March 12, 2026, 5:04 pm

হট্টগোলের মধ্যে সংসদে রাষ্ট্রপতির ভাষণ, বিরোধী দলের ওয়াক আউট

রাষ্ট্রপতির ভাষণের প্রতিবাদে ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশনের প্রথম দিনেই ওয়াক আউট করেছে জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপি জোটের ৭৭ এমপি। রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন অধিবেশন কক্ষে আসবেন, ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে বিরোধী এমপিরা নিজ আসেন দাঁড়িয়ে স্লোগান দেওয়া শুরু করেন। তাঁরা রাষ্ট্রপতিকে ফ্যাসিবাদের দোসর আখ্যা দেয় পোস্টার প্রদর্শন করেন। স্লোগানের মধ্যেই রাষ্ট্রপতি ভাষণ দিতে থাকলে, বিরোধী জোট ওয়াক আউট করে।

বৃহস্পতিবার বেলা ৩টা ৩৩ মিনিটে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদ (বীর বিক্রম) ঘোষণা করেন রাষ্ট্রপতি কিছুক্ষণের মধ্যে সংসদে আসবেন। রাষ্ট্রপতিকে ‘জুলাই গণহত্যাকারী’ আখ্যা দিয়ে জামায়াত জোটের এমপিরা প্রতিবাদ শুরু করেন। এর তিন মিনিট পর রাষ্ট্রপতি অধিবেশন কক্ষে প্রবেশ করলে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানসহ সরকারি দল বিএনপির এমপিরা দাঁড়িয়ে সম্মান জানান। রাষ্ট্রপতি বসেন স্পিকারের পাশের আসনে।

তবে বিরোধী দলের এমপিরা সংসদীয় প্রথা অনুযায়ী রাষ্ট্রপতিকে সম্মান না জানিয়ে, প্রতিবাদ শুরু করেন। পোস্টার উঁচিয়ে স্লোগান দেন। পোস্টারে লেখা ছিল, ‘জুলাই গাদ্দার’, ‘গো ব্যাক কিলার চুপ্পু’, ‘কিলার চুপ্পুর বিচার চাই’ ইত্যাদি স্লোগান। এক পর্যায়ে বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমানও পোস্টার হাতে প্রতিবাদে যোগ দেন। পুরো ঘটনা নিজ আসনে বসে প্রধানমন্ত্রী অবলোকন করেন।

জাতীয় সংগীতের সময় বিরোধী জোটের এমপিরা প্রতিবাদে বিরতি দেন। মিনিটখানেক নীরবে দাঁড়িয়ে জাতীয় সংগীতের প্রতি শ্রদ্ধা জানান। এরপর রাষ্ট্রপতি ভাষণ মঞ্চে উঠলে জামায়াত জোটের এমপিরা আসন ছেড়ে প্রবেশ পথে নেমে আসেন। তবে বাধার মধ্যেই রাষ্ট্রপতি ভাষণ দিতে শুরু করেন। যদিও শোনা যাচ্ছিল না স্লোগান হট্টগোলের কারণে।

এ সময় বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম রাষ্ট্রপতিকে লক্ষ্য করে স্লোগান দেন, ‘ফ্যাসিবাদ ও গণতন্ত্র এক সাথে চলে না।’ এতে যোগ দেন অন্য এমপিরা। রাষ্ট্রপতি প্রতিবাদকারীদের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে আবার লিখিত ভাষণ পড়া শুরু করেন।

তখন হাসনাত আবদুল্লাহ এবং আবদুল হান্নান মাসউদ স্লোগান দেন, ‘কিলার চুপ্পু গো ব্যাক’। বিরোধীদলীয় উপনেতা ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মো. তাহেরসহ জ্যেষ্ঠ নেতারাও স্লোগান দেন।

এই সময়ে সব এমপি সমস্বরে স্লোগান ধরেন, ‘ফ্যাসিবাদের দালালেরা হুঁশিয়ার সাবধান’। স্লোগান দিতে দিতে এমপিরা অধিবেশন কক্ষ থেকে বেরিয়ে যান। তাঁরা নবম তলায় বিরোধীদলের সভা কক্ষে চলে যান।

