বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
প্রিন্ট: অক্টোবর ৮, ২০২৬, ১:১৭ পূর্বাহ্ণ প্রকাশ: অক্টোবর ৭, ২০২৬, ২:৫৭ অপরাহ্ণ

আসছেন মা দুর্গা উৎসবের রঙে সেজে উঠেছে মণিরামপুরের ১০৩ পূজামণ্ডপ

আসছেন মা দুর্গা উৎসবের রঙে সেজে উঠেছে মণিরামপুরের ১০৩ পূজামণ্ডপ

জেমস আব্দুর রহিম রানা:
যশোরের মণিরামপুর উপজেলায় শারদীয় দুর্গাপূজাকে ঘিরে ব্যাপক প্রস্তুতি চলছে। এ বছর উপজেলার ১০৩টি মন্দির ও পূজামণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হবে। ইতোমধ্যে অধিকাংশ মণ্ডপে প্রতিমা নির্মাণের কাজ শেষ পর্যায়ে পৌঁছেছে। পাশাপাশি প্যান্ডেল নির্মাণ, আলোকসজ্জা, সাজসজ্জা, নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক প্রস্তুতিও জোরেশোরে এগিয়ে চলছে। পূজার দিন যত ঘনিয়ে আসছে, ততই উৎসবের আমেজ ছড়িয়ে পড়ছে উপজেলার গ্রাম থেকে শহর, বাজার থেকে পাড়া-মহল্লায়। আয়োজকরা বলছেন, সম্প্রীতি ও উৎসবমুখর পরিবেশে এবারের দুর্গোৎসব উদযাপনের লক্ষ্যে নেওয়া হয়েছে সর্বাত্মক প্রস্তুতি।
শরতের নীল আকাশে ভেসে বেড়ানো সাদা মেঘ, পথের ধারে দুলতে থাকা কাশফুল, ভোরের শিশিরস্নাত ঘাস আর ঝরে পড়া শিউলির সুবাসের মধ্যেই মণিরামপুরজুড়ে এখন শোনা যাচ্ছে আগমনী সুর। সন্ধ্যা নামলেই উপজেলার বিভিন্ন পূজামণ্ডপে ভিড় করছেন দর্শনার্থীরা। কোথাও প্রতিমার শরীরে রঙের শেষ তুলির আঁচড়, কোথাও আলোকসজ্জার কাজ, আবার কোথাও প্যান্ডেল নির্মাণে ব্যস্ত কারিগররা। শিশু-কিশোরদের কৌতূহলী চোখ, তরুণদের উৎসবের পরিকল্পনা আর প্রবীণদের স্মৃতিচারণে জনপদজুড়ে তৈরি হয়েছে উৎসবমুখর পরিবেশ।
প্রতি বছরের মতো এবারও সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজাকে ঘিরে মণিরামপুরে ব্যাপক আয়োজন করা হয়েছে। ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার পাশাপাশি দুর্গোৎসব এ অঞ্চলের মানুষের কাছে সামাজিক মিলন, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও সম্প্রীতিরও অন্যতম প্রধান উপলক্ষ। ফলে পূজাকে ঘিরে শুধু সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মধ্যেই নয়, অন্যান্য সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যেও তৈরি হয়েছে উৎসাহ-উদ্দীপনা।
মণিরামপুরের বিভিন্ন পূজামণ্ডপ ঘুরে দেখা গেছে, প্রতিমা নির্মাণের কাজ এখন শেষ পর্যায়ে। বাঁশ, খড়, সুতলি ও কাদা-মাটির কাঠামোর ওপর শিল্পীদের নিপুণ হাতের ছোঁয়ায় ফুটে উঠেছে দেবী দুর্গার প্রতিমা। পাশাপাশি তৈরি করা হয়েছে দেবী লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক, গণেশ, মহাদেব শিব ও মহিষাসুরের প্রতিমা। কোথাও চলছে রঙের কাজ, কোথাও চোখ আঁকার সূক্ষ্ম কাজ, আবার কোথাও প্রতিমার পোশাক, অলংকার ও সাজসজ্জা সম্পন্ন করার ব্যস্ততা। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করতে দিন-রাত পরিশ্রম করছেন মৃৎশিল্পীরা।
প্রতিমা শিল্পীরা জানান, একটি প্রতিমা নির্মাণ কেবল মাটি, খড় ও রঙের সমন্বয় নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা, সৃজনশীলতা, নিষ্ঠা ও মানুষের আবেগ। প্রতিটি প্রতিমাকে অন্যটির চেয়ে আলাদা ও নান্দনিক করে তুলতে তারা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছেন। প্রতিমা শিল্পী গৌরাঙ্গ পাল বলেন, একটি প্রতিমা তৈরিতে খড়ের কাঠামো তৈরি থেকে শুরু করে মাটি দেওয়া, শুকানো, রঙ করা ও অলংকার পরানো পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে সময় ও শ্রম দিতে হয়। প্রতিমা পূর্ণতা পাওয়ার পর ভক্তদের আনন্দই তাদের পরিশ্রমের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।
