দেশের বৈদেশিক কর্মসংস্থানের বাজারে দীর্ঘদিন ধরে সংকোচন চলছে। ঐতিহ্যবাহী মধ্যপ্রাচ্যের বাজারগুলোতে নিয়োগ কমার পাশাপাশি ইউরোপ ও পূর্ব এশিয়ার উচ্চ মজুরির নতুন বাজারেও প্রয়োজনীয় দক্ষ কর্মীর ঘাটতির কারণে বাংলাদেশ কাঙ্ক্ষিতভাবে প্রবেশ করতে পারছে না। ফলে বিদেশে কর্মী পাঠানোর সংখ্যা বাড়লেও রেমিট্যান্স বৃদ্ধি এবং টেকসই শ্রমবাজার সম্প্রসারণ নিয়ে তৈরি হয়েছে নতুন চ্যালেঞ্জ।
জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ১১ লাখ ৩০ হাজার ৭৫৭ জন কর্মী বিদেশে গেছেন। তাদের মধ্যে ৪৩ দশমিক ৪৭ শতাংশ কম দক্ষ, ৩৪ দশমিক ৪৬ শতাংশ আধা-দক্ষ, ১৯ দশমিক ১৩ শতাংশ দক্ষ এবং মাত্র ২ দশমিক ৯৪ শতাংশ পেশাজীবী। অর্থাৎ বিদেশগামী কর্মীদের প্রায় ৭৮ শতাংশই কম দক্ষ বা আধা-দক্ষ।
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা রামরুর তথ্যেও একই চিত্র উঠে এসেছে। সংস্থাটির হিসাবে, বিদেশগামী কর্মীদের মাত্র ৩ থেকে ৪ শতাংশ পেশাজীবী এবং ২০ থেকে ২২ শতাংশ দক্ষ।
একের পর এক বাজার বন্ধ
গত এক দশকে ওমান, বাহরাইন, লিবিয়া, সুদান, মিসর, রোমানিয়া ও ব্রুনাইসহ কয়েকটি দেশ বাংলাদেশ থেকে কর্মী নেওয়া বন্ধ করেছে। ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর থেকে লাওসও বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগ স্থগিত করেছে।
বাংলাদেশের বৈদেশিক কর্মসংস্থানের বড় দুর্বলতা হলো কয়েকটি দেশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা। তথ্য অনুযায়ী, মোট প্রবাসী কর্মীর প্রায় ৯৪ শতাংশই যাচ্ছেন মাত্র সাতটি দেশে। এর বেশিরভাগই মধ্যপ্রাচ্যের দেশ। ফলে এসব বাজারে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক বা নিরাপত্তাজনিত সংকট তৈরি হলে তার সরাসরি প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশের শ্রমবাজারে।
কমছে বিদেশে কর্মী যাওয়া
২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ১ লাখ ১৯ হাজার ৩৮৯ জন কর্মী বিদেশে গেলেও ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে তা ২১ শতাংশ কমে ৯৪ হাজার ১৮৯ জনে দাঁড়ায়। গত ২৫ আগস্ট পর্যন্ত ৪ লাখ ৮৬ হাজার ২৫ জন কর্মী বিদেশে গেছেন বলে সংসদে জানিয়েছেন প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী। এর মধ্যে জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত প্রথম তিন মাসেই গেছেন ১ লাখ ৬৬ হাজার ৩৪৫ জন।
চলতি বছরের প্রথম নয় মাসে, অর্থাৎ জানুয়ারি থেকে ২৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত, বিদেশে কর্মী গমন আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৩৩ শতাংশ কমেছে।
দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকা মালয়েশিয়া ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের শ্রমবাজার পুনরায় চালুর জন্য সরকার বিভিন্ন উদ্যোগ নিলেও এখনো উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধও বাংলাদেশের বড় শ্রমবাজারগুলোতে অনিশ্চয়তা বাড়িয়েছে। সৌদি আরব, কাতার ও কুয়েতে কর্মী যাওয়ার হার কমেছে।
জাপানেও বড় পরিসরে কর্মী পাঠানোর কথা বিভিন্ন সময়ে বলা হলেও প্রত্যাশিত অগ্রগতি এখনো দৃশ্যমান নয়।
তবে প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও গত সাত মাসে প্রায় ৪ লাখ ৩৪ হাজার কর্মী বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ পেয়েছেন বলে জানিয়েছেন প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী। তার দাবি, বর্তমান পরিস্থিতিতেও সরকার শ্রমবাজার ধরে রাখার পাশাপাশি নতুন বাজার তৈরির চেষ্টা করছে।
কেন সংকুচিত হচ্ছে শ্রমবাজার
সংশ্লিষ্টদের মতে, অবৈধ অভিবাসন, মানবপাচার, নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অনিয়ম, আইন লঙ্ঘন এবং দক্ষ কর্মীর ঘাটতি বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ কমার অন্যতম কারণ। বিশেষজ্ঞদের মতে, সিন্ডিকেট, অতিরিক্ত অভিবাসন ব্যয় এবং কর্মীদের প্রতারিত হওয়ার ঘটনা মালয়েশিয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ বাজারে বাংলাদেশের ভাবমূর্তিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, বিদেশগামী কর্মীদের দক্ষ করে গড়ে তোলার ওপর সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে। ভাষা শিক্ষা ও কারিগরি প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কর্মীদের প্রস্তুত করা হচ্ছে, যাতে তারা বিদেশে গিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে না পড়েন।
