বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
প্রিন্ট: অক্টোবর ৮, ২০২৬, ১:১৭ পূর্বাহ্ণ প্রকাশ: অক্টোবর ৭, ২০২৬, ১১:৪৩ পূর্বাহ্ণ

দ্রব্যমূল্যের চাপে কাহিল কক্সবাজারের নিম্ন ও মধ্যবিত্ত

দ্রব্যমূল্যের চাপে কাহিল কক্সবাজারের নিম্ন ও মধ্যবিত্ত

কক্সবাজার শহরে রিকশা চালিয়ে সংসার চালান ফেনীর দাগনভূঞার মুহাম্মদ ইউছুফ (৪৩)। মাসে গড়ে আয় ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা। স্ত্রী ও চার সন্তান নিয়ে পেশকারপাড়ায় তিন কক্ষের টিনের ঘরে থাকেন তিনি। পাঁচ বছর আগেও এর চেয়ে কম আয়েই মোটামুটি চলত সংসার। এখন আয় বাড়লেও সংসারে স্বস্তি নেই। বরং বেড়েছে অভাব-অনটন ও অশান্তি।

সংসারের ব্যয় সামলাতে ইউছুফের স্ত্রী পাশের একটি নারী শিক্ষার্থীদের মেসে রান্নার কাজ নিয়েছেন। দুবেলা রান্না করে মাসে পান প্রায় দেড় হাজার টাকা। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছাত্র ছেলে ইমরানও স্কুলের আগে ও পরে স্থানীয় দোকানে ছোটখাটো কাজ করে দিনে ৪০ থেকে ৫০ টাকা আয় করে। সব মিলিয়ে পরিবারের মাসিক আয় এখন ১২ থেকে ১৫ হাজার টাকা। কিন্তু জীবনযাত্রার মান আগের তুলনায় কমেছে বলে মনে করেন ইউছুফ।

ইউছুফ বলেন, ২০১৩ সালে যে বাসায় ৯০০ টাকা ভাড়ায় উঠেছিলেন, এখন সেই বাসার ভাড়া ৬ হাজার টাকা। আগে দেড় থেকে দুইশ টাকার বাজারে পরিবারের তিন বেলা খাবার হয়ে যেত। এখন ৪০০ থেকে ৫০০ টাকার বাজার করেও ঠিকমতো খাওয়া সম্ভব হয় না।

ইউছুফের মতো কক্সবাজারের স্বল্প ও নির্দিষ্ট আয়ের মানুষের জীবনও দ্রব্যমূল্যের চাপে কঠিন হয়ে উঠেছে। নিত্যপণ্যের পাশাপাশি বেড়েছে বাসাভাড়া, যাতায়াত, শিক্ষা ও চিকিৎসা ব্যয়। আয় বাড়লেও ব্যয়ের সঙ্গে তাল মেলাতে পারছেন না নিম্নবিত্ত থেকে মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষ।

সীমিত আয়ের মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চাল, তেল, মাছ, মাংস, সবজি ও অন্যান্য নিত্যপণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় আগের মতো সংসার চালানো যাচ্ছে না। বাজারের এই চাপ শুধু নিম্নবিত্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, মধ্যবিত্ত ও উচ্চমধ্যবিত্ত পরিবারেও এর প্রভাব পড়েছে।

বর্তমানে বাজারে ভালো মানের চালের কেজি ৬০ থেকে ৯০ টাকা। মোটা চালও ৫০ টাকার নিচে পাওয়া কঠিন। তুলনামূলক কম দামের সবজি ঝিঙা ও মিষ্টিকুমড়ার দামও কেজিপ্রতি প্রায় ৫০ টাকা। অন্যান্য সবজির দাম ৭০ থেকে ৮০ টাকা বা তার বেশি। ফলে নিম্ন আয়ের মানুষ বাজারে গিয়ে অনেক পণ্য না কিনেই ফিরছেন।

বেড়েছে মেসের খরচ

কক্সবাজার শহরের কালুর দোকান এলাকায় একটি নারী শিক্ষার্থীদের মেসে ১৫ থেকে ২০ জন শিক্ষার্থী থাকেন। মেস চালুর সময় সিটপ্রতি ভাড়া ছিল ৫০০ টাকা। এখন একই সিটের জন্য গুনতে হচ্ছে ১ হাজার ৭০০ থেকে ২ হাজার টাকা। গ্যাস ও নিত্যপণ্যের দাম বাড়ায় খাবারের খরচও বেড়েছে।

শিক্ষার্থীদের কয়েকজন জানান, আগে থাকা-খাওয়া মিলিয়ে মাসে দুই থেকে আড়াই হাজার টাকায় চলা যেত। এখন সেই খরচ বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় সাড়ে ৫ হাজার টাকায়। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে যাতায়াতের খরচ। ব্যয় সামলাতে কেউ কেউ পড়াশোনা ছেড়ে বাড়ি ফিরে যাচ্ছেন।

বেতন বাড়লেও স্বস্তি নেই

কক্সবাজার শহরের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন ইকবাল হোসেন। ছয় বছর আগে যে বেতনে ছয়জনের সংসার ভালোভাবে চলত, এখন বেতন বাড়লেও আগের মতো কুলিয়ে উঠতে পারছেন না তিনি।

ইকবাল বলেন, ‘চাল, কাঁচা তরকারি, মাছ, মাংস ও ডিমের দামে প্রতিনিয়ত পরিবর্তন হচ্ছে। সংসার চালাতে গিয়ে এখন বাজারের পরিস্থিতি খুব কাছ থেকে বুঝতে হচ্ছে।’

