বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
প্রিন্ট: সেপ্টেম্বর ২, ২০২৬, ১০:৫৩ অপরাহ্ণ প্রকাশ: সেপ্টেম্বর ২, ২০২৬, ৮:১৯ অপরাহ্ণ

চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনে নিয়োগ ও পদোন্নতিতে অনিয়মের অভিযোগ মিজানের বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি

চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনে নিয়োগ ও পদোন্নতিতে অনিয়মের অভিযোগ মিজানের বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি

চট্টগ্রাম প্রতিনিধি:

চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনে (চসিক) এক কর্মকর্তা মিজানের নিয়োগ, দায়িত্ব পরিবর্তন, পদোন্নতি ও অতিরিক্ত দায়িত্ব পাওয়ার ধারাবাহিকতা নিয়ে নানা প্রশ্ন ও অভিযোগ উঠেছে। তার বিরুদ্ধে নিয়োগবিধি, জ্যেষ্ঠতা ও শিক্ষাগত যোগ্যতা উপেক্ষা করে বিভিন্ন সময়ে পদ ও দায়িত্ব পাওয়ার অভিযোগের পাশাপাশি রাজনৈতিক প্রভাব এবং আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে সুবিধা নেওয়ার অভিযোগও উঠেছে। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা যাচাই হয়নি।

অভিযোগকারীদের দাবি, ২০১২ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে মিজান সম্পূর্ণ অস্থায়ী ভিত্তিতে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের স্বাস্থ্য বিভাগে টেলিফোন অপারেটর হিসেবে (৪র্থ শ্রেণি) নিয়োগ পান। পরবর্তীতে অসদাচরণের অভিযোগে তাকে স্বাস্থ্য বিভাগ থেকে সরিয়ে পরিচ্ছন্ন বিভাগে অস্থায়ী শ্রমিক হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

এরপর ০৭ নম্বর ওয়ার্ডের তৎকালীন কাউন্সিলর মোবারক আলীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার সূত্র ধরে আর্থিক লেনদেন ও রাজনৈতিক প্রভাবের মাধ্যমে মিজান পরিচ্ছন্ন সুপারভাইজার হিসেবে অস্থায়ী দায়িত্ব পান—এমন অভিযোগও রয়েছে। অভিযোগটির সত্যতা যাচাইয়ে সংশ্লিষ্ট নিয়োগ ও দায়িত্ব প্রদানের নথি পরীক্ষা করার দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারীরা।

অভিযোগ রয়েছে, পরবর্তীতে তৎকালীন মেয়র রেজাউল করিমের সময়ে প্রাণিবিদ্যায় প্রয়োজনীয় শিক্ষাগত যোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও জ্যেষ্ঠ ৩৮ জনকে উপেক্ষা করে মিজানকে মশক নিধন কর্মকর্তার অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়। ওই দায়িত্ব পালন নিয়েও পরবর্তীতে বিভিন্ন অভিযোগ ও সমালোচনা ওঠে। একপর্যায়ে তাকে পুনরায় অস্থায়ী সুপারভাইজার পদে ফিরিয়ে দেওয়া হয় বলে দাবি করা হয়েছে।

অভিযোগকারীদের আরও দাবি, ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর মিজান বিভিন্ন মহলে নিজেকে বঞ্চিত ব্যক্তি হিসেবে উপস্থাপন করেন এবং জামায়াতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার কথা বলে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করেন। একই সময়ে চট্টগ্রাম কলেজে নিজেকে শিবির নেতা হিসেবে পরিচয় দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। এসব দাবিরও নিরপেক্ষ যাচাই প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন উঠেছে তার সাম্প্রতিক পদোন্নতি নিয়ে। অভিযোগ রয়েছে, জামায়াতের মহানগর আমির শাহজাহান চৌধুরীর সহায়তায় ১৬ গ্রেডের অস্থায়ী সুপারভাইজার পদ থেকে নিয়মিত প্রক্রিয়া ও জ্যেষ্ঠতার বিষয়গুলো যথাযথভাবে অনুসরণ না করেই ১০ম গ্রেডের পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তা পদে যাওয়ার সুযোগ পান তিনি। এ ক্ষেত্রে জ্যেষ্ঠ ইন্সপেক্টর ও তত্ত্বাবধায়কদের উপেক্ষা করা হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন সময়ে সংবাদমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল বলেও দাবি করা হচ্ছে।

