নিজস্ব প্রতিবেদক :
যে মানুষটি জীবনের দীর্ঘ সময় কলম হাতে মানুষের দুঃখ-কষ্ট, অসহায়ত্ব, বঞ্চনা আর অধিকারহীনতার কথা তুলে ধরেছেন, আজ সেই মানুষটিই হাসপাতালের শয্যায় শুয়ে নিজের জীবন ও পা বাঁচানোর লড়াই করছেন। সাতটি জটিল অস্ত্রোপচারের অসহনীয় যন্ত্রণা, বারবার কাটা-ছেঁড়া, ক্ষত, ড্রেসিং, পরীক্ষা-নিরীক্ষা আর দীর্ঘ হাসপাতালবাসনের কষ্ট পেরিয়েও থামেনি তাঁর বাঁচার লড়াই। সামনে আবারও একটি গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রোপচার। কিন্তু দীর্ঘ চিকিৎসার ব্যয়ে পরিবারের সঞ্চয় প্রায় শেষ, সামর্থ্যের শেষ অবলম্বনও নিঃশেষের পথে। এমন কঠিন বাস্তবতায় চিকিৎসা চালিয়ে যেতে মানুষের মানবিক সহায়তার অপেক্ষায় রয়েছেন যশোরের সিনিয়র সাংবাদিক, সাহিত্যিক ও কলামিস্ট জেমস আব্দুর রহিম রানা।
গত ২৭ মে, ঈদুল আজহার আগের দিন সন্ধ্যায় যশোরের কেশবপুর উপজেলার ভেরচি এলাকায় সড়ক দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হন জেমস আব্দুর রহিম রানা। দুর্ঘটনায় তাঁর ডান পায়ের হাড় একাধিক স্থানে ভেঙে যায় এবং পায়ের চামড়া ও নরম টিস্যু মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। দুর্ঘটনার পর তাঁকে দ্রুত খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা শুরু হলেও তাঁর আঘাতের গুরুতরতা এবং উন্নত চিকিৎসার প্রয়োজনীয়তা বিবেচনায় এইদিন রাতেই তাঁকে খুলনা থেকে ঢাকার উদ্দেশে স্থানান্তর করা হয়। ঈদের আগের রাত, চারদিকে যখন উৎসবের প্রস্তুতি আর ঘরে ফেরার ব্যস্ততা, তখন গুরুতর আহত অবস্থায় অ্যাম্বুলেন্সে করে ঢাকার পথে শুরু হয় তাঁর জীবন বাঁচানোর নতুন লড়াই।
দীর্ঘ ও কষ্টকর পথ পেরিয়ে পরদিন ২৮ মে, ঈদের দিন সকালে তাঁকে ঢাকার শ্যামলীতে অবস্থিত জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠান—National Institute of Traumatology and Orthopaedic Rehabilitation (NITOR), যা সাধারণভাবে ‘পঙ্গু হাসপাতাল’ নামে পরিচিত—এ ভর্তি করা হয়। গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ডান পা রক্ষা এবং ভেঙে যাওয়া হাড়ের চিকিৎসার জন্য নিটোরে শুরু হয় তাঁর দীর্ঘ ও জটিল চিকিৎসা। ঈদের দিন যখন মানুষ পরিবার-পরিজনের সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি করছিল, তখন হাসপাতালের শয্যায় শুয়ে জীবন ও পা বাঁচানোর লড়াই শুরু করেন তিনি। সেই থেকে সাড়ে তিন মাসেরও বেশি সময় ধরে হাসপাতালের শয্যাই হয়ে উঠেছে তাঁর জীবনের ঠিকানা।
বর্তমানে তিনি নিটোরের গ্রিন-২ ইউনিটের তৃতীয় তলার ইএফ ওয়ার্ডের ২২ নম্বর শয্যায় অধ্যাপক ডা. মো. মিজানুর রহমানের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। দুর্ঘটনার পর থেকে তাঁর পায়ে ইতোমধ্যে সাতটি জটিল অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হয়েছে। প্রতিটি অস্ত্রোপচারের সঙ্গে ছিল নতুন করে যন্ত্রণা, ক্ষত, ড্রেসিং, পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং সুস্থ হয়ে ওঠার দীর্ঘ অপেক্ষা। একটি অস্ত্রোপচারের কষ্ট সামলে উঠতে না উঠতেই তাঁকে প্রস্তুত হতে হয়েছে পরবর্তী অস্ত্রোপচারের জন্য। শারীরিক যন্ত্রণার পাশাপাশি প্রতিটি পর্যায়ে ছিল চিকিৎসা ব্যয়ের দুশ্চিন্তা। তবুও সুস্থ হয়ে আবার নিজের পায়ে দাঁড়ানোর আশায় তিনি বারবার অস্ত্রোপচার কক্ষে গেছেন।
