বাংলাদেশের জন্য এবারের জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশন হতে যাচ্ছে কূটনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ও ব্যতিক্রমী। প্রায় চার দশক পর বাংলাদেশের কোনো কূটনীতিক আবারও জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন। ৮১তম অধিবেশনের সভাপতির আসনে রয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান। একই অধিবেশনে সরকারপ্রধান হিসেবে ভাষণ দেবেন প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
ফলে জাতিসংঘের বৈশ্বিক মঞ্চে একই সময়ে বাংলাদেশের সরকারপ্রধান ও সাধারণ পরিষদের সভাপতির উপস্থিতি দেশের জন্য তৈরি করছে বিশেষ এক কূটনৈতিক মুহূর্ত।
কমছে সফরের পরিধি
তবে গুরুত্বপূর্ণ এই সফরের কর্মসূচিতে বড় ধরনের কাটছাঁট করা হয়েছে। জাতিসংঘের অধিবেশন শেষে ক্যালিফোর্নিয়ার সানফ্রান্সিসকো যাওয়ার কথা থাকলেও সেই সফর বাতিল করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, দীর্ঘ সময় দেশের বাইরে না থাকা এবং রাষ্ট্রীয় ব্যয় কমানোর বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে প্রধানমন্ত্রী সফর সংক্ষিপ্ত করার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন।
ফেব্রুয়ারিতে দায়িত্ব গ্রহণের পর ২১ সেপ্টেম্বর দ্বিতীয়বারের মতো বিদেশ সফরে যাচ্ছেন জাতীয়তাবাদী সরকারের প্রধান। সফরসূচি অনুযায়ী, ২৩ সেপ্টেম্বর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের আমন্ত্রণে আয়োজিত নৈশভোজে অংশ নেবেন তিনি। ২৪ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে ভাষণ দেবেন প্রধানমন্ত্রী। পরদিন ২৫ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্র বিএনপির উদ্যোগে আয়োজিত নাগরিক সংবর্ধনায় অংশ নেয়ার কথা রয়েছে তার।
প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী হিসেবে থাকবেন বাংলাদেশের ফার্স্ট লেডি জুবাইদা রহমান।
বাদ পড়ছে সানফ্রান্সিসকোর কর্মসূচি
আগের পরিকল্পনা অনুযায়ী জাতিসংঘের কর্মসূচি শেষে সানফ্রান্সিসকো যাওয়ার কথা ছিল প্রধানমন্ত্রীর। সেখানে প্রবাসী বাংলাদেশিদের কয়েকটি অনুষ্ঠানে অংশ নেয়ার পাশাপাশি প্রযুক্তি খাতের উদ্যোক্তাদের সঙ্গে বৈঠকের পরিকল্পনাও ছিল।
সফর সংক্ষিপ্ত হওয়ায় এসব কর্মসূচি আপাতত বাতিল করা হচ্ছে। ফলে প্রধানমন্ত্রীর যুক্তরাষ্ট্র সফর মূলত নিউইয়র্ককেন্দ্রিক থাকছে। ওয়াশিংটন ডিসিতে কিছু কর্মসূচি থাকলেও সফরের মূল আয়োজন হবে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদকে ঘিরে।
ট্রাম্পের নৈশভোজে বিশ্বনেতারা
২৩ সেপ্টেম্বরের নৈশভোজটিও সফরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে অংশ নিতে যাওয়া রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানদের সম্মানে এ আয়োজন করা হচ্ছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ও ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্প নৈশভোজটির আয়োজক হিসেবে থাকবেন। এতে বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান এবং তাদের জীবনসঙ্গীদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।
এবার ৩০ জনের কম সফরসঙ্গী
প্রধানমন্ত্রীর কর্মসূচির পাশাপাশি সফরসঙ্গীর সংখ্যাও উল্লেখযোগ্যভাবে কমানোর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, এবার প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গীর সংখ্যা ৩০ জনের কম রাখার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। এ লক্ষ্যেই তালিকা প্রস্তুতের কাজ চলছে।
এর আগে জাতিসংঘ সফরে বাংলাদেশি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বড় বহর যাওয়ার নজির রয়েছে। ২০১৪ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে ১৮০ জন সফরসঙ্গী নিউইয়র্কে গিয়েছিলেন। ২০১৯ সালে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ২৯২ জনে।
২০২৪ সালে জাতিসংঘের ৭৯তম অধিবেশনে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের সফরসঙ্গীর সংখ্যা পুস্তিকা অনুযায়ী ছিল ৫৭ জন। তবে সরকারি নথিতে এ সংখ্যা ৮০ জনের বেশি ছিল।
এর তুলনায় এবার সফরসঙ্গীর সংখ্যা অনেক সীমিত রাখার পরিকল্পনা করা হয়েছে। রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় কমানো এবং অপ্রয়োজনীয় সময় ব্যয় এড়ানোর লক্ষ্যেই এ সিদ্ধান্ত বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
নিরাপত্তা ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যক্তিদেরই সফরে রাখার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। তবে সফরসঙ্গীদের তালিকা এখনো চূড়ান্ত হয়নি। কারা যাবেন, কতজন যাবেন এবং কতদিন অবস্থান করবেন, এসব বিষয় চূড়ান্ত হওয়ার পর পূর্ণাঙ্গ তালিকা জানা যাবে।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির জানিয়েছেন, সবকিছু ঠিক থাকলে ২৬ সেপ্টেম্বর দেশে ফিরবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
জাতিসংঘে তুলে ধরবেন সরকারের ভিশন
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভাষণে তার সরকারের ভবিষ্যৎ রূপরেখা গুরুত্ব পাবে বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির।
তিনি জানান, গণতান্ত্রিক উত্তরণের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা নতুন বাংলাদেশের লক্ষ্য ও আকাঙ্ক্ষার কথা বিশ্বনেতাদের সামনে তুলে ধরবেন প্রধানমন্ত্রী। পাশাপাশি বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠা, সংঘাতের টেকসই সমাধান এবং বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরা হবে।
টেকসই উন্নয়ন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা এবং জলবায়ু অর্থায়নে বাংলাদেশের ভূমিকার বিষয়ও প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে গুরুত্ব পাবে।
অর্থনীতি ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাও গুরুত্ব পাবে
প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি ও ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক সম্ভাবনার বিষয়ও থাকবে। স্থানীয় অর্থনীতিতে মানুষের আকাঙ্ক্ষা এবং সরকারের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা বিশ্বনেতাদের সামনে তুলে ধরা হবে।
বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতায় শান্তি, স্থিতিশীলতা ও পারস্পরিক সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তার ওপরও জোর দেবেন প্রধানমন্ত্রী।
রোহিঙ্গা সংকট থাকবে অগ্রাধিকারে
জাতিসংঘের এবারের অধিবেশনে বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার থাকবে রোহিঙ্গা সংকট। মিয়ানমার থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও টেকসই প্রত্যাবাসনে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কার্যকর সহযোগিতা চাইবে বাংলাদেশ।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির জানিয়েছেন, জাতিসংঘ অধিবেশনের সাইডলাইনে রোহিঙ্গা ইস্যুতে একাধিক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকের উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে।
এসব বৈঠকের মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন, সংকটের স্থায়ী সমাধান এবং এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়টি গুরুত্ব পাবে।

