বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
প্রিন্ট: অক্টোবর ২৩, ২০২৬, ৬:৩৪ অপরাহ্ণ প্রকাশ: অক্টোবর ২২, ২০২৬, ৩:২৭ অপরাহ্ণ

চার স্ত্রী, ৫৮ সন্তান, অভাবের সংসারে হিমশিম সাদিক

চার স্ত্রী, ৫৮ সন্তান, অভাবের সংসারে হিমশিম সাদিক
মোহাম্মদ সাদিক ও তার পরিবার । ছবি : সংগৃহীত

আফগানিস্তানের উরুজগান প্রদেশের বাসিন্দা ৫৭ বছর বয়সী মোহাম্মদ সাদিক। চার স্ত্রী ও ৫৮ সন্তান নিয়ে তাঁর বিশাল পরিবার। কিন্তু পরিবারের সদস্যদের মুখে খাবার তুলে দেওয়া থেকে শুরু করে শিক্ষা ও বাসস্থানের ব্যবস্থা করা, সবকিছুই এখন তাঁর জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে। অর্থাভাবে পরিবারের কোনো কোনো শিশুকে ক্ষুধার্ত অবস্থায় ঘুমাতে যেতে হয়।

মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) খামা প্রেস এজেন্সির এক প্রতিবেদনে সাদিকের পরিবারের এই করুণ চিত্র উঠে এসেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, একটি গাড়ির শোরুমে কাজ করেন সাদিক। সেখানে একটি গাড়ি বিক্রি করতে পারলে তাঁর আয় হয় প্রায় ১ হাজার আফগানি। এত অল্প আয়ে ৬২ সদস্যের পরিবারের দৈনন্দিন খরচ মেটানো প্রায় অসম্ভব। সংসারের ব্যয় সামলাতে তাঁর কয়েকজন সন্তানও কাজ করে। তাদের কেউ কেউ জ্বালানি হিসেবে ব্যবহারের জন্য কাগজ ও প্লাস্টিক সংগ্রহ করে।

নাম মনে রাখাও কঠিন

সন্তানের সংখ্যা এত বেশি যে সবার নাম মনে রাখতেও হিমশিম খেতে হয় সাদিককে। কখনো পরিবারের সবাই একসঙ্গে খাবার খেতে বসলে সন্তানদের গুনে দেখেন তিনি। তখন দেখা যায়, কেউ একজন অনুপস্থিত, কারণ সে অন্য কোথাও রয়েছে। অনেক সময় নাম মনে করতে না পেরে সন্তানদের ‘আমার ছেলে’ কিংবা ‘আমার সন্তান’ বলে ডাকেন তিনি।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, বছরের পর বছর ধরে সাদিক ও তাঁর স্ত্রীরা ১৪ সন্তানকে হারিয়েছেন। এত প্রতিকূলতার মধ্যেও সন্তানদের স্কুলে পাঠানোর চেষ্টা করেছেন তিনি। তবে শিক্ষার ব্যয় বহন করা এখনো তাঁর পরিবারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।

খাবার, ঘুম ও বাসস্থানে সংকট

পরিবারটিতে সাধারণত দিনে দুই বেলা খাবার তৈরি করা হয়। সকালের নাশতা ও রাতের খাবারের আয়োজন করেন দুই স্ত্রী। শীতকালে পরিবারের সদস্যরা ঘরের ভেতরে একসঙ্গে খাবার খান। গ্রীষ্মকালে তাঁদের মিলনস্থল হয়ে ওঠে বাড়ির উঠান।

ঘুমানোর ব্যবস্থাও অত্যন্ত সীমিত। কখনো কখনো ছয় থেকে সাতজনকে একটি পাতলা কম্বল ভাগাভাগি করে রাত কাটাতে হয়। বাড়ির ঘরগুলোতে প্রচলিত দরজা-জানালা নেই। দরজার পরিবর্তে ব্যবহার করা হয় পাতলা পর্দা। গোসলের জায়গাটিই কাপড় ও থালাবাসন ধোয়ার কাজে ব্যবহৃত হয়। কখনো কখনো সেটি শৌচাগার হিসেবেও ব্যবহার করতে হয়।

বড় পরিবার গড়ার পেছনে ধর্মীয় বিশ্বাস

সাদিক জানান, তাঁর বড় পরিবার গড়ে তোলার পেছনে উদ্দেশ্য ছিল মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর অনুসারীর সংখ্যা বৃদ্ধি করা। তবে এত বেশি সন্তানকে লালন-পালন করতে গিয়ে যে বাস্তব সমস্যার মুখোমুখি হতে হবে, তা এখন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

একবার একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে এক ধর্মীয় নেতার কাছে ভুল করে এক মেয়ের পরিবর্তে অন্য মেয়ের নাম বলে ফেলেছিলেন তিনি। সন্তানদের নাম মনে রাখতে না পারার বিষয়টি তাঁর দৈনন্দিন জীবনের একটি বড় সমস্যায় পরিণত হয়েছে।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, সাদিকের চার স্ত্রী যখন তাঁকে বিয়ে করেন, তখন তাঁদের বয়স ছিল ১৩ থেকে ১৬ বছরের মধ্যে। প্রথম বিয়ের সময় সাদিকের বয়স ছিল ২০ বছর। তিনি জানান, প্রতিটি বিয়ের আগে কনের বিয়ের মূল্য বা দেনমোহরের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ সংগ্রহ করতে তাঁকে দীর্ঘ সময় ধরে সঞ্চয় করতে হয়েছিল। সাদিক নিজেও পড়তে বা লিখতে পারেন না।

সহায়তার আবেদন, সন্তানদের শিক্ষার স্বপ্ন

পরিবারের ভরণপোষণ নিশ্চিত করতে সরকার, ত্রাণ সংস্থা ও ব্যবসায়ীদের কাছে আর্থিক সহায়তা চেয়েছেন সাদিক। তাঁর প্রধান প্রত্যাশা, সন্তানরা যেন পড়াশোনার সুযোগ পায় এবং পরিবারের প্রত্যেক সদস্যের জন্য পর্যাপ্ত খাবারের ব্যবস্থা করা যায়।

সাদিকের পরিবারের এই পরিস্থিতি শুধু দারিদ্র্যের ভয়াবহতাই তুলে ধরে না, বরং বাল্যবিবাহ, অল্প বয়সে মাতৃত্ব এবং বারবার গর্ভধারণের স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়েও নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, কৈশোরে বিয়ে ও গর্ভধারণ নারীদের শারীরিক স্বাস্থ্যের ওপর গুরুতর প্রভাব ফেলতে পারে। অন্যদিকে, ঘন ঘন গর্ভধারণ মায়ের শরীরে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে। আফগানিস্তানের প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোতে প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার সীমাবদ্ধতা এসব ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে।