বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
প্রিন্ট: সেপ্টেম্বর ১২, ২০২৬, ৭:৪৭ অপরাহ্ণ প্রকাশ: সেপ্টেম্বর ১২, ২০২৬, ৬:১৩ অপরাহ্ণ

কন্যার নামে সম্পত্তি দিয়েও আজীবন ভোগ করতে পারবেন বাবা-মা

কন্যার নামে সম্পত্তি দিয়েও আজীবন ভোগ করতে পারবেন বাবা-মা
প্রতীকী ছবি/ এআই জেনারেটেড

পুত্রসন্তান নেই এমন বাবা-মা জীবিত থাকতেই কন্যার নামে সম্পত্তি দান করে দিতে পারবেন। তবে সম্পত্তি হস্তান্তরের পরও মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ওই সম্পত্তির ভোগদখলের অধিকার নিজেদের কাছে রাখতে পারবেন তারা। এমন বিধান রেখে জাতীয় সংসদে পাস হয়েছে ‘ট্রান্সফার অব প্রপার্টি (অ্যামেন্ডমেন্ট) বিল, ২০২৬’।

গত ৬ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদে বিলটি পাসের মাধ্যমে ‘ট্রান্সফার অব প্রপার্টি অ্যাক্ট, ১৮৮২’-তে নতুন ১২২ক ও ১২২খ ধারা যুক্ত হয়েছে। নতুন বিধানের ফলে বাবা-মা বা দাদা-দাদি সন্তান বা নাতি-নাতনিকে সম্পত্তি দানের সময় নিজেদের জীবনকালীন ভোগাধিকার সংরক্ষণ করতে পারবেন। একই সুযোগ রাখা হয়েছে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যেও সম্পত্তি দানের ক্ষেত্রে।

তবে এই বিধান সাধারণ গিফট, মুসলিম হেবা বা প্রচলিত অন্য বৈধ হস্তান্তর পদ্ধতিকে বাতিল করছে না।

কেন আনা হলো নতুন বিধান

মুসলিম উত্তরাধিকার আইনে পুত্রসন্তান না রেখে কেউ মারা গেলে তার কন্যারা উত্তরাধিকারী হলেও পরিস্থিতি অনুযায়ী অন্য বৈধ ওয়ারিশদেরও সম্পত্তিতে অধিকার তৈরি হতে পারে। ফলে শুধু কন্যাসন্তান থাকা পরিবারে বাবার মৃত্যুর পর তার পুরো সম্পত্তি কন্যার হাতে নাও যেতে পারে।

এই বাস্তবতায় কোনও বাবা-মা যদি জীবদ্দশাতেই তাদের সম্পত্তি কন্যার নামে দিয়ে যেতে চান, নতুন আইন সেই সুযোগ তৈরি করেছে। দলিলে জীবনকালীন ভোগাধিকার সংরক্ষণ করা থাকলে বাবা বা মা জীবিত থাকা পর্যন্ত সম্পত্তি ব্যবহার ও ভোগ করতে পারবেন, যদিও সম্পত্তির হস্তান্তর আইনগতভাবে সম্পন্ন হবে।

তবে এতে কন্যার মিরাসের হিস্যা বাড়ছে না। মিরাস বলতে কোনও ব্যক্তি মারা যাওয়ার পর তার রেখে যাওয়া সম্পত্তিতে মুসলিম উত্তরাধিকার আইন অনুযায়ী স্ত্রী, সন্তান, বাবা-মা ও অন্যান্য বৈধ ওয়ারিশের নির্ধারিত অংশকে বোঝায়। নতুন বিধান শুধু জীবিত অবস্থায় সম্পত্তি হস্তান্তরের একটি পৃথক আইনি পথ তৈরি করেছে।

জরুরি প্রয়োজনে সম্পত্তি বিক্রির সুযোগ

জীবনকালীন ভোগাধিকার সংরক্ষণ করে দান করা সম্পত্তি জরুরি প্রয়োজনেও বিক্রি করার সুযোগ রাখা হয়েছে।

আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, দাতা ও দানগ্রহীতা দুজনের সম্মতিতে সম্পত্তি বিক্রি করা যাবে। তবে একজন সম্মতি না দিলে বিশেষ প্রয়োজনের বিষয়টি প্রমাণ করে জেলা জজ আদালতের অনুমতি নেওয়ার সুযোগ থাকবে।

বিশেষ করে বাবা-মায়ের জীবনধারণ বা চিকিৎসার মতো প্রকৃত প্রয়োজন থাকলে আদালত অনুমতি দিতে পারবেন বলে জানান তিনি।

দান করা সম্পত্তি কি মেয়ে বিক্রি করতে পারবে?

