সারাদেশে কিশোর গ্যাংবিরোধী বিশেষ অভিযানের অংশ হিসেবে ২৩ সেপ্টেম্বর থেকে দেশের বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালাচ্ছে পুলিশ। এক সপ্তাহের অভিযানে কুমিল্লা, চট্টগ্রাম, চাঁদপুর, লক্ষ্মীপুর, নোয়াখালী ও ফেনীতে মোট ৩ হাজার ২৯৮ জনকে আটকের তথ্য পাওয়া গেছে।
আটকদের মধ্যে যাদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অপরাধের প্রমাণ মিলেছে, তাদের গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতের মাধ্যমে সংশোধনাগার ও কারাগারে পাঠানো হয়েছে। অন্যদের যাচাই-বাছাই শেষে মুচলেকা নিয়ে পরিবারের জিম্মায় ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
কুমিল্লায় আটক ১৬৭২
কুমিল্লায় কিশোর গ্যাংবিরোধী অভিযানে সবচেয়ে বেশি ১ হাজার ৬৭২ জনকে আটক করা হয়েছে। গত ২০ সেপ্টেম্বর কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক নাহিদা বেগমের ১৩ বছর বয়সী ছেলে ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমের মরদেহ উদ্ধারের পর জেলায় অভিযান জোরদার করা হয়।
২৩ সেপ্টেম্বর রাত থেকে জেলাজুড়ে চার দফায় অভিযান চালানো হয়। সর্বশেষ মঙ্গলবার সন্ধ্যা ৭টা থেকে গভীর রাত পর্যন্ত অভিযানে ৩৭৯ জনকে আটক করা হয়। তাদের মধ্যে ২৫৬ জনকে মুচলেকা নিয়ে পরিবারের জিম্মায় ছেড়ে দেওয়া হয়। বাকি ১২৩ জনকে বিভিন্ন মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে বুধবার আদালতে পাঠানো হয়েছে।
চার দফার অভিযানে আটক ১ হাজার ৬৭২ জনের মধ্যে ৭৪২ জনকে আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে। যাচাই-বাছাই শেষে ৯৩০ জনকে মুচলেকায় পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। তাদের অধিকাংশই শিক্ষার্থী।
জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার লুৎফর রহমান জানান, কিশোর গ্যাংবিরোধী অভিযানের পাশাপাশি মাদক ও সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানও চলছে। আদালতে পাঠানো ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মাদক সেবন, নিয়মিত মামলা, ভ্রাম্যমাণ আদালত, নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ততা এবং গ্রেপ্তারি পরোয়ানাসহ বিভিন্ন অভিযোগ রয়েছে।
লক্ষ্মীপুরে এক দিনে আটক ১৮২
লক্ষ্মীপুরে মঙ্গলবার সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত পাঁচ ঘণ্টার অভিযানে ১৮২ জনকে আটক করা হয়েছে। জেলার ছয় থানা ও গোয়েন্দা পুলিশের সমন্বয়ে এ অভিযান পরিচালিত হয়।
আটকদের মধ্যে সদর থানায় ৬৪, চন্দ্রগঞ্জে ২১, রায়পুরে ২০, রামগঞ্জে ২৪, রামগতিতে ১৩, কমলনগরে ১৭ এবং ডিবির অভিযানে ২৩ জন রয়েছেন। যাচাই-বাছাই শেষে তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হোসাইন মোহাম্মদ রায়হান কাজেমী বলেন, কিশোরদের অপরাধে জড়িয়ে পড়া ঠেকাতে এ ধরনের অভিযান অব্যাহত থাকবে।
নোয়াখালীতে আটক ১৬৩
নোয়াখালীর বিভিন্ন থানায় মঙ্গলবার সন্ধ্যা থেকে বুধবার সকাল পর্যন্ত কিশোর গ্যাংবিরোধী অভিযান চালিয়ে ১৬৩ জনকে আটক করা হয়েছে। তাদের মধ্যে দুজনকে আগের মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। আরও ৯ জনকে ৩৪ ধারায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হয়। বাকি ১৫২ জনকে মুচলেকা নিয়ে পরিবারের জিম্মায় ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
জেলা পুলিশ সুপার এন এম নাসিরুদ্দিন এ তথ্য জানিয়েছেন।
সোনাগাজীতে ৩০ জনকে মুচলেকায় ছাড়িয়ে নিল ছাত্রদল
ফেনীর সোনাগাজীতে মঙ্গলবার বিকেল থেকে সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা পর্যন্ত অভিযানে ৫১ জনকে আটক করে পুলিশ। তাদের মধ্যে ৩০ জনকে নিজেদের কর্মী-সমর্থক দাবি করে ছাত্রদলের নেতারা থানায় গিয়ে মুচলেকা দিয়ে ছাড়িয়ে নেন। বিভিন্ন অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগে তিনজনকে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। যাচাই-বাছাইয়ের আগেই আরও ১৮ জনকে ছেড়ে দেওয়া হয়।
উপজেলা ছাত্রদলের সাবেক সদস্য সচিব সোহাগ নূর জানান, আটকের খবর পেয়ে তিনি থানায় যান এবং দলীয় নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করে ৩০ কর্মী-সমর্থককে মুচলেকায় ছাড়িয়ে নেন। ভবিষ্যতে এমন ঘটনায় কারও জন্য সুপারিশ করবেন না বলেও জানান তিনি।
তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন ছাত্রদল নেতা দাবি করেন, মুচলেকায় ছাড়া পাওয়া ৩০ জনের মধ্যে ১৩ জন নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের কর্মী ছিলেন, যারা রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তনের পর ছাত্রদলের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন।
উপজেলা বিএনপির সদস্য সচিব সৈয়দ আলম ভূঞা বলেন, কিশোর গ্যাংবিরোধী অভিযান অব্যাহত থাকা উচিত। ছাত্রদলের নেতাকর্মীদেরও সন্ধ্যার পর অপ্রয়োজনে বাইরে আড্ডা না দেওয়ার নির্দেশনা রয়েছে।
সোনাগাজী মডেল থানার ওসি মোহাম্মদ আবুল হাসিম জানান, দলীয় নেতাদের অনুরোধে ৩০ জনকে মুচলেকা নিয়ে পরিবারের জিম্মায় দেওয়া হয়েছে। ভবিষ্যতে এ ধরনের বিষয়ে কোনো তদবির বা সুপারিশ নেওয়া হবে না। কিশোর অপরাধ দমনে অভিযান ও নজরদারি অব্যাহত থাকবে।