শহরের একটি অভিজাত হোটেলের নিরাপত্তাকর্মী মোহাম্মদ ফারুকের মাসিক আয় প্রায় ২০ হাজার টাকা। কলাতলীতে ভাড়া বাসায় পরিবার নিয়ে থাকেন তিনি। গ্রামের বাড়িতে বাবা-মায়ের খরচও চালাতে হয়। বাসাভাড়া, খাবার ও সন্তানের পড়াশোনার ব্যয় মিটিয়ে এখন দুই পরিবারের খরচ চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।

গৃহবধূ আমেনার পরিবারেও একই চিত্র। তার স্বামীর আয় ছয় বছরে প্রায় ১৫ শতাংশ বাড়লেও সংসারের ব্যয় বেড়েছে তার চেয়ে অনেক বেশি। আগে মাস শেষে কিছু টাকা সঞ্চয় করা গেলেও এখন প্রতি মাসেই টানাটানি করতে হয়।

আমেনা বলেন, চিকিৎসা ব্যয়ও বেড়েছে। আগে সন্তানকে চিকিৎসকের কাছে নিতে ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা ফি দিতে হতো, এখন তা ৭০০ থেকে ১ হাজার টাকা। শিশুখাদ্যের দামও কয়েক গুণ বেড়েছে। তাই সংসারের খরচ কমাতে মাছ-মাংস কেনা কমিয়ে দিয়েছেন তিনি। বিভিন্ন পারিবারিক দায়িত্ব সামলাতে গিয়ে এখন প্রতি মাসেই ঋণ করতে হচ্ছে।

শিক্ষা ও চিকিৎসায় বাড়তি চাপ

কক্সবাজার শহরের একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক রুমেনা আকতারের চাকরির বয়স ১৫ বছর। দুই মেয়ের পড়াশোনা, বাসাভাড়া, যাতায়াত ও সংসারের অন্যান্য খরচ সামলাতে তার পরিবারও হিমশিম খাচ্ছে।

রুমেনা বলেন, ‘বাসাভাড়া ও গাড়িভাড়া ইচ্ছেমতো বাড়ানো গেলেও চাকরিজীবীদের বেতন ইচ্ছেমতো বাড়ানো যায় না। এই ঊর্ধ্বগতির বাজারে নিজের শখ-আহ্লাদ পূরণ তো দূরের কথা, বেঁচে থাকাটাই দায় হয়ে পড়েছে।’

শহরের একটি পত্রিকা অফিসের কর্মী আবদুল্লাহ স্ত্রী, মা ও বোনকে নিয়ে চার সদস্যের সংসার চালান। নিজের বেতনে পুরো মাস ভালোভাবে চলা কঠিন হয়ে পড়েছে বলে জানান তিনি।

ঈদগাঁওয়ের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক আকরাম আলীর ১০ সদস্যের সংসারেও ব্যয় বেড়েছে। একসময় একটি দোকান ও এক ছেলের আয়ে সংসার চললেও এখন দোকানের সংখ্যা বেড়ে দুইটি হয়েছে, আরেক ছেলে আয় করতে শুরু করেছেন। তারপরও আগের মতো সংসার চালানো সম্ভব হচ্ছে না।

আকরাম আলী বলেন, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বাড়লেও মানুষের আয় সেভাবে বাড়ছে না। ফলে বেচাকেনা কমেছে এবং আয়-ব্যয়ের সামঞ্জস্য রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে।

নিয়ন্ত্রণ জরুরি

অর্থনীতিবিদদের মতে, নিত্যপণ্যের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি সীমিত ও নির্ধারিত আয়ের মানুষের জন্য বড় বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। দ্রব্যমূল্য বাড়ার সঙ্গে আয় একই হারে না বাড়লে মানুষের জীবনযাত্রার মান কমে যাওয়াই স্বাভাবিক।

কক্সবাজার চেম্বারের সাবেক সভাপতি আবু মোরশেদ চৌধুরী খোকা বলেন, সামষ্টিক অর্থনীতিতে ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়েছে। সরকারকে বেশি দামে জ্বালানি কিনে কম দামে বিক্রি করতে হচ্ছে। বিদ্যুৎ ও কৃষি-খাদ্য খাতেও ভর্তুকি দিতে হচ্ছে।

তিনি বলেন, ‘জিনিসপত্রের দাম বাড়লে সীমিত ও নির্ধারিত আয়ের মানুষের কষ্ট বাড়বে, এটাই স্বাভাবিক। কাগুজে মুদ্রা ছেপে সাময়িকভাবে সংকট সামাল দেওয়া গেলেও মূল্যস্ফীতির ওপর এর প্রভাব ভয়াবহ হতে পারে।’

সচেতন মহলের মতে, নিত্যপণ্যের পাশাপাশি বাসাভাড়া ও যাতায়াতের খরচ বাড়ায় মানুষের মধ্যে ক্ষোভও বাড়ছে। ব্যয় কমানোর চেষ্টা করেও অনেক পরিবার এখন আর নতুন কোনো খাত খুঁজে পাচ্ছে না। ফলে ধারদেনা করে সংসার চালাতে হচ্ছে।

তাদের মতে, এই পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের দুর্ভোগ আরও বাড়বে। তাই দ্রব্যমূল্য ও জীবনযাপনের ব্যয় নিয়ন্ত্রণে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।