অভিমান, পারিবারিক কলহ, পড়ালেখার চাপ, শাস্তির ভয় কিংবা বন্ধুদের সঙ্গে পালিয়ে যাওয়া। নানা কারণে প্রতিবছর নিখোঁজ হচ্ছে অসংখ্য শিশু। আবার তাদের একটি বড় অংশ অল্প সময়ের মধ্যেই পরিবারের কাছে ফিরে আসে। তবে নিখোঁজ হওয়া সব শিশুর ভাগ্য এক নয়। কেউ ফিরে গেলেও অনেকের সন্ধান আর মেলে না। এতে শিশু পাচার, অপহরণ ও ঝুঁকিপূর্ণ শ্রমে জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কাও তৈরি হচ্ছে।
চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে দেশে ১৫ হাজার ৭১৭ শিশুর নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) হয়েছে বলে পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ১৩ হাজার ৬৭৯ শিশুকে উদ্ধার করা হয়েছে বা তারা পরিবারের কাছে ফিরে গেছে। এখনো সন্ধান পাওয়া যায়নি ২ হাজার ৩৮ শিশুর।
ট্রেনে উঠে ময়মনসিংহে সাত বছরের শিশু
সম্প্রতি ঢাকার কমলাপুর এলাকা থেকে সাত বছরের অনিক (ছদ্মনাম) বাবা-মায়ের সঙ্গে অভিমান করে বাড়ি থেকে বেরিয়ে ট্রেনে উঠে পড়ে। পরে ময়মনসিংহ রেলস্টেশনে নামলে আশপাশের যাত্রীরা বুঝতে পারেন, শিশুটি একা।
তাদের একজন বিষয়টি জানিয়ে ফোন করেন শিশু সহায়তা হেল্পলাইন ১০৯৮-এ। হেল্পলাইন থেকে শিশুটিকে রেলওয়ে পুলিশের কাছে দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। পরে রেলওয়ে পুলিশের তত্ত্বাবধানে শিশুটিকে ঢাকায় আনা হয়।
এদিকে কমলাপুর রেলস্টেশনে স্থানীয় সমাজকর্মীরা শিশুটির পরিবারের নিখোঁজ সংক্রান্ত মাইকিং শুনতে পান। পরে প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই ও ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে শিশুটিকে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। এরই মধ্যে শিশুটির পরিবার থানায় একটি জিডিও করেছিল।
অনিকের মতো অনেক শিশু নিখোঁজ হওয়ার পর অল্প সময়ের মধ্যেই পরিবারের কাছে ফিরে আসে। ফলে নিখোঁজের পরিসংখ্যান দেখার ক্ষেত্রে শুধু কতজন নিখোঁজ হয়েছে, তা নয়, কতজন উদ্ধার হয়েছে এবং কতজন এখনো নিখোঁজ, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
১০ থেকে ১৭ বছর বয়সিদের নিখোঁজের হার বেশি
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত শূন্য থেকে ৯ বছর বয়সি শিশু নিখোঁজের ঘটনায় ৪৭৪টি জিডি হয়েছে। এর মধ্যে ৪০৬ শিশুকে উদ্ধার করা হয়েছে, এখনো সন্ধান পাওয়া যায়নি ৬৮ জনের।
অন্যদিকে ১০ থেকে ১৭ বছর বয়সি শিশু নিখোঁজের ঘটনায় জিডি হয়েছে ১৫ হাজার ২৪৩টি। তাদের মধ্যে ১৩ হাজার ২৭৩ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে বা তারা পরিবারের কাছে ফিরে এসেছে। এখনো সন্ধান মেলেনি ১ হাজার ৯৭০ জনের।
অভিমান থেকে পালিয়ে যায় অনেক শিশু
ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার শামীমা পারভীন বলেন, নিখোঁজ শিশুদের একটি বড় অংশের বয়স ১৪ থেকে ১৭ বছর। তাদের অনেকে বন্ধুদের সঙ্গে পালিয়ে যায়। শিশু নিখোঁজের বিষয়টি পুলিশ অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখে এবং দ্রুত তাদের খুঁজে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, অভিমান, পড়ালেখার চাপ, অনৈতিক কাজে জড়িয়ে পড়ার পর লজ্জা, স্বাধীনভাবে জীবনযাপনের আকাঙ্ক্ষা, পরিবারের কাছ থেকে অর্থ বা অন্য সুবিধা পাওয়ার চেষ্টা এবং পারিবারিক কলহ ও অশান্তি শিশুদের বাড়ি থেকে পালিয়ে যাওয়ার অন্যতম কারণ।
মেয়েশিশুদের ক্ষেত্রে পাচারের ঝুঁকি
শিশু সহায়তা হেল্পলাইন ১০৯৮-এর ব্যবস্থাপক চৌধুরী মো. মোহাইমেন বলেন, মাদ্রাসাসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও পরিবারে শাস্তি, বাবা-মায়ের দ্বিতীয় বিয়ে, পারিবারিক ঝগড়া এবং অভাবের কারণে অনেক শিশু নিখোঁজ হয়।
