দেশে একের পর এক একই পরিবারের একাধিক সদস্য হত্যার ঘটনা উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। গত ছয় মাসে দেশের বিভিন্ন স্থানে এমন অন্তত ১৯টি ঘটনায় ৫০ জনের মৃত্যু হয়েছে। ঘটনাগুলোর পেছনে কারণ ভিন্ন হলেও পারিবারিক বিরোধ, মাদক, অর্থনৈতিক সংকট, সম্পদ নিয়ে দ্বন্দ্ব, প্রতিশোধ এবং বিচারহীনতার মতো বিষয়গুলোর মিল পাওয়া যাচ্ছে বলে মনে করছেন অপরাধ বিশ্লেষকেরা।
সর্বশেষ ঢাকার সাভারের আশুলিয়ায় একটি ভবনের তালাবদ্ধ কক্ষ থেকে স্বামী, স্ত্রী ও তাদের নবজাতকের মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। প্রাথমিকভাবে ঘটনাটি হত্যাকাণ্ড বলে ধারণা করছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। নিহতরা হলেন দিনাজপুরের নবাবগঞ্জ থানার বড় মাগুরা পাকপাড়ার নাজমা আক্তার (৩৩) এবং তার স্বামী পলাশবাড়ী এলাকার আলমগীর হোসেন (৪২)। তাদের নবজাতক সন্তানও মারা গেছে।
এর কয়েকদিন আগে রংপুরের মাছুয়াপাড়ায় অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী, ছেলে ও মেয়েকে নিজ বাড়িতে হত্যা করা হয়। তবে এমন ঘটনা শুধু সাম্প্রতিক দুটি ঘটনাতেই সীমাবদ্ধ নয়। গত ছয় মাসে দেশের বিভিন্ন স্থানে একই পরিবারের একাধিক সদস্য হত্যার অন্তত ১৯টি ঘটনা সামনে এসেছে।
বেড়েছে সার্বিক হত্যাকাণ্ডও
একই পরিবারের একাধিক সদস্য হত্যার পাশাপাশি দেশে সামগ্রিক হত্যাকাণ্ডও গত বছরের তুলনায় বেড়েছে। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত সাত মাসে সারা দেশে ২ হাজার ৭৬টি হত্যা মামলা হয়েছে। ২০২৫ সালের একই সময়ে এ সংখ্যা ছিল ১ হাজার ৯৪৭টি।
অর্থাৎ, চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে গত বছরের একই সময়ের তুলনায় হত্যা মামলা বেড়েছে ১২৯টি। সাধারণত হত্যাকাণ্ডের ঘটনা নিশ্চিত হওয়ার পরই পুলিশ হত্যা মামলা গ্রহণ করে।
সামাজিক ও কাঠামোগত দুর্বলতার প্রভাব
অপরাধ নিয়ে গবেষণাকারী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বলেন, প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের কারণ আলাদা হলেও এর পেছনে সামাজিক ও কাঠামোগত দুর্বলতা রয়েছে।
তার মতে, পারিবারিক বিরোধ, সম্পদ, প্রভাব ও প্রতিশোধের প্রবণতার পাশাপাশি অপরাধের দ্রুত তদন্ত ও বিচার না হওয়াও সহিংসতা বাড়ার অন্যতম কারণ। পরিবার, প্রতিবেশী ও সমাজের প্রতিটি স্তরে মানুষের নিরাপত্তাবোধ নিশ্চিত করার মতো পরিবেশ তৈরি করা জরুরি।
বাংলাদেশ মানবাধিকার ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট এলিনা খান বলেন, নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দক্ষতা ও আন্তরিকতা এবং আইনের শাসন নিশ্চিত করা গেলে অপরাধ কমানো সম্ভব।
তিনি বলেন, অপরাধ করলে দ্রুত ধরা পড়তে হবে এবং বিচারের মাধ্যমে শাস্তি নিশ্চিত হবে, এমন বিশ্বাস মানুষের মধ্যে তৈরি করা জরুরি। রাষ্ট্র নাগরিকদের মধ্যে নিরাপত্তা ও আস্থার পরিবেশ তৈরি করতে পারলে অপরাধের প্রবণতা কমবে।
মাদক ও পারিবারিক বিরোধেও হত্যাকাণ্ড
