বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
প্রিন্ট: সেপ্টেম্বর ৯, ২০২৬, ১:৩৯ অপরাহ্ণ প্রকাশ: সেপ্টেম্বর ৯, ২০২৬, ১২:১৭ অপরাহ্ণ

অপরাধের ঊর্ধ্বমুখী গ্রাফ, নিরাপত্তাহীনতায় সাধারণ মানুষ

অপরাধের ঊর্ধ্বমুখী গ্রাফ, নিরাপত্তাহীনতায় সাধারণ মানুষ

দেশে সাম্প্রতিক সময়ে চুরি, ছিনতাই, কিশোর গ্যাংয়ের সহিংসতা, সাইবার অপরাধ ও পারিবারিক সহিংসতার ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। পাড়া-মহল্লা থেকে শুরু করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, সর্বত্রই যেন বাড়ছে নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতি। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিয়মিত অভিযান ও বিশেষ তৎপরতার পরও অপরাধের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা ঠেকানো যাচ্ছে না।

বিশেষজ্ঞদের মতে, অর্থনৈতিক সংকট, কর্মসংস্থানের অভাব, মাদকের বিস্তার, বিচারহীনতার সংস্কৃতি, পারিবারিক বন্ধন দুর্বল হওয়া, প্রযুক্তির অপব্যবহার এবং সামাজিক বৈষম্য অপরাধ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। তাদের ভাষ্য, শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান দিয়ে পরিস্থিতির স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়; এর জন্য প্রয়োজন সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সমন্বিত উদ্যোগ।

পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্যেও অপরাধ বৃদ্ধির চিত্র উঠে এসেছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ছয় মাসে সারা দেশে ১ হাজার ৭৭৮টি হত্যাকাণ্ডের মামলা হয়েছে। ২০২৫ সালের একই সময়ে এ সংখ্যা ছিল ১ হাজার ৫৮৫টি। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে হত্যাকাণ্ডের মামলা বেড়েছে ১২ দশমিক ২ শতাংশ। এ সময়ে সবচেয়ে বেশি ৪১১টি হত্যাকাণ্ডের মামলা হয়েছে ঢাকা বিভাগে।

নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনাতেও দেখা গেছে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে সারা দেশে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনায় ২ হাজার ১১টি মামলা হয়েছে। মার্চ মাসে এ সংখ্যা ছিল ১ হাজার ৪৮৫টি। এক মাসের ব্যবধানে মামলা বেড়েছে ৩৫ দশমিক ৪ শতাংশ।

অপরাধ গবেষকদের মতে, বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতা অপরাধ বৃদ্ধির অন্যতম বড় কারণ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হকের মতে, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থানের সংকট নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করেছে। চাকরির অভাব ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কর্মী ছাঁটাইয়ের কারণে অনেক তরুণ হতাশ হয়ে পড়ছেন। কেউ কেউ দ্রুত অর্থ উপার্জনের আশায় চুরি, ছিনতাই, ডাকাতি ও জালিয়াতির মতো অপরাধে জড়িয়ে পড়ছেন।

মাদকের বিস্তারও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সাবেক অধ্যাপক ডা. তাজুল ইসলামের মতে, আইস, ইয়াবাসহ বিভিন্ন মাদক সহজলভ্য হয়ে পড়ায় তরুণদের একটি অংশ আসক্ত হয়ে পড়ছে। মাদকের অর্থ জোগাড় করতে গিয়ে তারা চুরি, ছিনতাই, পারিবারিক সহিংসতা এমনকি হত্যার মতো গুরুতর অপরাধেও জড়িয়ে পড়ছে।

একই সঙ্গে বিভিন্ন এলাকায় আধিপত্য বিস্তার, সিনিয়র-জুনিয়র দ্বন্দ্ব এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজেদের প্রভাব দেখানোর প্রবণতা থেকে কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার ঘটছে। বিশেষজ্ঞদের অভিযোগ, কিছু রাজনৈতিক ও স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তির আশ্রয়-প্রশ্রয়ও এসব গোষ্ঠীর কর্মকাণ্ডকে উৎসাহিত করছে।

