বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
প্রিন্ট: অক্টোবর ৪, ২০২৬, ৪:৪৮ অপরাহ্ণ প্রকাশ: অক্টোবর ৩, ২০২৬, ১২:০৪ অপরাহ্ণ

ইরান ঘিরে মার্কিন সামরিক তৎপরতা, বাড়ছে সংঘাতের আশঙ্কা

ইরান ঘিরে মার্কিন সামরিক তৎপরতা, বাড়ছে সংঘাতের আশঙ্কা

ইরানকে ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যে আবারও সামরিক উপস্থিতি বাড়াচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। নতুন করে সেনা, যুদ্ধবিমান ও যুদ্ধজাহাজ মোতায়েনের মধ্য দিয়ে সম্ভাব্য সামরিক অভিযানের প্রস্তুতি নিচ্ছে ওয়াশিংটন। তবে এই মোতায়েনের লক্ষ্য সরাসরি ইরানে নতুন হামলা চালানো, নাকি কূটনৈতিক আলোচনায় তেহরানকে চাপে রাখা, তা এখনো স্পষ্ট নয়।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ বলেছেন, সম্ভাব্য যেকোনো পরিস্থিতির জন্য মার্কিন বাহিনী প্রস্তুত রয়েছে। অন্যদিকে বিশ্লেষকদের কেউ কেউ মনে করছেন, ইরানের সঙ্গে আলোচনায় নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করতেই এই সামরিক উপস্থিতি বাড়ানো হয়েছে।

এর মধ্যেই ইরানের কাছাকাছি মধ্যপ্রাচ্যের জলসীমায় তৃতীয় একটি মার্কিন বিমানবাহী রণতরি বহর পাঠানো হচ্ছে। এক মার্কিন কর্মকর্তার বরাত দিয়ে আল জাজিরা জানিয়েছে, ইউএসএস থিওডোর রুজভেল্ট বিমানবাহী রণতরি বহর রোববার ক্যালিফোর্নিয়ার সান দিয়েগো ঘাঁটি থেকে মধ্যপ্রাচ্যের উদ্দেশে রওনা হয়েছে। পরদিন মেকিন আইল্যান্ড মেরিন এক্সপেডিশনারি ইউনিটও যাত্রা শুরু করে। এতে দুই হাজারের বেশি মেরিন সেনা রয়েছে।

দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নতুন করে বিমানবাহী রণতরি ও অন্যান্য নৌবাহিনী মোতায়েনের ফলে মধ্যপ্রাচ্যে অতিরিক্ত ৯ হাজার থেকে ১০ হাজার মার্কিন সেনা যুক্ত হতে পারে। এর মধ্যে নাবিক ও মেরিন সেনারাও রয়েছেন।

ওই মার্কিন কর্মকর্তা জানান, নভেম্বরের শেষ নাগাদ ইরানের কাছাকাছি এলাকায় তিনটি বিমানবাহী রণতরি এবং দুটি উভচর অবতরণকারী বহর অবস্থান করতে পারে। এতে ইরানকে ঘিরে সামরিক পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে আরও বেশি বিকল্প তৈরি হবে।

আল জাজিরার প্রতিবেদক তানিয়া নুরি জানিয়েছেন, নতুন মোতায়েনের মধ্যে এফ-৩৫ যুদ্ধবিমানও রয়েছে। এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যে আগে থেকে অবস্থান করা প্রায় ৫০ হাজার মার্কিন সেনার সঙ্গে আরও সামরিক শক্তি যুক্ত হবে।

কী ধরনের সামরিক শক্তি পাঠাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র

মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি নতুন নয়। কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের তথ্য অনুযায়ী, অঞ্চলটির অন্তত ১৯টি স্থানে যুক্তরাষ্ট্রের স্থায়ী ও অস্থায়ী সামরিক স্থাপনা রয়েছে। বাহরাইন, মিসর, ইরাক, জর্ডান, কুয়েত, কাতার, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে রয়েছে স্থায়ী ঘাঁটি।

চলতি বছরের শুরু থেকেই মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক উপস্থিতি বাড়াচ্ছে ট্রাম্প প্রশাসন। যুদ্ধের আগে ১২০টির বেশি বিমান এ অঞ্চলে মোতায়েন করা হয় বলে ওপেন সোর্স গোয়েন্দা বিশ্লেষণ ও সামরিক বিমান চলাচল পর্যবেক্ষণের তথ্য থেকে জানা যায়।

এসব বিমানের মধ্যে ছিল ই-৩ সেন্ট্রি অ্যাওয়াকস, এফ-৩৫ ও এফ-২২ যুদ্ধবিমান। পাশাপাশি এফ-১৫ ও এফ-১৬ যুদ্ধবিমান, কার্গো বিমান এবং আকাশে জ্বালানি সরবরাহকারী ট্যাংকার বিমানও মোতায়েন করা হয়েছে।

সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, এত বড় পরিসরের মোতায়েনকে সাধারণ সেনা বা বিমান পরিবর্তনের অংশ হিসেবে দেখা কঠিন। বরং এটি দীর্ঘমেয়াদি সামরিক অভিযানের প্রস্তুতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে পারে।

আরও কয়েক হাজার সেনা মোতায়েন

মার্চে উপসাগরীয় অঞ্চলে অতিরিক্ত মার্কিন সেনা পাঠানোর নির্দেশ দেয় পেন্টাগন। এর মধ্যে ছিল ত্রিপোলি অ্যাম্ফিবিয়াস রেডি গ্রুপ, বক্সার অ্যাম্ফিবিয়াস রেডি গ্রুপ এবং ৮২তম এয়ারবোর্ন ডিভিশনের ইমিডিয়েট রেসপন্স ফোর্স।

ত্রিপোলি ও বক্সার রেডি গ্রুপের সঙ্গে যুক্ত দুই মেরিন ইউনিটের মাধ্যমে প্রায় ৪ হাজার ৫০০ মেরিন ও নাবিক মধ্যপ্রাচ্যে যুক্ত হয়। এর বাইরে ফোর্ট ব্র্যাগ থেকে প্রায় দুই হাজার সেনাকে প্রস্তুত রাখা হয়। সব মিলিয়ে যুদ্ধ শুরুর পর মধ্যপ্রাচ্যে প্রায় সাত হাজার অতিরিক্ত মার্কিন সেনা মোতায়েন করা হয়েছে।

কূটনীতি নাকি নতুন হামলার প্রস্তুতি?

সর্বশেষ মোতায়েনের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে বড় ধরনের সামরিক অভিযান চালাতে যাচ্ছে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়।

টাইম ম্যাগাজিনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্পকে মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ইরানে বোমা হামলা আরও বাড়ানো হতে পারে কি না, সে বিষয়ে প্রশ্ন করা হয়। তিনি এ বিষয়ে সরাসরি কোনো তথ্য প্রকাশ করেননি।

অন্যদিকে বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করছেন, ইরানের সঙ্গে চলমান আলোচনায় চাপ বাড়ানোর কৌশল হিসেবেও এই সামরিক মোতায়েন ব্যবহার করা হতে পারে। অর্থাৎ সামরিক শক্তি প্রস্তুত রেখে কূটনৈতিক সমাধানের পথও খোলা রাখতে চাইছে ওয়াশিংটন।

ইরান সম্প্রতি সাত দিনের মধ্যে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার প্রস্তাব দেয়। এর বিনিময়ে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, জব্দ করা সম্পদ অবমুক্ত করা এবং হামলা বন্ধের নিশ্চয়তা চায় তেহরান। তবে ট্রাম্প প্রশাসন সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে।

ওয়াশিংটন ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিসহ আরও কিছু বিষয় আলোচনার আওতায় আনতে চায় বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।

সব মিলিয়ে, ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি দ্রুত বাড়লেও এর চূড়ান্ত লক্ষ্য এখনো পরিষ্কার নয়। সামরিক চাপের পাশাপাশি কূটনৈতিক আলোচনা কোন দিকে এগোয়, তার ওপরই পরবর্তী পরিস্থিতি অনেকাংশে নির্ভর করবে।