যৌন নির্যাতনের শিকার হয়ে চিকিৎসা ও সহায়তা নিতে আসা ভুক্তভোগীদের মধ্যে শিশুদের সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, এসব শিশুর বড় একটি অংশের বয়স ৩ থেকে ৬ বছরের মধ্যে। অনেক ক্ষেত্রে নিকটাত্মীয়, প্রতিবেশী কিংবা পরিচিত ব্যক্তিরাই তাদের নির্যাতনের শিকার করছে।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টার (ওসিসি) থেকে শুরু করে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন তথ্যেও শিশুদের ওপর যৌন সহিংসতার উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে।
মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত দেশে যৌন সহিংসতার শিকার হয়েছেন মোট ৪৩১ জন। তাদের মধ্যে ২৬৪ জনই শিশু। অর্থাৎ মোট ভুক্তভোগীর প্রায় ৬১ শতাংশ শিশু। ২০২৫ সালের একই সময়ে যৌন হয়রানির শিকার নারী ছিলেন ১৩০ জন এবং শিশু ২৬৯ জন।
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বলছে, সাম্প্রতিক সময়ে যৌন নির্যাতনের শিকারদের মধ্যে শিশুদের হার ৫০ শতাংশের বেশি। তাদের মধ্যে ৩ থেকে ৬ বছর বয়সিদের সংখ্যাই বেশি। অনেক শিশুই আবার পরিবারের ঘনিষ্ঠ বা পরিচিতজনের মাধ্যমে নির্যাতনের শিকার হচ্ছে।
ডিএমসির ওসিসিতেও শিশু ভুক্তভোগী বেশি
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওসিসির ইনচার্জ ডা. তাইয়েবা সুলতানা জানান, গত সাত মাসে প্রায় ৩২৫ জন ভুক্তভোগীকে সেবা দেওয়া হয়েছে। এর বাইরে বহির্বিভাগে চিকিৎসা নিয়েছেন প্রায় ৪৫০ জন। তাদের অনেকের হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার প্রয়োজন থাকলেও পরিবারের পক্ষ থেকে ভর্তি করানো হয়নি।
মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মাল্টিসেক্টরাল প্রোগ্রামের আওতায় পরিচালিত ওসিসিতে বর্তমানে পাঁচজন ভুক্তভোগী সেবা নিচ্ছেন। তাদের মধ্যে তিনজনের বয়স ১৪ বছরের নিচে। দুজনের বয়স মাত্র পাঁচ বছর।
গত ৩ সেপ্টেম্বর ১৪ বছর বয়সী এক মানসিক প্রতিবন্ধী শিশুকে নিয়ে ওসিসিতে আসেন তার বাবা। তাঁর অভিযোগ, প্রভাবশালী এক প্রতিবেশীর ১৮ বছর বয়সী ছেলে তাঁর মেয়েকে ধর্ষণ করে গুরুতর আহত করেছে। একপর্যায়ে শিশুটি অচেতন হয়ে পড়লে তাকে মৃত ভেবে ইট দিয়ে মাথায় আঘাত করা হয়। পরে জ্ঞান ফিরলে অভিযুক্তের পরিবারের সদস্যরা শিশুটিকে বাড়ির বাইরে ফেলে যায় বলে অভিযোগ করেন বাবা। চিকিৎসার পাশাপাশি মেয়ের জন্য ন্যায়বিচার চান তিনি।
অন্য একটি ঘটনায়, পাঁচ বছর বয়সী এক শিশুকে কনসার্ট দেখানোর কথা বলে নিয়ে গিয়ে তার মামা ধর্ষণ করেছেন বলে অভিযোগ করেছেন শিশুটির মা। এ ঘটনায় এখনো মামলা হয়নি। ডিএনএ পরীক্ষার প্রতিবেদনের অপেক্ষায় রয়েছেন তিনি।
আরেক শিশুর বাবা-মা আলাদা সংসারে থাকেন। মা গৃহকর্মীর কাজ করেন। শিশুটির যথাযথ দেখাশোনার সুযোগে প্রতিবেশীর এক ছেলে তাকে ধর্ষণ করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
কাউন্সেলিংয়ের পাশাপাশি প্রয়োজন নিরাপদ পরিবেশ
ডা. তাইয়েবা সুলতানা বলেন, শিশু যৌন নির্যাতনের ঘটনায় শুধু চিকিৎসা নয়, শিশুটির পাশাপাশি তার বাবা-মাকেও মনোসামাজিক কাউন্সেলিং দেওয়া জরুরি। ওসিসিতে এ ধরনের কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা রয়েছে।