নতুন আইনের ১২২ক ধারায় দান করা সম্পত্তি দানগ্রহীতা বিক্রি করতে পারবেন কি না, সে বিষয়ে সরাসরি নিষেধাজ্ঞা নেই। তবে সম্পত্তির মালিকানা এবং দাতার সংরক্ষিত ভোগাধিকার দুটি পৃথক বিষয়।

অর্থাৎ, বাবা মেয়েকে সম্পত্তি দান করে নিজের জীবনকালীন ভোগাধিকার রেখে দিলে সম্পত্তির স্বত্ব মেয়ের কাছে গেলেও বাবার সংরক্ষিত ভোগাধিকার বহাল থাকবে। ফলে মেয়ে পরবর্তীতে সম্পত্তি বিক্রি বা হস্তান্তর করতে চাইলে বাবার ওই অধিকারও বিবেচনায় থাকবে।

দানগ্রহীতা দাতার জীবদ্দশায় মারা গেলেও আইন অনুযায়ী সম্পত্তি তার উত্তরাধিকারীদের কাছে যাবে। তবে দাতার সংরক্ষিত জীবনকালীন ভোগাধিকার তখনও বহাল থাকবে।

ইচ্ছা পরিবর্তন করলেই দান বাতিল নয়

নতুন আইনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ১২২ক ধারায় নিবন্ধিত দান সাধারণভাবে অপরিবর্তনীয় থাকবে। অর্থাৎ, বাবা-মা পরে শুধু মত পরিবর্তন করলেই দান করা সম্পত্তি ফিরিয়ে নেওয়া যাবে না।

তবে ১২২খ ধারায় কিছু বিশেষ পরিস্থিতিতে পরিবর্তন বা বাতিলের সুযোগ রাখা হয়েছে। আর্থিক, চিকিৎসা, শিক্ষা, পারিবারিক বা অন্য কোনও প্রকৃত প্রয়োজন দেখা দিলে দাতা ও দানগ্রহীতার পারস্পরিক সম্মতিতে নিবন্ধিত দলিলের মাধ্যমে দান পরিবর্তন বা বাতিল করা যাবে। নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে আদালতের অনুমোদনের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।

আইনমন্ত্রী যা বললেন

আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেন, নতুন বিধানের মাধ্যমে ইসলামী হেবা, গিফট বা অন্য বৈধ সম্পত্তি হস্তান্তর পদ্ধতিতে কোনও পরিবর্তন আনা হয়নি। বরং বাবা-মাকে সুরক্ষা দেওয়ার জন্য এটি সম্পত্তি হস্তান্তরের একটি বিকল্প ব্যবস্থা।

তার ভাষ্য, সন্তানরা যাতে বাবা-মাকে সম্পত্তি লিখে নেওয়ার পর জীবনের শেষ সময়ে তাদের অসহায় অবস্থায় ফেলে দিতে না পারে, সে জন্যই জীবনকালীন ভোগাধিকারের বিষয়টি রাখা হয়েছে।

বিরোধী দলের আপত্তি

তবে বিলটি নিয়ে সংসদে বিরোধিতা করেছে বিরোধী দল ও জোটের সদস্যরা।

বিরোধী দলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেন, এই আইন কোরআন-সুন্নাহবিরোধী এবং এতে ইসলামী মিরাস ব্যবস্থাকে পাশ কাটানোর সুযোগ তৈরি হবে। তার দাবি, আজীবন ভোগদখলের অধিকার রেখে সম্পত্তি দানের বিধান ইসলামী আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

তিনি আরও বলেন, বাবা-মায়ের অধিকার রক্ষায় ২০১৩ সালের আইন রয়েছে। তাই উত্তরাধিকার ও হেবার বিধানকে পাশ কাটিয়ে নতুন ব্যবস্থা তৈরি করা উচিত নয়।

বিলটি জনমত যাচাইয়ের জন্য পাঠানোর দাবিতে বিরোধী দল প্রতিবাদ জানিয়ে সংসদ অধিবেশন থেকে ওয়াকআউটও করে।

শেরপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য মো. রাশেদুল ইসলাম রাশেদও বিলটির কয়েকটি বিষয় নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তার মতে, হেবা সম্পূর্ণ হওয়ার জন্য শুধু রেজিস্ট্রেশন যথেষ্ট কি না, বাস্তব দখল ও নিয়ন্ত্রণ হস্তান্তর প্রয়োজন কি না এবং দাতা যদি আজীবন ভোগদখলে থাকেন, তাহলে সেটিকে হেবা বলা হবে নাকি মৃত্যুর পর সম্পত্তি বণ্টনের একটি ব্যবস্থা হিসেবে বিবেচনা করা হবে, তা স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।

সরকারি দলের ব্যাখ্যা

বিরোধিতার জবাবে জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি বলেন, শরিয়াহ আইনের দোহাই দিয়ে এই বিলের বিরোধিতা করা হচ্ছে। তার প্রশ্ন, তাহলে প্রচলিত অন্যান্য আইনও কি শরিয়াহ অনুযায়ী করতে হবে?

