বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
প্রিন্ট: অক্টোবর ২৭, ২০২৬, ১২:২২ অপরাহ্ণ প্রকাশ: অক্টোবর ২৭, ২০২৬, ৯:৪৪ পূর্বাহ্ণ

মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার চালুর ঘোষণা, ১২ দিনেও শুরু হয়নি কর্মী পাঠানোর প্রক্রিয়া

মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার চালুর ঘোষণা, ১২ দিনেও শুরু হয়নি কর্মী পাঠানোর প্রক্রিয়া

নিয়োগবিধি, অভিবাসন ব্যয় ও স্বাস্থ্য পরীক্ষার নির্দেশনা নিয়ে অনিশ্চয়তা, বাস্তবায়নে বিলম্ব

দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে বাংলাদেশি কর্মী পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরুর ঘোষণা দিয়েছিল সরকার। গত ১৫ অক্টোবর প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের এই ঘোষণার ১২ দিন পেরিয়ে গেলেও এখনো শুরু হয়নি কর্মী পাঠানোর আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম। নিয়োগপ্রক্রিয়ার নিয়মকানুন, অভিবাসন ব্যয়, রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর দায়িত্ব বণ্টন এবং স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য মেডিক্যাল সেন্টারের অনুমোদন নিয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা না থাকায় তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, শুধু শ্রমবাজার চালুর ঘোষণা দিলেই কর্মী পাঠানোর কার্যক্রম শুরু করা সম্ভব নয়। এ জন্য প্রয়োজন সুনির্দিষ্ট নীতিমালা, স্বচ্ছ নিয়োগপ্রক্রিয়া এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্ব ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা। এসব বিষয়ে স্পষ্টতা না থাকায় সরকারি সিদ্ধান্তের বাস্তবায়ন আটকে রয়েছে।

৩১২ রিক্রুটিং এজেন্সি ও ২৫ প্রসেসিং প্রতিষ্ঠান

নতুন ব্যবস্থাপনায় সরকারি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেড (বোয়েসেল) এবং ৩১২টি রিক্রুটিং এজেন্সির পাশাপাশি ২৫টি প্রসেসিং এজেন্সিকে যুক্ত করার কথা জানানো হয়েছে। তবে এসব প্রতিষ্ঠান কীভাবে নির্বাচন করা হয়েছে, কর্মীদের মালয়েশিয়া যেতে কত টাকা ব্যয় হবে এবং কারা বিনা খরচে যাওয়ার সুযোগ পাবেন, তা নিয়ে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে প্রশ্ন রয়েছে।

কর্মী পাঠানোর প্রক্রিয়ায় দায়িত্ব পাওয়া দুটি রিক্রুটিং এজেন্সির মালিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, কর্মীদের অভিবাসন ব্যয়, বিনা খরচে যাওয়ার সুযোগ এবং স্বাস্থ্য পরীক্ষার স্থান সম্পর্কে তাঁদের এখনো বিস্তারিত জানানো হয়নি।

বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সিজের (বায়রা) সদস্যসহ সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, আগে যেখানে ১০০টি প্রসেসিং এজেন্সি ছিল, এবার সেখানে ২৫টি প্রতিষ্ঠানকে রাখা হয়েছে। একইভাবে আট শতাধিক রিক্রুটিং এজেন্সির পরিবর্তে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে ৩১২টি প্রতিষ্ঠানকে। ফলে প্রতিষ্ঠান নির্বাচনের মানদণ্ড ও দায়িত্ব বণ্টনের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

এনওসি বাধ্যতামূলক, বাড়তে পারে মধ্যস্থতাকারীদের প্রভাব

নতুন ব্যবস্থায় রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোকে কর্মী পাঠানোর কার্যক্রম সম্পন্ন করতে প্রসেসিং এজেন্সি অথবা বোয়েসেলের কাছ থেকে অনাপত্তিপত্র (এনওসি) নিতে হবে। সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের আশঙ্কা, এর ফলে একটি প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম অন্য প্রতিষ্ঠানের অনুমোদনের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়বে। এতে মধ্যস্থতাকারীদের প্রভাব বাড়ার পাশাপাশি নিয়োগপ্রক্রিয়ায় জটিলতা তৈরির আশঙ্কাও রয়েছে।