বাংলাদেশ পূজা উদযাপন ফ্রন্টের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ও মণিরামপুর উপজেলা শাখার আহ্বায়ক সন্তোষ স্বর জানান, এ বছর মণিরামপুর উপজেলায় ১০৩টি মন্দির ও পূজামণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হবে। প্রতিমা নির্মাণের কাজ শেষ পর্যায়ে রয়েছে। পাশাপাশি প্যান্ডেল, ডেকোরেশন, আলোকসজ্জা ও অন্যান্য প্রস্তুতিও এগিয়ে চলছে। তিনি বলেন, এবারের দুর্গোৎসব আরও সুন্দর ও উৎসবমুখরভাবে উদযাপনের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। সব ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মানুষের সহযোগিতা এবং পারস্পরিক সম্প্রীতির মধ্য দিয়ে শান্তিপূর্ণ পরিবেশে পূজা উদযাপনের প্রত্যাশা রয়েছে।
মণিরামপুরের বিভিন্ন পূজামণ্ডপের মধ্যে মশিয়াহাটি, হাজিরহাট, ঢাকুরিয়া, ভবানীপুর, ভবদহ ও মোহনপুরের আয়োজনকে ঘিরে দর্শনার্থীদের আগ্রহ তুলনামূলক বেশি। এসব মণ্ডপে প্রতিমা, প্যান্ডেল, আলোকসজ্জা ও সাংস্কৃতিক আয়োজনকে ঘিরে নেওয়া হচ্ছে নানা প্রস্তুতি। বিশেষ করে মশিয়াহাটি, হাজিরহাট, ভবানীপুর, ভবদহ এবং মোহনপুর সার্বজনীন কালী ও দুর্গাপূজা মন্দিরে চলছে ব্যতিক্রমী আয়োজনের প্রস্তুতি। সংশ্লিষ্টরা জানান, গত কয়েক বছরে এসব মণ্ডপের সাজসজ্জা জেলা পর্যায়ের বিভিন্ন মূল্যায়নে প্রশংসিত হয়েছে। এবারও সেই ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে নতুনত্ব আনার চেষ্টা চলছে।
মোহনপুর সার্বজনীন কালী ও দুর্গাপূজা মন্দির কমিটির সভাপতি দেবাশীষ সরকার বাবু, সাধারণ সম্পাদক মদনমোহন ঘোষ ও যুগ্ম-সম্পাদক সুকান্ত ঘোষ টপিসহ সংশ্লিষ্টরা জানান, এবারের প্রতিমা, মণ্ডপসজ্জা ও আলোকসজ্জায় দর্শনার্থীদের জন্য নতুন কিছু উপহার দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। সর্বোচ্চমানের মৃৎশিল্পী ও দক্ষ কারিগরদের মাধ্যমে প্রতিমা নির্মাণের কাজ করা হচ্ছে। পাশাপাশি প্যান্ডেল ও আলোকসজ্জায় বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
মোহনপুর সার্বজনীন কালী ও দুর্গাপূজা মন্দিরের যুগ্ম-সম্পাদক সুকান্ত ঘোষ টপি বলেন, এবারের আলোকসজ্জায় বিশেষ পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। ঐতিহ্যবাহী মাগুরার পূজামণ্ডপগুলোতে যে ধরনের নান্দনিক আলোকসজ্জা দর্শনার্থীদের আকর্ষণ করে, মোহনপুরেও তেমন ব্যতিক্রমী আলোকসজ্জার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। বিশেষ আলোকসজ্জার জন্য কুষ্টিয়া থেকে লাইটিংয়ের সরঞ্জাম ও সংশ্লিষ্ট কারিগর আনা হচ্ছে। পুরো মণ্ডপ এলাকাকে আলোর ভিন্ন এক আবহে সাজানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
মশিয়াহাটির বাসিন্দা প্রবীর কুমার সরকার বলেন, দুর্গাপূজা শুধু ধর্মীয় উৎসব নয়, এটি সামাজিক মিলনেরও বড় উপলক্ষ। সারা বছর যাদের সঙ্গে দেখা হয় না, পূজার সময় তাদের সঙ্গে দেখা হয়। আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব সবাই একত্রিত হন। পূজার আনন্দ সবার মধ্যে ছড়িয়ে পড়ুক—এটাই তাদের প্রত্যাশা।
ভবানীপুর এলাকার ব্যবসায়ী সঞ্জয় কুমার বিশ্বাস বলেন, পূজাকে কেন্দ্র করে বাজারে ক্রেতা বেড়েছে। নতুন পোশাক, প্রসাধনী, জুতা ও উপহারসামগ্রী কেনার জন্য মানুষ এখন প্রতিদিন বাজারে আসছেন। পূজার দিনগুলোতে বেচাকেনা আরও বাড়বে বলে আশা করছেন ব্যবসায়ীরা।
উৎসবকে ঘিরে মণিরামপুরে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির চিত্রও চোখে পড়ছে। বিভিন্ন পূজামণ্ডপের প্রস্তুতিতে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের পাশাপাশি অন্য সম্প্রদায়ের মানুষও সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিচ্ছেন। কোথাও মণ্ডপ নির্মাণের কাজে সহায়তা করছেন বিভিন্ন ধর্মের তরুণরা, কোথাও আবার নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা রক্ষায় স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে কাজ করছেন স্থানীয় যুবকরা। দীর্ঘদিনের সম্প্রীতির এই বন্ধনই মণিরামপুরের দুর্গোৎসবকে আরও অর্থবহ করে তুলেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