অপরাধ বৃদ্ধির পেছনে বিচার ব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রতাকেও গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে দেখছেন আইনজীবীরা। জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট সালমা আলীর মতে, অপরাধের দ্রুত বিচার না হওয়া এবং আইনের দুর্বল প্রয়োগ অপরাধীদের মধ্যে এক ধরনের দায়মুক্তির মানসিকতা তৈরি করছে। বছরের পর বছর মামলা চলার সুযোগে অনেক আসামি জামিনে বের হয়ে পুনরায় অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। সাক্ষীদের ভয়ভীতি দেখানো এবং প্রভাবশালী মহলের আশ্রয়ও বিচার প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করছে।

পারিবারিক ও সামাজিক মূল্যবোধের পরিবর্তনও অপরাধ বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে বলে মনে করছেন মনোবিজ্ঞানীরা। অভিভাবকদের সঙ্গে সন্তানের দূরত্ব, পারিবারিক তদারকির ঘাটতি এবং ইন্টারনেটের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার তরুণদের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। অনলাইন জুয়া, সহিংস গেম, পর্নোগ্রাফি, সাইবার বুলিং ও অপরাধমূলক কনটেন্টের সহজলভ্যতা তরুণদের আচরণে পরিবর্তন আনছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত জনপ্রিয় হওয়ার প্রবণতাও অনেককে ঝুঁকিপূর্ণ কর্মকাণ্ডে উৎসাহিত করছে।

বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, সমাজে অর্থনৈতিক ও সামাজিক বৈষম্য বাড়ার কারণেও মানুষের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা তৈরি হচ্ছে। একদিকে একটি শ্রেণির মানুষের বিলাসী জীবনযাপন, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণে সংগ্রাম তরুণদের একটি অংশের মধ্যে বঞ্চনার অনুভূতি সৃষ্টি করছে। পাশাপাশি অবৈধ ক্ষমতার প্রদর্শন ও পেশিশক্তির দাপট আইনের প্রতি মানুষের আস্থা দুর্বল করছে।

অপরাধের সামগ্রিক চিত্রও উদ্বেগজনক। ২০২৫ সালের বার্ষিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশে চুরি ১২ শতাংশ, ছিনতাই ৩৭ শতাংশ এবং অপহরণের ঘটনা ৭১ শতাংশ বেড়েছিল। ২০২৬ সালেও এসব অপরাধের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি।

আন্তর্জাতিক জরিপ সংস্থা নামবিওর ২০২৬ সালের ক্রাইম ইনডেক্সেও বাংলাদেশের অবস্থান উদ্বেগজনক। দক্ষিণ এশিয়ায় আফগানিস্তানের পর বাংলাদেশ দ্বিতীয় সর্বোচ্চ অপরাধ সূচকে রয়েছে। বাংলাদেশের স্কোর ৬১ দশমিক ৬।

অপরাধবিজ্ঞানীদের মতে, পরিস্থিতি মোকাবিলায় শুধু পুলিশি অভিযান বাড়ালেই হবে না। অপরাধের মূল কারণগুলো চিহ্নিত করে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, মাদক নিয়ন্ত্রণ, কিশোরদের জন্য সুস্থ বিনোদনের সুযোগ বাড়ানো, পারিবারিক ও সামাজিক বন্ধন শক্তিশালী করা, সাইবার অপরাধ নিয়ন্ত্রণ এবং বিচারপ্রক্রিয়া দ্রুত করার উদ্যোগ নিতে হবে।

তাদের মতে, সুষ্ঠু তদন্ত, দ্রুত বিচার, সাক্ষী ও ভুক্তভোগীদের নিরাপত্তা এবং আইনের সমান প্রয়োগ নিশ্চিত করা গেলে অপরাধীদের মধ্যে দায়মুক্তির প্রবণতা কমবে। একই সঙ্গে সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্য কমিয়ে তরুণদের ইতিবাচক কর্মকাণ্ডে যুক্ত করা না গেলে কেবল আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর নির্ভর করে অপরাধের ঊর্ধ্বমুখী গ্রাফ থামানো কঠিন হবে।