নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও সেবার মূল্যবৃদ্ধিতে চাপে পড়েছে দেশের সাধারণ মানুষ। আয়-ব্যয়ের হিসাব মেলাতে হিমশিম খাচ্ছে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো। বাড়তি খরচ সামলাতে কমাতে হচ্ছে বিনোদন, ভ্রমণ ও ভবিষ্যতের জন্য সঞ্চয়। এর প্রভাব পড়ছে জাতীয় সঞ্চয় ও বিনিয়োগেও। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য বলছে, টানা তিন অর্থবছর ধরে জিডিপির অনুপাতে জাতীয় সঞ্চয়ের হার কমেছে। একই সময়ে বেড়েছে ভোগ ব্যয়ের হার।
বিবিএসের সর্বশেষ জাতীয় হিসাব পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরে জিডিপির অনুপাতে জাতীয় সঞ্চয়ের হার ছিল ২৯ দশমিক ৯৫ শতাংশ। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সাময়িক হিসাবে তা কমে দাঁড়িয়েছে ২৬ দশমিক ৯৩ শতাংশে। তিন অর্থবছরে সঞ্চয়ের হার কমেছে ৩ দশমিক ০২ শতাংশীয় পয়েন্ট। অন্যদিকে, জিডিপির অনুপাতে মোট ভোগ ব্যয়ের হার ৭৪ দশমিক ২৪ শতাংশ থেকে বেড়ে ৭৮ দশমিক ৬২ শতাংশে উঠেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির কারণে মানুষের সঞ্চয় করার সক্ষমতা কমছে। আয়ের বড় অংশ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও সেবা কিনতে ব্যয় হওয়ায় ভবিষ্যতের জন্য অর্থ জমিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে। সঞ্চয় কমে গেলে বিনিয়োগের জন্য প্রয়োজনীয় মূলধনও সংকুচিত হয়। এর প্রভাব পড়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও মানুষের আয়ের ওপর।
বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, ছয় বছর আগে জিডিপির অনুপাতে মোট বিনিয়োগের হার ছিল ৩১ শতাংশের বেশি। বর্তমানে তা কমে ২৮ শতাংশের নিচে নেমেছে। এ সময়ে সরকারি ও বেসরকারি উভয় খাতের বিনিয়োগ কমেছে।
জ্বালানির দাম বাড়ায় মূল্যস্ফীতির চাপ
জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি পরিবহন ও পণ্য সরবরাহের খরচ বাড়িয়ে দিয়েছে। গত ২১ সেপ্টেম্বর অকটেন, পেট্রল ও ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা বাড়ানো হয়। এর প্রভাব পড়েছে গণপরিবহনের ভাড়া ও নিত্যপণ্যের বাজারে।
বিবিএসের হিসাবে, আগস্টে দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ২৬ শতাংশ। সেপ্টেম্বরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৮ দশমিক ৩৪ শতাংশে। একই সময়ে জাতীয় গড় মজুরি বৃদ্ধির হার আগস্টের ৮ দশমিক ০৫ শতাংশ থেকে কমে সেপ্টেম্বরে ৭ দশমিক ৯০ শতাংশ হয়েছে। অর্থাৎ মূল্যস্ফীতির তুলনায় মজুরি বৃদ্ধির হার কম থাকায় মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা চাপে রয়েছে।
প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান নিয়ে উদ্বেগ
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ২ শতাংশে নেমে আসতে পারে। একই সময়ে বার্ষিক গড় মূল্যস্ফীতি ১০ দশমিক ৯ শতাংশ হতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। সংস্থাটির পূর্বাভাসে আগামী অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি আরও কমে ২ দশমিক ২ শতাংশে নামার আশঙ্কাও তুলে ধরা হয়েছে।
অর্থনীতির ধীরগতি, বিনিয়োগে স্থবিরতা, জ্বালানিসংকট, দুর্বল ব্যাংক খাত ও রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, গত চার বছরে প্রায় ৮০ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেছে। এ ছাড়া প্রায় সোয়া ৬ কোটি মানুষ দারিদ্র্যের ঝুঁকিতে রয়েছে।
সব মিলিয়ে মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি শুধু পরিবারের দৈনন্দিন বাজেটকেই প্রভাবিত করছে না, জাতীয় সঞ্চয়, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপরও চাপ তৈরি করছে। এ পরিস্থিতিতে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ানো, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত করা অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