গত ২৫ জুন লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে মা ও তিন মেয়েকে কুপিয়ে হত্যার ঘটনা ঘটে। নিহতরা হলেন শাহিনুর বেগম (৪০) এবং তার তিন মেয়ে সাইমা আক্তার (২১), ইকরা (১৭) ও সিপা (১০)। প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাত দিয়ে জানা যায়, দুপুরে দা হাতে এক যুবক তাদের বাড়িতে ঢুকে হামলা চালান। ঘটনাস্থলে দুজন এবং হাসপাতালে নেওয়ার পর আরও দুজন মারা যান।
হামলার পর পালানোর সময় স্থানীয়রা অন্তর মজুমদার নামে ওই যুবককে আটক করে মারধর করলে তার মৃত্যু হয়। কেন তিনি এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছিলেন, তা স্পষ্ট হয়নি। তবে স্থানীয়দের দাবি, তিনি মাদকাসক্ত ছিলেন। পুলিশের ধারণা, মাদকের টাকা জোগাড় করতে গিয়ে এই হত্যাকাণ্ড ঘটে থাকতে পারে।
চট্টগ্রামের আনোয়ারায় গত ২৫ জুলাই স্বপন দাশ গুপ্ত (৬৫) ও তার স্ত্রী কল্পনা দাশ গুপ্ত (৫৫) খুন হন। এ ঘটনায় তাদের একমাত্র ছেলে রিমন দাশ গুপ্তকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। পুলিশ ও স্থানীয়দের ভাষ্য, রিমন দীর্ঘদিন ধরে বেকার ও মাদকাসক্ত ছিলেন। চাকরি নিয়ে বাবা-মায়ের সঙ্গে তর্কের একপর্যায়ে তাদের কুপিয়ে হত্যা করেন তিনি। এ ঘটনায় মাদকাসক্তি ও বেকারত্বের মতো সামাজিক সমস্যাগুলো সামনে এসেছে।
সিলেট নগরের রায়নগর মিতালী আবাসিক এলাকায় গত ১২ আগস্ট নিজ বাসায় ব্যবসায়ী আবদুস সাত্তার (৯০), তার স্ত্রী সুরাইয়া বেগম (৭৬) এবং গৃহপরিচারিকা তাহমিনা (২০) খুন হন। ঘটনার দিন বিকেলেই পুলিশ বাবুল মিয়া (৪০) নামে একজনকে গ্রেপ্তার করে।
এ ছাড়া নওগাঁর আত্রাইয়ে স্বামীর বিরুদ্ধে স্ত্রী ও সন্তান হত্যার অভিযোগ, দিনাজপুরে ছেলেদের বিরুদ্ধে বাবা ও সৎভাই হত্যার অভিযোগ, মানিকগঞ্জে দেবরের বিরুদ্ধে ভাবি ও ভাতিজা হত্যার অভিযোগ, রাজধানীর কলাবাগানে স্বামীর হাতে স্ত্রী ও শাশুড়ি হত্যার অভিযোগ এবং সুনামগঞ্জে বাবার বিরুদ্ধে দুই শিশুসন্তান হত্যার অভিযোগ উঠেছে। গাজীপুরের কাপাসিয়ায় পাঁচজন নিহত হওয়ার একটি ঘটনায় নিহত এক নারীর স্বামীকে প্রধান আসামি করা হয়েছে।
বিচারহীনতা নিয়েও উদ্বেগ
অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, অপরাধের যথাযথ বিচার না হলে মানুষের মধ্যে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা তৈরি হতে পারে। এতে অপরাধীরা আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠার সুযোগ পায়।
হত্যা মামলায় সাজার হার কম হওয়ার কারণ নিয়ে পিবিআইয়ের এক গবেষণায় ২৩৮টি মামলার তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়। গত বছরের মে মাসে প্রকাশিত ওই গবেষণায় দেখা যায়, ৫২ শতাংশ মামলায় সব আসামি খালাস পেয়েছেন।
অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, হত্যাকাণ্ড কমাতে শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা নয়, পারিবারিক ও সামাজিক সমস্যা চিহ্নিত করা, মাদক নিয়ন্ত্রণ, দ্রুত তদন্ত এবং কার্যকর বিচার নিশ্চিত করাও জরুরি।