বায়রার সাবেক মহাসচিব আলী হায়দার চৌধুরী বলেন, মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার চালু হওয়ায় তাঁরা খুশি। তবে কোন প্রক্রিয়ায় কর্মী পাঠানো হবে এবং কবে থেকে কার্যক্রম শুরু হবে, সে বিষয়ে এখনো স্পষ্ট নির্দেশনা নেই। সরকারের পক্ষ থেকেও এজেন্সিগুলোকে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি। ফলে অনেক প্রতিষ্ঠান দ্বিধাদ্বন্দ্বে রয়েছে।

সমঝোতা স্মারকের শর্তও বড় চ্যালেঞ্জ

২০২২ সালে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে কর্মী নিয়োগ নিয়ে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) অনুযায়ী, বাংলাদেশ থেকে কর্মী পাঠানোর জন্য রিক্রুটিং এজেন্সি বাছাইয়ের দায়িত্ব এককভাবে মালয়েশিয়া সরকারের ওপর ন্যস্ত করা হয়েছিল। সমঝোতা স্মারকটির মেয়াদ চলতি বছরের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত রয়েছে।

অভিবাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, এই চুক্তির শর্তের কারণে মালয়েশিয়া সরকারের নির্ধারিত ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনা বাংলাদেশের জন্য সহজ হবে না। তাই শ্রমবাজার চালুর ঘোষণা দেওয়ার আগেই কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে কর্মী নিয়োগের পদ্ধতি, এজেন্সির অংশগ্রহণ এবং অভিবাসন ব্যয় সম্পর্কে বিস্তারিত সমঝোতা করা প্রয়োজন ছিল।

অভিবাসন বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনীর মনে করেন, মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার চালুর ঘোষণা কিছুটা অপরিপক্ব ছিল। তাঁর মতে, মালয়েশিয়া অনুমোদিত এজেন্সিগুলোর নাম প্রকাশ করলেও বাংলাদেশ সরকার কীভাবে পুরো প্রক্রিয়া বাস্তবায়ন করবে, সে বিষয়ে এখনো স্পষ্ট ধারণা দিতে পারেনি।

তিনি বলেন, ডিসেম্বর মাসে দুই দেশের বর্তমান সমঝোতা স্মারকের মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা। মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে চুক্তিটি পর্যালোচনা করে জানুয়ারিতে নতুন সমঝোতা স্মারক করা যেতে পারে। নতুন চুক্তিতে কর্মী নিয়োগের পদ্ধতি, এজেন্সির অংশগ্রহণ এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার বিষয়গুলো স্পষ্ট করা জরুরি। এ ক্ষেত্রে শ্রমবাজার পুরোপুরি চালু হতে ডিসেম্বর বা জানুয়ারি পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।

স্বাস্থ্য পরীক্ষার অনুমোদনও ঝুলে আছে

মালয়েশিয়াগামী কর্মীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য এখনো মেডিক্যাল সেন্টারের অনুমোদন দেওয়া হয়নি। তবে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, প্রাথমিকভাবে ২৫টি মেডিক্যাল সেন্টারকে এ অনুমোদন দেওয়া হতে পারে। এ নিয়ে কাজ চলছে। চলতি সপ্তাহ অথবা আগামী সপ্তাহে অনুমোদন ও স্বাস্থ্য পরীক্ষার বিষয়ে ঘোষণা আসতে পারে। তবে স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য প্রত্যেক কর্মীকে কত টাকা ফি দিতে হবে, তা এখনো নির্ধারণ করা হয়নি।

মন্ত্রণালয়ের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা জানান, মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে এখনো কিছু প্রক্রিয়াগত জটিলতা রয়েছে। আশা করা হচ্ছে, আগামী সপ্তাহের মধ্যে এসব জটিলতা দূর হবে এবং নভেম্বরের মাঝামাঝি থেকে কর্মী পাঠানোর আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শুরু করা সম্ভব হবে।

সব মিলিয়ে, মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার চালুর সরকারি ঘোষণা কর্মপ্রত্যাশীদের মধ্যে আশার সঞ্চার করলেও নিয়োগবিধি, অভিবাসন ব্যয়, এজেন্সির দায়িত্ব এবং স্বাস্থ্য পরীক্ষার বিষয়গুলো এখনো চূড়ান্ত না হওয়ায় বাস্তবায়ন নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটেনি। সংশ্লিষ্টদের মতে, স্বচ্ছ ও সুশৃঙ্খল নিয়োগপ্রক্রিয়া নিশ্চিত করতে দ্রুত এসব বিষয়ে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা দেওয়া জরুরি