তিনি আরও জানান, পশ্চিম এশিয়ার বাইরে ইউরোপসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নতুন শ্রমবাজার তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নতুন খাত ও বাজার চিহ্নিত করে জনশক্তি রপ্তানির কার্যকর পরিকল্পনাও নেওয়া হচ্ছে।
দক্ষ কর্মী পাঠানোই বড় চ্যালেঞ্জ
মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও থাইল্যান্ডসহ নতুন শ্রমবাজারে প্রবেশের কথা বলছে সরকার। ২০২৬-২০৩০ মেয়াদের কৌশলপত্রে শিক্ষিত ও দক্ষ তরুণদের বিদেশে কর্মসংস্থান বাড়ানোকে অন্যতম লক্ষ্য হিসেবে ধরা হয়েছে।
তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বড় সমস্যা হলো চাহিদা ও জোগানের মধ্যে ব্যবধান। ইউরোপ ও অন্যান্য উন্নত দেশে স্বাস্থ্যসেবা, তথ্যপ্রযুক্তি, প্রকৌশল এবং বিশেষায়িত নির্মাণ খাতে দক্ষ কর্মীর চাহিদা বেশি। এসব ক্ষেত্রে বাংলাদেশের প্রয়োজনীয় দক্ষ কর্মীর সংখ্যা এখনো পর্যাপ্ত নয়।
অভিবাসী কর্মী উন্নয়ন প্রোগ্রামের (ওকাপ) চেয়ারপারসন শাকিরুল ইসলাম বলেন, মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার নিয়ে সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের বিভ্রান্তিকর বক্তব্যের পর দেশটির আনুষ্ঠানিক প্রত্যাখ্যান বাজারটি চালুর সম্ভাবনাকে আরও কঠিন করেছে। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা ও কার্যকর দ্বিপক্ষীয় আলোচনার অভাবে সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ কয়েকটি বড় বাজারে নতুন কর্মী নিয়োগ থমকে আছে।
তার মতে, বাংলাদেশের অন্যতম দুর্বলতা হলো শক্তিশালী অভিবাসনকেন্দ্রিক কূটনীতির ঘাটতি। নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অনিয়ম এবং অতিরিক্ত অভিবাসন ব্যয়ও কর্মীদের ওপর বড় আর্থিক চাপ তৈরি করছে।
সংখ্যার বদলে দক্ষতায় গুরুত্ব
সরকার চলতি অর্থবছরে ১৪ লাখ কর্মী বিদেশে পাঠানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। পাশাপাশি আগামী পাঁচ বছরে এক কোটি কর্মী বিদেশে পাঠানোর লক্ষ্যও সামনে এসেছে।
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শ্রমবাজার সংকুচিত হওয়ার সময়ে শুধু কর্মী পাঠানোর সংখ্যা বাড়ানো যথেষ্ট নয়। নতুন বাজার তৈরি, দক্ষ কর্মী গড়ে তোলা এবং বিদেশে যে চাকরির প্রতিশ্রুতি দেওয়া হচ্ছে, সেটি বাস্তবে রয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করাও জরুরি।
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. সাইফুল হক চৌধুরী জানান, আগামী পাঁচ বছরে এক কোটি কর্মী বিদেশে পাঠানোর লক্ষ্য রয়েছে। তবে বর্তমান ধারায় কাজ চললে এ লক্ষ্য অর্জনের জন্য প্রয়োজনীয় সক্ষমতার ৫৫ থেকে ৬০ শতাংশ বাংলাদেশের রয়েছে। লক্ষ্য পূরণে বর্তমান প্রচেষ্টার পাশাপাশি সক্ষমতা আরও বাড়াতে হবে।
অভিবাসন ও শরণার্থী বিষয়ক বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনীর বলেন, এতদিন বিদেশে কত লাখ কর্মী গেলেন, সেটিকেই বৈদেশিক কর্মসংস্থানের সাফল্যের প্রধান সূচক হিসেবে দেখা হয়েছে। কিন্তু পরিবর্তিত শ্রমবাজারে কর্মীর দক্ষতা, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি, ভাষাজ্ঞান, কাজের অভিজ্ঞতা এবং প্রযুক্তির সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর সক্ষমতাও গুরুত্বপূর্ণ।
ব্র্যাকের সহযোগী পরিচালক (মাইগ্রেশন অ্যান্ড ইয়ুথ প্ল্যাটফর্ম) শরিফুল হাসান বলেন, আগামী পাঁচ বছরে এক কোটি কর্মী না গেলেও ৬০ থেকে ৭০ লাখ কর্মী পাঠানো সম্ভব। তবে বিদেশে কত মানুষ গেলেন, সেটি সাফল্যের একমাত্র সূচক হওয়া উচিত নয়। কর্মীরা কত কম খরচে বিদেশ যেতে পারলেন, সেই ব্যয় তারা কত দ্রুত তুলতে পারছেন এবং দেশে রেমিট্যান্স কতটা বাড়ছে, সেসব বিষয়ও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
ফলে বাংলাদেশের বৈদেশিক কর্মসংস্থানের সামনে এখন মূল প্রশ্ন শুধু কতজন কর্মী বিদেশে পাঠানো যাবে তা নয়; বরং কতজন দক্ষ কর্মীকে কম খরচে, নিরাপদ ও টেকসই চাকরিতে পাঠানো সম্ভব হবে।