অধিবেশন কক্ষ থেকে জামায়াতের হুইপ শাহাজাহান চৌধুরী সাংবাদিকদের বলেছেন, রাষ্ট্রপতি পদে যিনি রয়েছেন, তিনি রাষ্ট্রের অভিভাবক নয়, ফ্যাসিবাদের দোসর। তাঁর হাতে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের রক্ত রয়েছে। তাঁর ভাষণ আমরা শুনব না।

এর আগে শোক প্রস্তাবের সময় ভাষণেও নাহিদ ইসলামসহ বিরোধী এমপিরা স্পিকারকে সতর্ক করেছিলেন, ফ্যাসিবাদের দোসর কেউ যেন সংসদে আসতে না পারে।

ডা. তাহের সমকালকে বলেছেন, সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার দোহাই দিয়ে ফ্যাসিবাদের দোসর রাষ্ট্রপতিকে ভাষণের সুযোগ করে দিয়েছে সরকার। অভ্যুত্থান সংবিধান মেনে হয়নি। নির্বাচনসহ যা কিছু হয়েছে, তা জুলাই গণঅভ্যুত্থান অনুযায়ী হয়েছে। রাষ্ট্রপতির ভাষণও অভ্যুত্থানের ক্ষমতায় বাদ দেওয়া যেত। তা করে সরকার পুরনো বন্দোবস্তের প্রতি আঁতাতের লক্ষণ দিয়ে সংসদ শুরু করেছে।

বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদের অধিবেশনের শুরুতেই সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বৈঠকের সভাপতির নাম প্রস্তাব করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। প্রথমবারের মতো সংসদে বক্তব্য রাখেন তিনি। এরপর প্রধানমন্ত্রী সংসদের প্রথম বৈঠকের সভাপতি হিসেবে বিএনপির জ্যেষ্ঠ সংসদ সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেনের নাম প্রস্তাব করেন।

এর আগে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের স্পিকার পদে নির্বাচিত হন ভোলা-৩ আসনের বিএনপি দলীয় সংসদ সদস্য মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ। অন্যদিকে ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত হয়েছেন নেত্রকোনা-১ সংসদ সদস্য কায়সার কামাল। জাতীয় সংসদে খন্দকার মোশাররফ হোসেনের সভাপতিত্বে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত হয়। পরে তাদের শপথ বাক্য পাঠ করান রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন।

স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচনের পরে সংসদের অধিবেশনের কিছুক্ষণের জন্য বিরতি ঘোষণা করেন সভাপতি খন্দকার মোশাররফ হোসেন। বিরতিকালে সংসদ ভবনে অবস্থিত রাষ্ট্রপতি কক্ষে নবনির্বাচিত স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারকে শপথ বাক্য পাঠ করান রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। বিরতি শেষে পৌনে একটার দিকে নবনির্বাচিত স্পিকার হাফিজ উদ্দিনের সভাপতিত্বে অধিবেশন আবারও শুরু হয়। কিন্তু সংসদের মাইকে বিভ্রাট থাকায় কিছুক্ষণ পরিচালনা করার পরে বিশ মিনিটের জন্য সভার বিরতি দেন স্পিকার।

সংসদে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাতীয় সংসদকে জাতীয় কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দু না করে বিতাড়িত ফ্যাসিস্ট সরকার অকার্যকর করে ফেলেছিল। আমরা এই মহান জাতীয় সংসদকে সকল যুক্তি তর্ক আর জাতীয় সমস্যা সমাধানের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করতে চাই।

