বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
প্রিন্ট: সেপ্টেম্বর ২১, ২০২৬, ২:২৮ অপরাহ্ণ প্রকাশ: সেপ্টেম্বর ২১, ২০২৬, ১:০০ অপরাহ্ণ

অপ্রতিম হত্যা: বাবার প্রতিষ্ঠানের ডেলিভারিম্যান ফাহাদও জড়িত

অপ্রতিম হত্যা: বাবার প্রতিষ্ঠানের ডেলিভারিম্যান ফাহাদও জড়িত
পুলিশ কথা বলছেন। ছবি: সংগৃহীত

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগমের ছেলে ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম (১৩) হত্যা মামলার অন্যতম আসামি মোজাম্মেল হোসেন ফাহাদ। তিনি অপ্রতিমের বাবা ব্যবসায়ী কেএম ফিরোজ শাহরিয়ারের মোবাইল সরঞ্জামের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ডেলিভারিম্যান হিসেবে কাজ করতেন। মাত্র দুই সপ্তাহ আগে মাসিক ১৪ হাজার টাকা বেতনে তাকে কাজে নেওয়া হয়েছিল। তবে এখনো তার সঙ্গে কোনো লিখিত চুক্তি হয়নি।

পুলিশ জানিয়েছে, অপ্রতিমের আইফোন ছিনিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা থেকেই তাকে হত্যা করা হয়। গত শুক্রবার বিকেলে লালমাই পাহাড়ের নির্জন এলাকায় নিয়ে যাওয়ার পর আইফোন কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করলে অপ্রতিম বাধা দেয়। এ সময় ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে প্রথমে বাঁশের লাঠি দিয়ে অপ্রতিমের মাথায় আঘাত করেন পরিকল্পনাকারী সাইফুল ইসলাম তুহিন (১৯)। এরপর ফাহাদ (১৫) ও মো. কামরুল হাসান (১৬) তাকে আঘাত করেন।

পুলিশের দাবি, জিজ্ঞাসাবাদে তুহিন, ফাহাদ ও কামরুল হত্যার সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন। তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতেই হত্যাকাণ্ডের কারণ ও ঘটনার বিভিন্ন দিক সামনে এসেছে।

অপ্রতিমের বাবা কেএম ফিরোজ শাহরিয়ার জানান, কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্ট মার্কেটে তার মোবাইল সরঞ্জামের শোরুম ‘ইয়েসটেক’ রয়েছে। অপ্রতিমের বাসা কোটবাড়ি গন্ধমতি এলাকায়। একই এলাকার বাসিন্দা ফাহাদ। তার বাবা অটোচালক। বাবা-মায়ের অনুরোধে চলতি মাসের ২ সেপ্টেম্বর ফাহাদকে ডেলিভারিম্যান হিসেবে কাজে নেওয়া হয়। মাস শেষে তার সঙ্গে আনুষ্ঠানিক চুক্তি করার পরিকল্পনা ছিল।

ফিরোজ শাহরিয়ার বলেন, অপ্রতিম ও ফাহাদের মধ্যে তেমন কোনো বিরোধ বা ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল না। বরং অপ্রতিম ফাহাদকে ভালো বলেই মনে করত। কাজ শুরু করার পর কয়েক দিনেও তাদের মধ্যে কোনো নেতিবাচক ঘটনা ঘটেনি।

তবে তদন্তে আইফোনের পাশাপাশি আরও একটি বিষয় সামনে এসেছে। পুলিশ জানতে পেরেছে, ফাহাদ অপ্রতিমের কাছ থেকে পাঁচ হাজার টাকা ধার নিয়েছিল। সম্প্রতি ওই টাকা ফেরত দেওয়ার জন্য অপ্রতিম চাপ দিচ্ছিল। এ বিষয়টি নিয়েও ফাহাদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়ে থাকতে পারে বলে তদন্তকারীরা মনে করছেন।

যেভাবে অপ্রতিমকে ডেকে নেওয়া হয়

অপ্রতিমের বাবা জানান, শুক্রবার জুমার নামাজ শেষে বাসায় ফিরে দুপুরের খাবার খায় অপ্রতিম। বিকেল ৩টার দিকে আইফোন নিয়ে ছবি তুলতে বাসা থেকে বের হয় সে। এর আগে তুহিন মোবাইলে বার্তা পাঠিয়ে তাকে বাসা থেকে বের করে নিয়ে যায়।

সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত হলেও অপ্রতিম বাসায় না ফেরায় তার বাবা ফাহাদকে ফোন করে ডেকে আনেন। অপ্রতিম কোথায় গেছে, তা খুঁজে বের করার জন্য তাকেও সঙ্গে নেওয়া হয়। এ সময় ফাহাদ তাদের ইন্টারনেট গ্রুপে অপ্রতিম নিখোঁজ হওয়ার বিষয়টি জানায়।

এর মধ্যে অপ্রতিমের পরিবারের হাতে এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ আসে। ফুটেজে অপ্রতিমের সঙ্গে থাকা ব্যক্তিকে দেখানো হলে ফাহাদ তাকে তুহিন হিসেবে শনাক্ত করে। পরে তুহিনকে ফোন করে অপ্রতিমকে দেখেছে কি না জানতে বলা হয়। ফাহাদের সঙ্গে ফোনে কথা বলার সময় তুহিন দাবি করে, অপ্রতিম তার কাছে যায়নি। তখন রাত প্রায় ১০টা।

