্থানীয়রা তাকে রাস্তার পাশ থেকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যান। সেই অটোরিকশাটিই ছিল তার একমাত্র আয়ের উৎস।
আরেক অটোচালক সুলতান বলেন, “শুক্রবার (১৩ মার্চ) বকশিগঞ্জ পৌর শহরের সীমারপাড় এলাকা থেকে দিনে-দুপুরে আমার অটোরিকশা ছিনতাই হয়ে যায়। একজন যাত্রী সেজে গাড়িতে ওঠে। পরে আমাকে একটি বাড়ি থেকে মালপত্র আনতে পাঠায়। ফিরে এসে দেখি গাড়ি আর লোক দুটোই নেই।”
অটোচালক মোস্তফা মিয়া বলেন, “যাত্রীদের সুবিধার জন্য বিভিন্ন জায়গায় যেতে হয়। কিন্তু যেভাবে গাড়ি ছিনতাই হচ্ছে, তাতে গাড়ি নিয়ে বের হতে ভয় লাগে। তবুও জীবিকার তাগিদে গাড়ি চালাতে হচ্ছে।”
সবুজ মিয়া নামের আরেক চালক বলেন, “আমরা গরিব মানুষ। গাড়ি চালালেই বউ-বাচ্চার খাবার জোটে। গাড়ি যদি ছিনতাই হয়ে যায়, তাহলে আমরা কোথায় যাব, কী খাব?”
অটোচালক লিটন বলেন, “ছিনতাই বাড়ায় আমরা সব ড্রাইভার আতঙ্কে আছি। প্রশাসনের কাছে অনুরোধ করছি, যেন দ্রুত ব্যবস্থা নিয়ে আমাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়।”
বিশ্লেষকদের মতে, সড়কে চাহিদার তুলনায় অতিরিক্ত ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চলাচল এবং অদক্ষ চালকের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়াও ছিনতাইয়ের একটি কারণ। অনেক ক্ষেত্রে অপ্রাপ্তবয়স্ক চালকরা অটোরিকশা চালানোর কারণে ছিনতাইকারীরা সহজেই তাদের টার্গেট করতে পারে। এছাড়া কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য ও মাদকাসক্ত কিছু যুবকও এসব অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে।
এছাড়া অধিকাংশ চালকের কোনো আনুষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ নেই। সন্ধ্যার পর কিংবা দূরপাল্লার পথে চলাচলের সময়ই বেশি ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে বলে জানিয়েছেন অনেক চালক। নির্দিষ্ট রুট বা সড়ক নির্ধারণ না থাকাও এ সমস্যাকে বাড়িয়ে দিচ্ছে বলে মনে করছেন তারা।
এ বিষয়ে দেওয়ানগঞ্জ সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, অটোরিকশা ছিনতাইসহ সব ধরনের ছিনতাই প্রতিরোধে পুলিশ কাজ করছে। ইতোমধ্যে সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে বকশিগঞ্জ থানা পুলিশ কয়েকটি ছিনতাই হওয়া অটোরিকশা উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছে।
তিনি আরও জানান, ছিনতাইয়ের ঘটনায় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে এবং পুলিশ প্রশাসন কঠোর অবস্থানে থেকে মাঠে কাজ করছে। মামলার ভিত্তিতে আইনানুগ ব্যবস্থাও গ্রহণ করা হচ্ছে।