দেশে আজ থেকে আবারও কাঙ্খিত সংসদীয় গণতন্ত্রের যাত্রা শুরু হয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সমৃদ্ধ নিরাপদ গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় সকলের সহযোগিতা চেয়েছেন। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আমি দল মত ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে দেশের জনগণের প্রতিনিধিত্ব করছি। আমার রাজনীতি দেশ এবং জনগণের স্বার্থ রক্ষা করার রাজনীতি। এই লক্ষ্য অর্জনে আমি গণতান্ত্রিক জনগণের সমর্থন ও সহযোগিতা চাই। এই মহান জাতীয় সংসদে সকল দলের নির্বাচিত প্রত্যেক সংসদ সদস্যের সমর্থন ও সহযোগিতা চাই।

সংসদ সদস্যদের উদ্দেশে সংসদ নেতা তারেক রহমান বলেন, আমাদের দল কিংবা মত কিংবা কর্মসূচি ভিন্ন হতে পারে। কিন্তু তাবেদার মুক্ত, ফ্যাসিবাদ মুক্ত একটি স্বাধীন সার্বভৌম নিরাপদ স্বনির্ভর বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় আমাদের মধ্যে কোনো বিরোধ থাকতে পারে না। বিরোধ নেই।

সংসদের কার্যপ্রণালী বিধি অনুযায়ী, সংসদের প্রথম অধিবেশনের সভাপতিত্ব করার জন্য প্রবীণ রাজনীতিবিদ খন্দকার মোশাররফ হোসেনের নাম প্রস্তাব করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের সংসদীয় রীতিনীতির ইতিহাসে এই ধরনের পরিপ্রেক্ষিত নজিরবিহীন নয়। ১৯৭৩ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মরহুম শেখ মুজিবুর রহমান ওই সংসদের সদস্য মাওলানা আব্দুর রশিদ তর্কবাগিশের নাম প্রস্তাব করেছিলেন।

স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেছেন, সব রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডের প্রাণকেন্দ্র হবে জাতীয় সংসদ। জাতীয় স্বার্থকে দলীয় স্বার্থের উপরে স্থান দেওয়ার জন্য আমরা শপথবদ্ধ। ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ এ হোক আমাদের মূলমন্ত্র।

গণতন্ত্রের পথ কখনও কুসুমাস্তীর্ণ ছিল না উল্লেখ করে হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, মাঝে মাঝে স্বৈরশাসকের পদধ্বনি আমরা শুনতে পেয়েছি। জনগণ বিড়ম্বিত হয়েছে। অবশেষে ২০২৪ সালের জুলাই ও আগস্ট মাসে ছাত্রজনতা, রাজনৈতিক কর্মী ও সাধারণ মানুষ এক গণঅভ্যুত্থানে ফ্যাসিস্ট সরকারকে বিদায় করেছে। এ সংগ্রামে যারা আত্মহুতি দিয়েছে—শহীদ আবু সাঈদ, মুগ্ধ, ওয়াসিমসহ প্রত্যেক শহীদের রুহের মাগফিরাত কামনা করি। অবশেষে ফেব্রুয়ারির ১২ তারিখে একটি সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ আমরা দেখতে পেয়েছি। আমার ১০টি জাতীয় নির্বাচনে অংশ নেওয়ার অভিজ্ঞতা আছে। এবারের নির্বাচনকে সবচেয়ে সুষ্ঠু নির্বাচন বলে মনে করি। এখন জনগণ অধীর আগ্রহে রয়েছেন ত্রয়োদশ সংসদের কার্যক্রম দেখার জন্য।

তিনি বলেন, গণতন্ত্র সংখ্যাগরিষ্ঠের শাসন ব্যবস্থা। সরকার ও বিরোধী দল উভয়ে জাতির স্বার্থে ঐক্যবদ্ধ হয়ে সর্বাত্মক উদ্যোগ গ্রহণ করবেন বলে আশাবাদ ব্যক্ত করি। বিরোধী দল যাতে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে সে জন্য সর্বদা সচেষ্ট থাকব। ইতোমধ্যে নিরপেক্ষতার খাতিরে বিএনপির স্থায়ী কমিটির পদ থেকে পদত্যাগ করেছি।

এই বিভাগের আরও খবর


ফেসবুকে আমরা