তিনি বলেন, বাবা-মায়ের কাছ থেকে সম্পত্তি নেওয়ার পর সন্তানরা যেন তাদের বৃদ্ধ বয়সে অসহায় অবস্থায় ফেলে না দেয়, সেই সুরক্ষা নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।

রুমিন ফারহানার প্রস্তাব

ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা বিলটির উদ্দেশ্যের প্রতি সমর্থন জানিয়ে আইনমন্ত্রীকে ধন্যবাদ দেন। তবে তিনি আরও কিছু সুরক্ষা যুক্ত করার প্রস্তাব দেন।

তার মতে, সন্তান বাবা-মাকে অবহেলা বা নির্যাতন করলে দান বাতিলের সুযোগ থাকা উচিত। এ ক্ষেত্রে পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইন, ২০১৩-এর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দাতাকে পারিবারিক আদালতে নিবন্ধিত দলিল বাতিলের আবেদন করার সুযোগ দেওয়ার কথা বলেন তিনি।

এ ছাড়া দাতার লিখিত সম্মতি ছাড়া দান করা সম্পত্তি বন্ধক রেখে ঋণ নেওয়া বা তৃতীয় পক্ষের কাছে হস্তান্তর নিষিদ্ধ করা এবং দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন তিনি।

কন্যাসন্তানের বাবা-মায়ের প্রতিক্রিয়া

নতুন আইনকে স্বাগত জানিয়েছেন একমাত্র কন্যাসন্তানের বাবা বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার প্রধান বার্তা সম্পাদক মুরসালিন নোমানী। তার মতে, আইনটি একদিকে কন্যাসন্তানকে সম্পত্তির নিরাপত্তা দেবে, অন্যদিকে বাবা-মায়ের জীবনকালীন ভোগদখলের অধিকারও নিশ্চিত করবে।

তিন কন্যার বাবা জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক সাজ্জাদ হোসেনও আইনটিকে গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন। তার মতে, আগে কন্যাদের সম্পত্তি লিখে দিলে বাবা-মায়ের বৃদ্ধ বয়সের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ থাকত। নতুন আইনে সেই ঝুঁকি অনেকটা কমবে।

তিনি বলেন, কন্যাসন্তানদের পিতা-মাতা ও কন্যাদের নিরাপত্তার জন্য আইনটি গুরুত্বপূর্ণ হলেও নারীদের অধিকার আরও শক্তিশালী করতে ভবিষ্যতে প্রয়োজন অনুযায়ী সংশোধন করা যেতে পারে।

১৯৬১ সালের আইনের সঙ্গে সম্পর্ক

সম্পত্তির উত্তরাধিকার নিয়ে ১৯৬১ সালের মুসলিম ফ্যামিলি লজ অর্ডিন্যান্সেও গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনা হয়েছিল। ওই আইনের আগে বাবা-মায়ের আগে কোনও ছেলে বা মেয়ে মারা গেলে তার সন্তানরা সাধারণভাবে দাদা-দাদির সম্পত্তিতে তাদের বাবা বা মায়ের জায়গায় উত্তরাধিকারী হতে পারতেন না।

১৯৬১ সালের আইনের ৪ ধারায় এই অবস্থার পরিবর্তন করা হয়। কোনও ছেলে বা মেয়ে বাবা-মায়ের আগে মারা গেলে, ওই মৃত সন্তানের ছেলে-মেয়েরা তাদের বাবা বা মা জীবিত থাকলে যে অংশ পেতেন, সেই সমপরিমাণ অংশ পাওয়ার অধিকার পান।

সরকারি দলের মতে, নতুন আইনও সম্পত্তি ও পারিবারিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে বিদ্যমান সমস্যার একটি সমাধান তৈরি করছে। আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান দাবি করেছেন, নতুন বিধান মুসলিম আইন বা শরিয়াহকে ক্ষতিগ্রস্ত না করে সম্পত্তি হস্তান্তরের একটি আধুনিক আইনি পথ তৈরি করেছে।

মূল কথা

নতুন আইনের সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হলো, পুত্রসন্তানহীন বাবা-মা জীবিত থাকতেই কন্যাকে সম্পত্তি দান করতে পারবেন এবং একই সঙ্গে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ওই সম্পত্তির ভোগাধিকার নিজেদের কাছে রাখতে পারবেন। তবে নিবন্ধিত দান শুধু ইচ্ছা পরিবর্তনের কারণে বাতিল করা যাবে না; প্রকৃত প্রয়োজন দেখা দিলে পারস্পরিক সম্মতি বা নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে আদালতের অনুমোদনের মাধ্যমে পরিবর্তন বা বাতিলের সুযোগ থাকবে।