সাতটি অস্ত্রোপচারের পরও শেষ হয়নি তাঁর চিকিৎসাযুদ্ধ। আগামী ১৯ সেপ্টেম্বর শনিবার সকালে তাঁর পায়ে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রোপচারের পরিকল্পনা রয়েছে। চিকিৎসকদের পরিকল্পনা অনুযায়ী তার ভাঙ্গা পায়ে বিশেষ রিং-ফিক্সেটর বসিয়ে ভাঙা হাড়গুলোকে সঠিক অবস্থানে আনার প্রক্রিয়া শুরু করা হবে। দীর্ঘ চিকিৎসার পর আবার স্বাভাবিকভাবে দাঁড়ানো ও হাঁটার পথে এই অস্ত্রোপচারটি তাঁর জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ বলে জানা গেছে। কিন্তু এই অস্ত্রোপচারের পথেও সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে অর্থের সংকট।
এর আগে গত ১২ সেপ্টেম্বর দীর্ঘ প্রস্তুতির পর তাঁকে অপারেশন থিয়েটারে নেওয়া হয়। অপারেশন টেবিলেও তোলা হয় তাঁকে। সাতটি অস্ত্রোপচারের যন্ত্রণা পেরিয়ে সেদিন তিনি নতুন আশায় অপেক্ষা করছিলেন—আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা ধাপ শেষ করে সুস্থতার পথে এগিয়ে যাবেন। কিন্তু শেষ মুহূর্তে আবারও থেমে যায় চিকিৎসা।
পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়, অস্ত্রোপচারের জন্য প্রয়োজনীয় সার্জিক্যাল রড, প্লেট, স্ক্রু ও অন্যান্য অর্থোপেডিক ইমপ্লান্টের অর্থ পুরোপুরি পরিশোধ করা সম্ভব হয়নি। এর মধ্যেই অপারেশন থিয়েটারের একটি গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রে যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দেয়। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে বিকল্প হিসেবে বাইরে থেকে যন্ত্র ভাড়া করে আনার কথা জানানো হয় এবং এজন্য কয়েক হাজার টাকা অতিরিক্ত জমা দেওয়ার প্রয়োজন হয়। দীর্ঘদিনের চিকিৎসা ব্যয়ে বিপর্যস্ত পরিবারের পক্ষে তাৎক্ষণিকভাবে সেই অর্থের ব্যবস্থাও করা সম্ভব হয়নি। ফলে অপারেশন টেবিলে ওঠার পরও শেষ পর্যন্ত অস্ত্রোপচার সম্পন্ন না করেই তাঁকে ফিরে আসতে হয় হাসপাতালের শয্যায়।
অপারেশন টেবিলে ওঠার পরও অস্ত্রোপচার না হওয়ার সেই মুহূর্তটি তাঁর জন্য ছিল গভীর মানসিক আঘাতের। দীর্ঘ অপেক্ষা, সাতটি অস্ত্রোপচারের যন্ত্রণা এবং সুস্থ হয়ে ওঠার স্বপ্ন নিয়ে তিনি অপারেশন থিয়েটারে গিয়েছিলেন। কিন্তু শেষ মুহূর্তে আবারও অনিশ্চয়তা। শারীরিক যন্ত্রণার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে চিকিৎসা ব্যয়ের চিন্তা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর উদ্বেগ। তবুও তিনি হাল ছাড়েননি।
জেমস আব্দুর রহিম রানা বলেন, “দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর অপারেশন থিয়েটারে গিয়ে অপারেশন টেবিলে ওঠার পরও অস্ত্রোপচার সম্পন্ন না হওয়ায় আমি মানসিকভাবে ভীষণ ভেঙে পড়েছি। শারীরিক যন্ত্রণার পাশাপাশি বারবার অনাকাঙ্ক্ষিত বাধার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। তবুও মহান সৃষ্টিকর্তার ওপর ভরসা রেখে নতুন করে অপেক্ষা শুরু করেছি।”
