বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
প্রিন্ট: আগস্ট ৩০, ২০২৬, ২:০৪ অপরাহ্ণ প্রকাশ: আগস্ট ৩০, ২০২৬, ১১:৩২ পূর্বাহ্ণ

নিজের গুমের বর্ণনা দিতে গিয়ে কাঁদলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

নিজের গুমের বর্ণনা দিতে গিয়ে কাঁদলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

২০১৫ সালে গুমের শিকার হওয়ার পর দীর্ঘ ৬১ দিনের বন্দিদশা এবং পরবর্তী সময়ে ভারতের মেঘালয়ে ৯ বছরের নির্বাসিত জীবনের অবর্ণনীয় ও লোমহর্ষক অভিজ্ঞতার স্মৃতিচারণা করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। গতকাল শনিবার (২৯ আগস্ট) রাজধানীর শাহবাগে জাতীয় জাদুঘর মিলনায়তনে ‘মায়ের ডাক’ আয়োজিত এক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি নিজের জীবনের এই চরম সংকটের কথা তুলে ধরেন। আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষে ‘নিখোঁজ ব্যক্তিদের ফিরিয়ে আনতে বা তাদের সন্ধান পেতে চাই আইন, ন্যায়বিচার, জবাবদিহিতা এবং মানবাধিকার’ শীর্ষক এই সভার আয়োজন করা হয়।
বক্তব্যের একপর্যায়ে ভারতের মানসিক হাসপাতালে কাটানো দুঃসহ দিনগুলোর কথা স্মরণ করে সালাহউদ্দিন আহমদ আবেগাপ্লুত হয়ে বলেন, ‘আমি বিদেশের মাটিতে পাগল অবস্থায় মারা যাব, আমার পরিবার হয়তো আমার কবরও দেখতে পারবে না—এমন ভয়ও পেয়েছিলাম।’
বাংলাদেশে গুম থাকার দিনগুলোর বিবরণ দিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, উত্তরার একটি বাসা থেকে অপহৃত হওয়ার পর তাকে আট বাই চার ফুটের একটি অন্ধকার ও সংকীর্ণ কক্ষে টানা ৬১ দিন আটকে রাখা হয়েছিল। ওই ঘরে কেবল একটি পানির কল এবং শৌচকার্যের জন্য একটি নর্দমার সঙ্গে যুক্ত সরু ছিদ্র ছিল, যা থেকে অনবরত দুর্গন্ধ আসত। মেঝেতে বিছানো একটি কম্বল ও বালিশই ছিল তার শোবার একমাত্র সম্বল। তীব্র গরমের মধ্যে দরজার ওপরের সামান্য ফাঁকা অংশ দিয়ে আসা বাতাসই ছিল তার বেঁচে থাকার ভরসা, কারণ দরজার বাইরে একটি বৈদ্যুতিক পাখা সার্বক্ষণিক সচল রাখা হতো। হৃদরোগে আক্রান্ত হলেও বন্দিদশায় তিনি কোনো চিকিৎসা পাননি। একপর্যায়ে অসুস্থ হয়ে পড়লে অপহরণকারীরা তার চোখ বেঁধে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য অন্য জায়গায় নিয়ে যায়।
ভারতে নিয়ে যাওয়ার সময়কার বিবরণ দিয়ে সালাহউদ্দিন আহমদ জানান, চোখ বাঁধা অবস্থায় প্রথমে একটি মাইক্রোবাসে এবং পরে গভীর রাতে একটি জিপ গাড়িতে করে তাকে অচেনা কোনো স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়। দীর্ঘ যাত্রার পর এক স্থানে হাত-চোখ বাঁধা অবস্থাতেই তাকে চামচ দিয়ে নুডলস খাওয়ানো হয়। বন্দি অবস্থায় বাইরের জগৎ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন থাকায় মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে দণ্ডিত যুদ্ধাপরাধী কামরুজ্জামানের ফাঁসি কার্যকর হওয়ার খবরও তিনি জানতেন না, যা শুনে জিজ্ঞাসাবাদকারী কর্মকর্তাও অবাক হয়েছিলেন। অবশেষে ভোরবেলা একটি নির্জন পাহাড়ি এলাকায় তাকে নামিয়ে দিয়ে অপহরণকারীরা নিজেদের মুখ ঢেকে দ্রুত স্থান ত্যাগ করে।
অপহরণকারীরা চলে যাওয়ার পর বিলবোর্ড দেখে তিনি বুঝতে পারেন স্থানটি ভারতের মেঘালয় রাজ্যের শিলং। স্থানীয়দের সহায়তায় পুলিশ তাকে উদ্ধার করে প্রথমে বেসামরিক হাসপাতাল এবং পরে মানসিক ভারসাম্যহীন সন্দেহে একটি মানসিক হাসপাতালে পাঠায়। সেখানে মানসিক রোগীদের সঙ্গে রেখে তাকে জোরপূর্বক মানসিক রোগের ওষুধ খাওয়ানো হতো এবং তার চোখের চশমাও কেড়ে নেওয়া হয়েছিল। দাড়ি-চুল কেটে দেওয়ায় নিজের পরিচয় হারানোর শঙ্কায় মুষড়ে পড়েছিলেন তিনি। চরম হতাশার একপর্যায়ে একদিন হাসপাতাল থেকে তার স্ত্রীর ফোন আসে। ফোনে স্ত্রীর কান্নার আওয়াজ শুনে তিনি নিশ্চিত হন যে তার পরিবার তার বেঁচে থাকার খবর পেয়েছে। পরবর্তী সময়ে সিভিল হাসপাতালে স্থানান্তরের সময় সাংবাদিকদের টেলিভিশন ক্যামেরার সামনে তিনি চিৎকার করে নিজের পরিচয় দিয়ে বলেছিলেন, ‘ইয়েস, আই অ্যাম সালাহউদ্দিন’।
এরপর ভারতে অবৈধ অনুপ্রবেশের দায়ে সালাহউদ্দিন আহমদের বিরুদ্ধে ফরেনার্স অ্যাক্ট অনুযায়ী মামলা দায়ের করে সে দেশের পুলিশ। দীর্ঘ আইনি লড়াই শেষে ২০১৮ সালের ২৬ অক্টোবর শিলংয়ের নিম্ন আদালত এবং ২০২৩ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি আপিল আদালত তাকে খালাস দেন। ভারতে অবস্থানকালেই বিএনপির ষষ্ঠ কাউন্সিলে তাকে দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরামের (স্থায়ী কমিটি) সদস্য করা হয়। অবশেষে ২০২৪ সালের আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের পর দীর্ঘ ৯ বছরের নির্বাসন ঘুচিয়ে তিনি দেশে ফিরতে সক্ষম হন। নিজের বক্তৃতায় জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের বীরদের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান হওয়ায় ভারত থেকে আমি দেশে ফিরতে পেরেছি। যারা জুলাই যুদ্ধ করেছেন, তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা।’
সাবেক এই আমলা ১৯৯১ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার একান্ত সচিব (এপিএস) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরে চাকরি ছেড়ে রাজনীতিতে যোগ দিয়ে ২০০১ সালে কক্সবাজার থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং যোগাযোগ প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পান। ২০১৪ সালের একতরফা নির্বাচন বর্জনের পর বিএনপির মুখপাত্র হিসেবে দলের আন্দোলন পরিচালনা করার সময় ২০১৫ সালের ১০ মার্চ রাজধানীর উত্তরা থেকে সাদা পোশাকের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে তাকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়, যা নিয়ে তৎকালীন বিরোধী দল বিএনপি তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছিল।