রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাথি পদে ছিলেন রাকসুর সাধারণ সম্পাদক (জিএস) সালাহউদ্দিন আম্মার। নৈতিক পদস্খলন, নারীদের সঙ্গে অবাধ মেলামেশা, অর্থের বিনিময়ে পদ দেওয়ার অভিযোগ, মৌলিক ইবাদত পালনে উদাসীনতা ও অবৈধ অর্থনৈতিক লেনদেনসহ বিভিন্ন অভিযোগে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে তাঁকে সংগঠন থেকে বহিষ্কার করা হয় বলে শিবিরের সাংগঠনিক নথিতে উল্লেখ রয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রশিবিরের তিনটি সাংগঠনিক চিঠিতে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। চিঠিগুলো শিবিরের অফিশিয়াল প্যাডে না থাকলেও সংগঠনটির বর্তমান দায়িত্বশীল একাধিক নেতা বিষয়টির সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।
নথি অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি শাখা ছাত্রশিবিরের তৎকালীন সভাপতি ও রাকসুর ভিপি মোস্তাকুর রহমান জাহিদের স্বাক্ষরিত চিঠিতে আম্মারের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগের কথা উল্লেখ করা হয়। ওই চিঠিতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের রাজশাহী মহানগর ও জেলা কমিটিতে অর্থের বিনিময়ে পদ দেওয়ার অভিযোগসহ নৈতিক পদস্খলনের কথা বলা হয়। অভিযোগগুলো নিয়ে ৩ ফেব্রুয়ারির মাসিক সেক্রেটারিয়েট সভায় আলোচনা শেষে তাঁর সাথি পদ মুলতবি করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
এরপর ২০২৫ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের আরেক চিঠিতে বলা হয়, দীর্ঘদিন ধরে সাংগঠনিক শৃঙ্খলাবহির্ভূত কর্মকাণ্ড এবং তাঁকে সংশোধনের একাধিক উদ্যোগের পরও পরিবর্তন না হওয়ায় সালাহউদ্দিন আম্মারের সাথি পদ বাতিল করা হয়েছে।
সর্বশেষ চলতি বছরের ৩১ জুলাই বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রশিবিরের বর্তমান সভাপতি মুজাহিদ ফয়সালের স্বাক্ষরিত চিঠিতে আগের সিদ্ধান্তগুলোর উল্লেখ করা হয়। এতে নৈতিক পদস্খলন, মৌলিক ইবাদত পালনে উদাসীনতা, নারীদের সঙ্গে অবাধ বিচরণ, অবৈধ অর্থনৈতিক লেনদেন ও সম্পদ তছরুপ এবং সংগঠনের লক্ষ্য-উদ্দেশ্যের পরিপন্থী কাজে জড়িত থাকার অভিযোগের কথা বলা হয়।
একই চিঠিতে আম্মারের কর্মকাণ্ডের কারণে ক্যাম্পাসে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরির আশঙ্কার কথাও উল্লেখ করা হয়। সংগঠনের নেতা-কর্মীদের তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ না রাখা এবং তাঁর অনলাইন ও অফলাইন কর্মকাণ্ডে কোনো ধরনের মন্তব্য বা প্রতিক্রিয়া না দেখানোর নির্দেশ দেওয়া হয়। তবে রাকসুর নির্বাচিত দায়িত্বশীলদের তাঁর সঙ্গে দাপ্তরিক সম্পর্ক রাখার কথা বলা হয়।
ছাত্রশিবিরের বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান আম্মারের শিবির-সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তাঁর ভাষ্য, আম্মার তা’মীরুল মিল্লাত কামিল মাদ্রাসায় পড়ার সময় শিবিরের সাথি পদে যুক্ত ছিলেন এবং পরে সাংগঠনিক প্রক্রিয়ায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর সংশ্লিষ্টতা ছিল। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে তাঁর বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক অনিয়ম ও ইসলামবিরোধী কর্মকাণ্ডের অভিযোগ ওঠে এবং সন্তোষজনক জবাব না পাওয়ায় সেপ্টেম্বরে তাঁকে বহিষ্কার করা হয় বলে তিনি জানান।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে শিবিরের আরেক দায়িত্বশীল নেতাও তিনটি চিঠিকে সঠিক বলে দাবি করেছেন। তাঁর ভাষ্য, আম্মার শিবিরের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং বহিষ্কারের পর তাঁর সঙ্গে সংগঠনের সব ধরনের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন সালাহউদ্দিন আম্মার। বুধবার রাতে নিজের ফেসবুক পেজে দেওয়া এক দীর্ঘ পোস্টে তিনি বলেন, তাঁর বিরুদ্ধে নারীদের সঙ্গে অবাধ মেলামেশা, চাঁদাবাজি ও অর্থের বিনিময়ে পদ দেওয়ার অভিযোগ করা হলেও এসবের কোনো প্রমাণ দেওয়া হয়নি।
নারীদের সঙ্গে সম্পর্কের অভিযোগ অস্বীকার করে আম্মার বলেন, ক্যাম্পাসজীবনে কোনো নারী শিক্ষার্থীর সঙ্গে ভাই-বোনের সম্পর্কের বাইরে কোনো আচরণ করেননি। চাঁদাবাজির অভিযোগ প্রসঙ্গে তাঁর দাবি, জুলাই আন্দোলনকে কেন্দ্র করে একটি কনসার্ট আয়োজনের জন্য তৎকালীন উপাচার্যের পরামর্শে বিভিন্ন ব্যাংক ও কোম্পানির কাছে অর্থসহায়তার প্রস্তাব নিয়ে গিয়েছিলেন। পরে সেই প্রস্তাবপত্রকে চাঁদা চাওয়ার চিঠি হিসেবে প্রচার করা হয়।
অর্থের বিনিময়ে পদ দেওয়ার অভিযোগও অস্বীকার করেছেন তিনি। তাঁর দাবি, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় রাজশাহীর স্থানীয় শিক্ষার্থীদের নিয়ে গঠিত একটি কমিটির সঙ্গে তিনি কোনোভাবেই যুক্ত ছিলেন না।
তবে শিবিরের সাথি পদে থাকা বা পদ বাতিলের বিষয়ে তাঁর ফেসবুক পোস্টে কোনো সরাসরি ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। শিবিরের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে আম্মার বলেন, তাঁকে শিবির বলা হলেও তিনি এ বিষয়ে প্রকাশ্যেই কথা বলেছেন এবং ডানপন্থী সংস্কৃতিচর্চার কারণে অনেকে তাঁকে শিবিরের সঙ্গে যুক্ত মনে করেন। তিনি শিবিরের একটি অফিশিয়াল গানেও অভিনয় করেছেন বলে জানান।
২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমন্বয়কদের একজন ছিলেন সালাহউদ্দিন আম্মার। পরে তাঁর রাজনৈতিক মতাদর্শ ও শিবিরের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক নিয়ে ক্যাম্পাসে বিভিন্ন আলোচনা তৈরি হয়। তবে আম্মার ও শিবিরের নেতা-কর্মীরা বিভিন্ন সময়ে তাঁর সাংগঠনিক সংশ্লিষ্টতা নিয়ে ভিন্ন বক্তব্য দিয়েছেন।
বর্তমানে রাকসুর জিএস হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন সালাহউদ্দিন আম্মার। তাঁর বিরুদ্ধে শিবিরের সাংগঠনিক চিঠিতে যেসব অভিযোগের কথা বলা হয়েছে, সেগুলো নিয়ে তিনি সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন এবং কোনো অভিযোগের সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততা নেই বলে দাবি করেছেন।