মেয়েশিশুদের ক্ষেত্রে পাচার, গৃহশ্রমিক হিসেবে নির্যাতন, অপহরণ এবং প্রেমিকের সঙ্গে পালিয়ে যাওয়ার ঘটনাও রয়েছে। তাঁর তথ্য অনুযায়ী, বছরে পাঁচ হাজারের বেশি নিখোঁজের ঘটনায় হেল্পলাইনে কল আসে।
অপহরণ ও ঝুঁকিপূর্ণ কাজে জড়ানোর আশঙ্কা
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান মো. রেজাউল করিম সোহাগ বলেন, অনেক শিশু অপহরণের শিকার হয়। এক শ্রেণির মানুষ এসব শিশুকে দিয়ে ভিক্ষা ও বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করায়। পরবর্তী সময়ে তাদের কেউ কেউ নানা ধরনের অপরাধেও জড়িয়ে পড়ে।
মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের হেল্পলাইন ১০৯-এর ইনচার্জ রাইসুল ইসলাম জানান, ঢাকা শহরে অপহরণসংক্রান্ত ফোন বেশি আসে। এ ধরনের ঘটনায় স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহায়তা নেওয়া হয়।
জরুরি সহায়তা হেল্পলাইন ৯৯৯ থেকেও জানা যায়, লঞ্চঘাট ও রেললাইন থেকে শিশু হারিয়ে যাওয়ার বিষয়ে বেশি ফোন আসে। বিভিন্ন মাদ্রাসায় শারীরিক নির্যাতনের আশঙ্কা ও ভয় থেকেও কিছু শিশু পালিয়ে যাচ্ছে। একই সঙ্গে শিশু পাচারের ঝুঁকিও রয়েছে।
ইউনিসেফের ২০২৫ সালের ‘স্টপিং দ্য ট্রাফিকিং’ প্রতিবেদনে বাংলাদেশে নারী ও শিশু পাচারের ঝুঁকি হিসেবে জোরপূর্বক শ্রম, যৌন শোষণ, শিশুবিয়ে ও অনিরাপদ অভিবাসনের মতো বিষয় তুলে ধরা হয়েছে।
বাড়ছে নিখোঁজের জিডি
পুলিশ সদর দপ্তরের হিসাবে, ২০২৩ সালে নিখোঁজ ব্যক্তিদের বিষয়ে ১৭ হাজার ৮০৮টি জিডি হয়েছিল। ২০২৪ সালে তা কমে ১৬ হাজার ৪১৪টি হলেও ২০২৫ সালে বেড়ে দাঁড়ায় ২২ হাজার ৫৫০টিতে।
পুলিশ জানিয়েছে, অনলাইন জিডি চালু হওয়ায় নিখোঁজ সংক্রান্ত অভিযোগ করার সুযোগ সহজ হয়েছে। ফলে জিডির সংখ্যাও বেড়েছে। তাই নিখোঁজের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে শুধু নিখোঁজের সংখ্যা নয়, উদ্ধার হওয়া এবং এখনো নিখোঁজ থাকা ব্যক্তির সংখ্যাও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
কোথায় যায় নিখোঁজ শিশুরা?
নিখোঁজ হওয়া সব শিশুর গন্তব্য এক নয়। কেউ স্বেচ্ছায় বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায়, কেউ অপহরণ বা পাচারের শিকার হয়, আবার কেউ বিভিন্ন পরিস্থিতিতে পথশিশুতে পরিণত হয়।
রাজধানীর কমলাপুরে মেয়েদের সরকারি পথশিশু পুনর্বাসন কেন্দ্রে বর্তমানে ৮০ জন শিশু রয়েছে। তাদের মধ্যে ২০ জন কন্যাশিশু। কেন্দ্রের ইনচার্জ ও শিশু পুনর্বাসন ব্যবস্থাপক কামরুন নাহার রত্না জানান, সেখানে ৭ থেকে ১৮ বছর বয়সি মেয়েশিশু রয়েছে। তাদের মূল লক্ষ্য পরিবারে পুনর্বাসন করা হলেও অনেকের ক্ষেত্রে পরিবারের কাছে ফিরে যাওয়ার সুযোগ সীমিত।
মানবাধিকার আইনজীবী অ্যাডভোকেট সালমা আলী বলেন, শিশু পাচারের ক্ষেত্রে বর্তমানে সাইবার অপরাধও বড় ঝুঁকি হয়ে উঠেছে। শিশুরা ঘরে বসেই বিভিন্নভাবে ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে। ভারতসহ বিভিন্ন দেশ থেকে কন্যাশিশুদের উদ্ধার করে দেশে ফিরিয়ে আনা হলেও অনেকেই পরে পরিবারের কাছে ফিরতে পারে না।
তিনি শিশু পাচার রোধে ইন্টারপোলের সহযোগিতা নেওয়ার পাশাপাশি এ বিষয়ে দক্ষ পুলিশ, সাংবাদিক ও সরকারি আইনজীবীর সংখ্যা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন। একই সঙ্গে গণমাধ্যমে সচেতনতা বাড়ানো এবং পাঠ্যসূচিতে শিশুদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করার প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন।
সব মিলিয়ে, শিশু নিখোঁজের প্রতিটি ঘটনা শুধু একটি পরিবারের সংকট নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে নিরাপত্তা, পারিবারিক পরিবেশ, শিক্ষা, পাচার ও শিশুর অধিকার রক্ষার মতো বড় সামাজিক প্রশ্ন।