তবে জনবল সংকটে এই সেবা ব্যাহত হচ্ছে। প্রকল্পের মেয়াদ বৃদ্ধি না হওয়ায় চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সংশ্লিষ্ট কর্মীদের বেতন-ভাতা বন্ধ রয়েছে। ফলে নার্স, আইনজীবী, মনোবিজ্ঞানী, ক্লিনার ও কম্পিউটার অপারেটরদের অনেকে নিয়মিত কর্মস্থলে আসছেন না। কেউ কেউ অন্যত্র চাকরিও নিয়েছেন।
ওসিসিতে সেবা নিয়েছেন ৮১ হাজারের বেশি
নারী ও শিশু নির্যাতনের শিকারদের দ্রুত চিকিৎসা, আইনি সহায়তা ও কাউন্সেলিংসহ সমন্বিত সেবা দিতে দেশে ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টার চালু করা হয়।
তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত এসব ক্রাইসিস সেন্টার ও সেলের মাধ্যমে ৮১ হাজার ৯২৮ জনকে সেবা দেওয়া হয়েছে। তাদের মধ্যে ৪৯ হাজার ৭৬৭ জন শারীরিক নির্যাতনের শিকার, ৩১ হাজার ৫৯৬ জন যৌন নির্যাতনের শিকার এবং ৫৬৫ জন অগ্নিদগ্ধ হয়ে সেবা নিয়েছেন।
সরকার দেশের সব সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ওসিসি চালুর উদ্যোগ নিয়েছে বলে জানিয়েছেন মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রী ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন।
কিউআরটি চালু হলেও বেতন অনিশ্চিত
নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে ২০২৬ সালের ১৭ জানুয়ারি কুইক রেসপন্স টিম (কিউআরটি) চালুর ঘোষণা দেওয়া হয়। হটলাইন ১০৯-এ ফোন পেলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার কথা রয়েছে এসব টিমের।
তবে সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানান, তাদের কিউআরটিতে কাজ করার জন্য চিঠি দেওয়া হলেও প্রায় আট মাস ধরে তারা বেতন পাচ্ছেন না। নতুন প্রকল্পে চাকরির ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা জানানো হয়েছে।
মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের নতুন প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক মোহাম্মদ ইফতেখার হোসেন বলেন, আগের প্রকল্পের কার্যক্রম শেষ হয়েছে। সেখানে এখন কেউ বেতন-ভাতা পান না। নতুন প্রকল্প চালু হয়েছে এবং নতুন জনবল দিয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে।
প্রকল্পনির্ভরতা নিয়ে প্রশ্ন
নারী কমিশনের প্রধান শিরীন পারভীন হক বলেন, বাংলাদেশ সরকার ও ডেনমার্ক সরকারের ডানিডার যৌথ উদ্যোগে প্রকল্পটি শুরু হয়েছিল। কার্যক্রমটি পরবর্তী সময়ে রাজস্ব খাতে নেওয়ার সুযোগ তৈরিতে মন্ত্রণালয়কে দীর্ঘ সময় দেওয়া হলেও তা কার্যকর হয়নি।
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ডা. ফওজিয়া মোসলেম বলেন, নির্যাতনের শিকার নারী ও শিশুদের চিকিৎসা, আইনি সহায়তা ও কাউন্সেলিংসহ প্রয়োজনীয় সেবা এক জায়গায় দেওয়ার ক্ষেত্রে ওসিসি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু প্রকল্পনির্ভরতার কারণে জনবল ও অর্থায়নে সংকট তৈরি হলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন ভুক্তভোগীরাই।
তিনি বলেন, বিপুলসংখ্যক শিশু নির্যাতনের পর হারিয়ে যাচ্ছে বা পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে। তারা কোথায় যাচ্ছে, সেটিও নজরদারির আওতায় আনা জরুরি। একই সঙ্গে ওসিসির কার্যক্রম অব্যাহত রাখা এবং শিশুদের জন্য বিশেষায়িত সেবা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