পুলিশের তদন্ত অনুযায়ী, এর আগেই অপ্রতিম হত্যার শিকার হয়েছিল।

পরদিন শনিবার সকালে তুহিন ও সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেপ্তার সিয়াম মোটরসাইকেলে করে অপ্রতিমের বাসায় যায়। তারা তার বাবা-মায়ের সঙ্গে কথা বলে এবং সান্ত্বনা দেয়। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, শুক্রবার বিকেল ৫টা থেকে সন্ধ্যা ৬টার মধ্যেই অপ্রতিমকে হত্যা করা হয়।

অপ্রতিমের বাবা জানান, শনিবার সকালে তুহিন স্বাভাবিক আচরণ করলেও বিভিন্ন প্রশ্নের সময় তার সঙ্গে থাকা সিয়াম কিছুটা প্রতিক্রিয়া দেখায়। পরে শনিবার দুপুরে অপ্রতিমের মরদেহ উদ্ধারের খবর পাওয়ার পর ফাহাদকে পরিবারের সঙ্গে ঘটনাস্থলে যেতে বলা হলে সে শরীর খারাপ লাগার কথা বলে সেখান থেকে চলে যায়।

নির্জন বনে নিয়ে হত্যা

পুলিশ সুপার আনিসুজ্জামান রোববার দুপুরে সংবাদ সম্মেলনে জানান, সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, শুক্রবার বিকেল আনুমানিক ৩টা ১৫ মিনিটে তুহিন অপ্রতিমকে সঙ্গে নিয়ে লালমাই পাহাড়ের সানন্দা এলাকার পাহাড়ঘেরা নির্জন জঙ্গলের দিকে যায়।

অপ্রতিমের মরদেহ উদ্ধারের পর ফুটেজে থাকা তুহিনকে হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। পুলিশের দাবি, জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে তুহিন অপ্রতিমের আইফোন ছিনিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যে পরিকল্পনা করে তাকে ওই এলাকায় নিয়ে যাওয়ার কথা স্বীকার করে।

তুহিনের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ফাহাদ ও তার এক বন্ধুর সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া যায়। পরে ফাহাদকে হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে কামরুলকে আটক করা হয়। তুহিনের দেখানো মতে তার বাসায় অভিযান চালিয়ে অপ্রতিমের ব্যবহৃত মোবাইল ফোনও উদ্ধার করা হয় বলে জানিয়েছে পুলিশ।

পুলিশের প্রাথমিক তদন্ত অনুযায়ী, শুক্রবার বিকেল ৫টা থেকে সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে সানন্দা এলাকার নির্জন বনে অপ্রতিমের আইফোন ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়। এতে অপ্রতিম বাধা দিলে ধস্তাধস্তি শুরু হয়। একপর্যায়ে তুহিন, ফাহাদ ও কামরুল বাঁশের লাঠি দিয়ে তাকে আঘাত করে।

অপ্রতিমের মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার পর তুহিন তার আইফোন নিয়ে ফাহাদ ও কামরুলকে সঙ্গে করে ঘটনাস্থল থেকে চলে যায় বলে জানিয়েছে পুলিশ।

গ্রেপ্তার চারজন

অপ্রতিম হত্যা মামলায় চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তারা হলেন সাইফুল ইসলাম তুহিন (১৯), মোজাম্মেল হোসেন ফাহাদ (১৫), মো. কামরুল হাসান (১৬) এবং সন্দেহভাজন হিসেবে সিয়াম (১৯)।

তুহিন সদর দক্ষিণ থানার কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের ২৪ নম্বর ওয়ার্ডের সানন্দা এলাকার বাসিন্দা। ২০২৫ সালে কুমিল্লা সিটি কলেজের একাদশ শ্রেণিতে অকৃতকার্য হওয়ার পর সে পড়াশোনা ছেড়ে দেয় বলে জানিয়েছে পুলিশ।

ফাহাদ একই সিটি করপোরেশনের সালমানপুর এলাকার বাসিন্দা এবং ময়নামতি কারিগরি স্কুল অ্যান্ড কলেজের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী বলে জানিয়েছে পুলিশ। বয়স কম হওয়ায় তাকে ও কামরুলকে গাজীপুরের শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে।

কামরুল হাসান (১৬) কুমিল্লা কোতোয়ালি থানার হাতিগাড়া, কালিবাজার এলাকার বাসিন্দা। আর সিয়াম (১৯) সদর দক্ষিণ উপজেলার এলাহীপুর এলাকার বাসিন্দা এবং কুমিল্লার দৌলতপুর এলাকার আফজাল খান ডিগ্রি কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী।

পুলিশ জানিয়েছে, তুহিনের সঙ্গে থাকা ফাহাদ ও কামরুল ঘটনাস্থলে অপ্রতিমকে আঘাত করে এবং পরে আইফোন নিয়ে তারা সেখান থেকে চলে যায়। মামলার তদন্তে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য বিষয়ও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।