শাস্ত্রীয় প্রথা অনুযায়ী দেবী দুর্গার আগমন ও গমন কোন বাহনে হচ্ছে, তা নিয়েও ভক্তদের মধ্যে রয়েছে বিশেষ আগ্রহ। এবার দেবীর আগমন হবে ঘোটকে অর্থাৎ ঘোড়ায় এবং গমন হবে নৌকায়। ধর্মীয় ব্যাখ্যায় ঘোটকে দেবীর আগমনকে নানা ধরনের পরিবর্তন ও অস্থিরতার প্রতীক হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়। অন্যদিকে নৌকায় দেবীর গমনকে শস্যবৃদ্ধি, সমৃদ্ধি ও কল্যাণের ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হলেও লোকবিশ্বাসে অতিবৃষ্টি বা বন্যার আশঙ্কার কথাও উল্লেখ রয়েছে। তবে এসব ব্যাখ্যার ঊর্ধ্বে ভক্তদের মূল প্রত্যাশা—দেবীর আগমনে মানুষের জীবনে শান্তি, কল্যাণ, সম্প্রীতি ও সমৃদ্ধি ফিরে আসুক।
পূজাকে ঘিরে মণিরামপুরের বিভিন্ন বাজার ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানেও এখন ব্যস্ততা বেড়েছে। নতুন পোশাক, প্রসাধনী, জুতা, শিশুদের সামগ্রী, অলংকার ও উপহারসামগ্রী কেনাকাটায় মানুষের আগ্রহ বাড়ছে। অনেক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর জন্যও পূজার এই সময়টি বাড়তি আয়ের সুযোগ তৈরি করে। শিশু-কিশোরদের মধ্যেও উৎসবের উচ্ছ্বাস স্পষ্ট। নতুন পোশাক পরা, বন্ধুদের সঙ্গে মণ্ডপ ঘুরে দেখা এবং বিভিন্ন আয়োজনে অংশ নেওয়ার পরিকল্পনায় তারা এখন ব্যস্ত।
উৎসবের নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা বজায় রাখতে প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, পূজা উদযাপন কমিটি ও স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবকদের সমন্বয়ে প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পূজার কয়েকটি দিন যাতে নির্বিঘ্নে ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে উদযাপিত হয়, সে বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। মণ্ডপগুলোতে স্বেচ্ছাসেবক নিয়োগ, দর্শনার্থীদের চলাচল নিয়ন্ত্রণ এবং সার্বক্ষণিক নজরদারির ব্যবস্থাও রাখা হচ্ছে।
নির্ধারিত তিথি অনুযায়ী ১৫ অক্টোবর মহাপঞ্চমী, ১৬ অক্টোবর ষষ্ঠী, ১৭ ও ১৮ অক্টোবর সপ্তমী, ১৯ অক্টোবর মহাষ্টমী, ২০ অক্টোবর মহানবমী এবং ২১ অক্টোবর বিজয়া দশমী পালিত হবে। বিজয়া দশমীর দিন প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হবে এবারের শারদীয় দুর্গোৎসব।
পূজার কয়েকটি দিন মণিরামপুরজুড়ে থাকবে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান, প্রার্থনা, সাংস্কৃতিক আয়োজন, দর্শনার্থীদের ভিড় ও উৎসবের নানা রঙ। এরই মধ্যে সন্ধ্যার পর আলোকসজ্জায় বদলে যাচ্ছে মণ্ডপগুলোর চেহারা। কোথাও চলছে ঢাকের মহড়া, কোথাও শেষ মুহূর্তের সাজসজ্জা, আবার কোথাও দর্শনার্থীদের স্বাগত জানানোর প্রস্তুতি। সব মিলিয়ে পূজার আগেই উৎসবের আবহ ছড়িয়ে পড়েছে পুরো উপজেলায়।
কাশফুল দুলছে, শিউলি ঝরছে, মণ্ডপে জ্বলছে আলোর মালা। শরতের স্নিগ্ধ প্রকৃতি, নান্দনিক প্রতিমা, উৎসবের প্রস্তুতি আর মানুষের মিলনমেলায় মণিরামপুর এখন অপেক্ষা করছে সেই মাহেন্দ্রক্ষণের জন্য। ঢাকের বাদ্য, শঙ্খধ্বনি ও উলুধ্বনিতে মুখর হয়ে উঠবে জনপদ; পূজামণ্ডপে জ্বলবে হাজারো আলোর মালা। ধর্মীয় বিশ্বাস, ঐতিহ্য ও সম্প্রীতির বার্তা নিয়ে মণিরামপুরের ১০৩টি পূজামণ্ডপ এখন প্রস্তুত দেবী দুর্গাকে বরণ করে নিতে। চারদিকে যেন একটাই প্রত্যাশা—আসছেন মা দুর্গা।