দুর্ঘটনার পর সাড়ে তিন মাসেরও বেশি সময় ধরে চলা চিকিৎসায় সাতটি অস্ত্রোপচার, ওষুধ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা, ড্রেসিং ও অন্যান্য চিকিৎসা ব্যয় মিলিয়ে ইতোমধ্যে সাড়ে ৫ লাখ টাকারও বেশি খরচ হয়েছে বলে পরিবার জানিয়েছে। চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে পরিবারের সঞ্চয় প্রায় শেষ হয়ে গেছে। বিভিন্ন উৎস থেকে অর্থ সংগ্রহের পাশাপাশি ব্যক্তিগত সম্পদ ও মূল্যবান সামগ্রী বিক্রি করেও চিকিৎসার ব্যয় বহন করতে হয়েছে। এখন সামনে আবারও গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রোপচার। প্রয়োজনীয় রিং-ফিক্সেটর, চিকিৎসা সরঞ্জাম এবং পরবর্তী চিকিৎসার ব্যয় বহন করার মতো আর্থিক সক্ষমতা পরিবারের হাতে প্রায় নেই।
মানুষের দুঃখ-কষ্ট, অসহায়ত্ব ও বঞ্চনার কথা তুলে ধরাই ছিল তাঁর সাংবাদিকতার দীর্ঘ জীবনের অন্যতম অঙ্গীকার। অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়ে জীবনের অসংখ্য প্রতিবেদন লিখেছেন তিনি। কিন্তু আজ সেই মানুষটিই নিজের জীবন ও পা বাঁচানোর জন্য মানুষের কাছে সহযোগিতার আবেদন জানাতে বাধ্য হয়েছেন। তাঁর পরিবারের পক্ষ থেকে সহকর্মী সাংবাদিক, লেখক-সাহিত্যিক, বন্ধু, শুভাকাঙ্ক্ষী, প্রবাসী বাংলাদেশি এবং দেশ-বিদেশের মানবিক মানুষের কাছে তাঁর চিকিৎসার জন্য দোয়া ও সামর্থ্য অনুযায়ী আর্থিক সহযোগিতার আবেদন জানানো হয়েছে।
জেমস আব্দুর রহিম রানা বলেন, “মানুষ মানুষের জন্য—এই বিশ্বাস নিয়েই সবার কাছে দোয়া ও মানবিক সহযোগিতা কামনা করছি। আপনাদের সামান্য সহযোগিতাও হয়তো আমাকে আবার সুস্থ জীবনের পথে ফিরিয়ে আনতে পারে।”
তাঁর চিকিৎসা সহায়তায় কেউ এগিয়ে আসতে চাইলে বিকাশ (Personal) নম্বর 01300832868 এবং নগদ (Personal) নম্বর 01400935540-এ সামর্থ্য অনুযায়ী সহযোগিতা পাঠানো যেতে পারে।
এই মুহূর্তে তাঁর জন্য প্রতিটি সহযোগিতাই গুরুত্বপূর্ণ। কেউ হয়তো বড় অঙ্কের অর্থ দিয়ে পাশে দাঁড়াতে পারবেন, আবার কেউ হয়তো সামর্থ্য অনুযায়ী কয়েকশ বা কয়েক হাজার টাকা দিতে পারবেন। কিন্তু অনেক মানুষের ছোট ছোট সহযোগিতাই একটি বড় চিকিৎসা ব্যয়ের বোঝা বহন করার শক্তি তৈরি করতে পারে। তাই তাঁর পরিবার প্রত্যেকের কাছে অনুরোধ জানিয়েছে, যার যতটুকু সামর্থ্য রয়েছে, সেই সামর্থ্য অনুযায়ী পাশে দাঁড়ানোর পাশাপাশি তাঁর চিকিৎসার এই আবেদনটি অন্যদের কাছেও পৌঁছে দিতে। একটি সহযোগিতা হয়তো পুরো চিকিৎসার ব্যয় মেটাবে না, কিন্তু সেটিই হতে পারে প্রয়োজনীয় একটি ওষুধ, একটি চিকিৎসা সামগ্রী কিংবা পরবর্তী অস্ত্রোপচারের পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা।
সাতটি অস্ত্রোপচারের অসহনীয় যন্ত্রণা পেরিয়েও জেমস আব্দুর রহিম রানা এখনো বাঁচার স্বপ্ন দেখছেন, আবার নিজের পায়ে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখছেন। ১৯ সেপ্টেম্বরের গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রোপচারটি তাঁর সেই স্বপ্ন পূরণের পথে আরেকটি বড় ধাপ। যে মানুষটি সারাজীবন অন্যের কষ্টের কথা লিখেছেন, অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন, আজ তাঁর নিজের কষ্টের দিনে মানুষের সহমর্মিতা ও সহযোগিতাই তাঁর সবচেয়ে বড় ভরসা। তাঁর পরিবার মনে করে, একজনের সামান্য সহযোগিতা হয়তো এই দীর্ঘ সংকট দূর করতে পারবে না, কিন্তু অসংখ্য মানুষের সম্মিলিত মানবিক সহযোগিতা তাঁকে চিকিৎসার পরবর্তী ধাপ পেরিয়ে আবার স্বাভাবিক জীবনে ফেরার সুযোগ করে দিতে পারে। তাই জেমস আব্দুর রহিম রানার সফল অস্ত্রোপচার, দ্রুত সুস্থতা এবং আবার নিজের পায়ে দাঁড়ানোর জন্য সবার কাছে আন্তরিক দোয়া, সহমর্মিতা ও সামর্থ্য অনুযায়ী মানবিক সহযোগিতার আবেদন জানানো হয়েছে।