এখন ওই পদে যোগদানের মাত্র সাত মাসের মধ্যে মিজান ৬ষ্ঠ গ্রেডের উপ-প্রধান পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তা হওয়ার চেষ্টা করছেন—এমন অভিযোগও সামনে এসেছে। এতে প্রশ্ন উঠেছে, প্রচলিত চাকরিবিধি, পদোন্নতির নিয়ম, শিক্ষাগত যোগ্যতা ও জ্যেষ্ঠতার শর্ত পূরণ করে এত দ্রুত উচ্চতর পদে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে কি না।

এদিকে মিজানের রাজনৈতিক পরিচয় নিয়েও নানা অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে তিনি ০৭ নম্বর ওয়ার্ডের তৎকালীন যুবলীগপন্থী কাউন্সিলর মোবারক আলীর সঙ্গে রাজনৈতিকভাবে সম্পৃক্ত ছিলেন। পরবর্তীতে রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তনের পর জামায়াত এবং পরে বিএনপির সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার পরিচয় দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে। বিভিন্ন সময়ে প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিদের নাম ব্যবহার করে প্রশাসনিক সুবিধা নেওয়ার অভিযোগও করা হয়েছে।

তবে এসব রাজনৈতিক পরিচয় ও অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বক্তব্য জানা এবং স্বাধীনভাবে যাচাই করা জরুরি বলে মনে করছেন সচেতন মহল।

অভিযোগকারীরা বলছেন, কোনো ব্যক্তির রাজনৈতিক পরিচয় বা কোনো রাজনৈতিক নেতার সঙ্গে সম্পর্ক থাকলেই নিয়োগ, পদোন্নতি কিংবা প্রশাসনিক সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে প্রচলিত আইন ও বিধিবিধান উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন জনগণের অর্থে পরিচালিত একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান হওয়ায় সেখানে নিয়োগ ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, যোগ্যতা ও জ্যেষ্ঠতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি

মিজানের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর বিষয়ে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়রের কাছে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারীরা। তাদের দাবিগুলো হলো—

১. ২০১২ সাল থেকে বর্তমান পর্যন্ত মিজানের নিয়োগ, দায়িত্ব পরিবর্তন, পদায়ন ও পদোন্নতির সম্পূর্ণ নথি যাচাই করা।

২. প্রতিটি পদে তার শিক্ষাগত যোগ্যতা, জ্যেষ্ঠতা এবং সংশ্লিষ্ট নিয়োগবিধি যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছে কি না, তা তদন্ত করা।

৩. মশক নিধন কর্মকর্তার অতিরিক্ত দায়িত্ব প্রদানের প্রক্রিয়া এবং পরবর্তীতে ১০ম গ্রেডের পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তা পদে যাওয়ার প্রক্রিয়া যাচাই করা।

৪. মাত্র সাত মাসের মধ্যে ৬ষ্ঠ গ্রেডের উপ-প্রধান পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তা হওয়ার ক্ষেত্রে প্রচলিত বিধিবিধান ও যোগ্যতার শর্ত পূরণ হচ্ছে কি না, তা পরিষ্কার করা।

৫. অর্থ লেনদেন, রাজনৈতিক প্রভাব ও অনিয়মের যেসব অভিযোগ উঠেছে, সেগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা।

৬. তদন্তে কোনো অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট বিধি অনুযায়ী প্রশাসনিক ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া।

অভিযোগকারীরা আরও বলেন, তাদের উদ্দেশ্য কোনো ব্যক্তির রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন তোলা নয়; বরং চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনে নিয়োগ ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে আইন, বিধি, যোগ্যতা ও জ্যেষ্ঠতা নিশ্চিত করা।

তাদের মতে, চসিক কোনো ব্যক্তি বা রাজনৈতিক গোষ্ঠীর প্রভাব বিস্তারের স্থান নয়। এটি জনগণের প্রতিষ্ঠান। তাই কোনো কর্মকর্তা যদি রাজনৈতিক প্রভাব, আর্থিক লেনদেন কিংবা অনিয়মের মাধ্যমে সুবিধা নেওয়ার অভিযোগে অভিযুক্ত হন, তাহলে তার বিরুদ্ধে পক্ষপাতহীন তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।

মিজানের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোর সত্যতা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করে প্রকৃত তথ্য জনসমক্ষে প্রকাশ এবং অভিযোগ প্রমাণিত হলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারীরা।

চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনে দলীয় পরিচয় নয়—যোগ্যতা, জ্যেষ্ঠতা ও বিধিবিধানই পদায়ন ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে শেষ কথা হবে—এমন প্রত্যাশা তাদের।