ন্যূনতম মাসিক বেতন ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণের দাবিতে পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছে নতুন নতুন এলাকায়। ঢাকার মিরপুর, গাজীপুর ও সাভার-আশুলিয়ার পর এবার আন্দোলনে যুক্ত হয়েছেন নারায়ণগঞ্জের শ্রমিকরাও। বিক্ষোভ, সড়ক-মহাসড়ক অবরোধ ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় শিল্পাঞ্চলগুলোতে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। আন্দোলনের কারণে দেশের তিন প্রধান শিল্পাঞ্চলের ৬৭০টি পোশাক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে বলে জানিয়েছে বিজিএমইএ।
সোমবার (২ নভেম্বর) শ্রমিকদের বিক্ষোভে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক এবং নারায়ণগঞ্জের ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। গাজীপুরে পুলিশের দুটি গাড়ি ভাঙচুর ও একটি গাড়িতে আগুন দেওয়া হয়। এ ছাড়া একটি কাভার্ড ভ্যানসহ আরও একটি গাড়িতে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে।
মিরপুরে পাঁচ মামলা, গ্রেপ্তার ৩০
রাজধানীর মিরপুরে পুলিশের গাড়িতে আগুন ও ভাঙচুরের ঘটনায় পাঁচটি মামলা করেছে পুলিশ। গত রবিবারের ঘটনার পর সোমবার এসব মামলা করা হয়। মামলাগুলোতে অজ্ঞাতনামা এক হাজারের বেশি ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে। এ পর্যন্ত ৩০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন পুলিশের মিরপুর বিভাগের উপকমিশনার হাসান মোহাম্মদ নাছের রিকাবদার।
সোমবার সকালেও মিরপুরের বিভিন্ন এলাকায় শ্রমিকদের সড়কে নামার চেষ্টা করতে দেখা যায়। সেনপাড়া পর্বতা, রূপনগর ও প্রশিকা মোড় এলাকায় বিক্ষোভের চেষ্টা করলে পুলিশ বাধা দেয়। কোথাও কোথাও শ্রমিকদের ছত্রভঙ্গ করতে কাঁদানে গ্যাসের শেল নিক্ষেপ করা হয়।
ঢাকা মহানগর পুলিশের যুগ্ম কমিশনার মহিদুল ইসলাম বলেন, শ্রমিক আন্দোলনের আড়ালে কেউ অরাজকতা সৃষ্টি বা রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি বিনষ্টের ষড়যন্ত্র করছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। পুলিশের গাড়িতে হামলার ঘটনায় জড়িতদের শনাক্তে তদন্ত চলছে।
বন্ধ ৬৭০ পোশাক কারখানা
শ্রমিক অসন্তোষের প্রভাবে দেশের তিন প্রধান শিল্পাঞ্চলের ৬৭০টি পোশাক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। বিজিএমইএর তথ্য অনুযায়ী, সোমবার বেলা সাড়ে ১১টা পর্যন্ত পাঁচটি শিল্পাঞ্চলের ২ হাজার ১৩৪টি কারখানার মধ্যে ১ হাজার ৪৬৪টি চালু ছিল। বাকি ৬৭০টি কারখানায় উৎপাদন বন্ধ থাকে।
এতে কাজ না করেই বাড়ি ফিরে যেতে বাধ্য হন ১৬ লাখ ৮০ হাজার ৫৭২ জন শ্রমিক। এর মধ্যে গাজীপুর ও ময়মনসিংহ অঞ্চলে ৩৮২টি কারখানার কার্যক্রম বন্ধ হয়। সাভার-আশুলিয়া ও জিরানী এলাকায় বন্ধ থাকে ২২৩টি কারখানা। অন্যদিকে রাজধানীর মিরপুরে বন্ধ হয় ৬৫টি কারখানা।
আশুলিয়ায় সংঘর্ষ, আহত ২০
শ্রমিক বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে সাভার-আশুলিয়ায় শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের দফায় দফায় সংঘর্ষ ও ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এতে শিল্প পুলিশের এক সহকারী পুলিশ সুপারসহ অন্তত ২০ জন আহত হয়েছেন। নরসিংহপুরে হা-মীম গ্রুপের একটি কাভার্ড ভ্যানে আগুন দেওয়া হয়।
সকালে নিশ্চিন্তপুরের নিউ এইজ কারখানার শ্রমিকেরা কর্মবিরতি শুরু করে পরে সড়কে বিক্ষোভ করেন। একপর্যায়ে বিভিন্ন কারখানার শ্রমিকেরা বাইপাইল-আব্দুল্লাহপুর সড়কে জড়ো হন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ কাঁদানে গ্যাসের শেল নিক্ষেপ করে। এ ঘটনায় ভাঙচুর ও নৈরাজ্য সৃষ্টির অভিযোগে কয়েকজনকে আটক করেছে পুলিশ।
নারায়ণগঞ্জে সাড়ে পাঁচ ঘণ্টা সড়ক অবরোধ
শ্রমিক আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছে নারায়ণগঞ্জেও। সোমবার বেলা ১১টা থেকে ফতুল্লার শিবু মার্কেট এলাকায় ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোড অবরোধ করেন বিভিন্ন পোশাক কারখানার হাজারো শ্রমিক। এতে সড়কের দুই পাশে যান চলাচল বন্ধ হয়ে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়।
মেট্রো নিটিং, পলমল গার্মেন্টস, আবির ফ্যাশন ও আজাদ-রিফাত ডাইংসহ আশপাশের কয়েকটি কারখানার শ্রমিকেরা এ বিক্ষোভে অংশ নেন। এ সময় সড়কে টায়ার জ্বালিয়ে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করা হয়। প্রায় সাড়ে পাঁচ ঘণ্টা পর বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে শ্রমিকেরা সড়ক থেকে সরে গেলে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়।
নারায়ণগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার তারেক আল মেহেদী জানান, শ্রমিকদের বুঝিয়ে সড়ক থেকে সরিয়ে দেওয়া হলে যান চলাচল পুনরায় শুরু হয়।
গাজীপুরে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ
গাজীপুরের নাওজোর, কোনাবাড়ী, ভোগড়া বাইপাস, চন্দ্রা, মৌচাক ও সফিপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় শ্রমিকদের বিক্ষোভ ও মহাসড়ক অবরোধ অব্যাহত থাকে। এতে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়।
আন্দোলন চলাকালে নাওজোর এলাকায় পুলিশের দুটি গাড়ি ভাঙচুর এবং একটি পিকআপে আগুন দেওয়া হয়। এ ছাড়া বিভিন্ন স্থানে অর্ধশতাধিক যানবাহন ও দোকানপাট ভাঙচুরের অভিযোগ পাওয়া গেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ টিয়ারশেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে গাজীপুরে ১০ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হয়।
এদিকে সফিপুর এলাকায় শ্রমিকদের ছোড়া ইটের আঘাতে এক বিজিবি সদস্য আহত হন। নাওজোর এলাকায় দায়িত্ব পালনকালে সময় টিভির এক সাংবাদিক ও ক্যামেরাপারসনও আহত হয়েছেন।
আন্দোলনে ইন্ধনের অভিযোগ
পোশাকশ্রমিকদের চলমান আন্দোলনে রাজনৈতিকভাবে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টা করছেন বলে অভিযোগ তুলেছেন সরকারের কয়েকজন মন্ত্রী। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দীন আহমেদও আন্দোলনে কিছু শিল্প মালিক, সাবেক সংসদ সদস্য ও সাবেক প্রতিমন্ত্রীর ইন্ধন থাকার অভিযোগ করেছেন।
তবে আন্দোলনরত শ্রমিকদের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, তারা ন্যায্য মজুরির দাবিতে আন্দোলন করছেন। বহিরাগতরা আন্দোলনে ঢুকে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের চেষ্টা করছে বলেও কয়েকজন শ্রমিক অভিযোগ করেছেন।
ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি মোস্তাফিজুর রহমান জানিয়েছেন, শ্রমিক আন্দোলনের নামে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অন্যদিকে ঢাকা জেলা পুলিশ সুপার শামীমা পারভীন শ্রমিকদের কাজে ফিরে আসার আহ্বান জানিয়ে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আশ্বাস দিয়েছেন।
এদিকে গাজীপুরের কোনাবাড়ীতে আন্দোলনকারীদের হামলায় গুরুতর আহত হয়েছেন টাঙ্গাইলের মির্জাপুর থানার এক উপপরিদর্শক (এসআই)। সোমবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে বাইমাইল সাইনবোর্ড এলাকায় তার মোটরসাইকেলে আগুন দেওয়া হয়। পরে স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করেন। মির্জাপুর থানার ওসি আব্দুল্লাহ আল মামুন জানিয়েছেন, ওই পুলিশ কর্মকর্তা বর্তমানে শঙ্কামুক্ত রয়েছেন।

