বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
প্রিন্ট: আগস্ট ১, ২০২৬, ৬:৫৮ অপরাহ্ণ প্রকাশ: আগস্ট ১, ২০২৬, ৫:২৮ অপরাহ্ণ

মানুষের জীবন কি কয়েক কেজি পণ্যের চেয়েও সস্তা? টিসিবির লাইনে মৃত্যু: আর কত প্রাণ গেলে বদলাবে ব্যবস্থা?

মানুষের জীবন কি কয়েক কেজি পণ্যের চেয়েও সস্তা?  টিসিবির লাইনে মৃত্যু: আর কত প্রাণ গেলে বদলাবে ব্যবস্থা?

জেমস আব্দুর রহিম রানা :
বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর যখন যুদ্ধবিধ্বস্ত অর্থনীতি পুনর্গঠনের কঠিন চ্যালেঞ্জ সামনে এসে দাঁড়ায়, তখন সাধারণ মানুষের জন্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ নিশ্চিত করতে ১৯৭২ সালে রাষ্ট্রপতির আদেশ নং-৬৮ এর মাধ্যমে ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি) প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। প্রতিষ্ঠার মূল লক্ষ্য ছিল বাজারে নিত্যপণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা, মূল্য নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করা এবং দরিদ্র ও নিম্নআয়ের মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। স্বাধীনতার পর দুর্ভিক্ষ, খাদ্য সংকট ও বাজার অস্থিরতার সময়ে টিসিবি ছিল রাষ্ট্রের অন্যতম ভরসার নাম।
কিন্তু স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় পরে দাঁড়িয়ে আমাদের বিবেককে একটি কঠিন প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হচ্ছে—যে প্রতিষ্ঠান মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, সেই প্রতিষ্ঠানের পণ্য কিনতে গিয়ে যদি মানুষ প্রাণ হারায়, তাহলে আমরা কি সত্যিই একটি কল্যাণরাষ্ট্র গড়ে তুলতে পেরেছি?
রাজধানীর মিরপুরে টিসিবির পণ্য সংগ্রহের লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের ওপর দেয়াল ধসে প্রাণহানির ঘটনা কেবল একটি দুর্ঘটনা নয়। এটি রাষ্ট্রীয় সেবা ব্যবস্থার গভীর অসুস্থতার লক্ষণ। এটি আমাদের প্রশাসনিক ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি। এটি সেই বাস্তবতার নির্মম স্মারক, যেখানে একজন মানুষকে কয়েক কেজি চাল, ডাল বা তেলের জন্য নিজের জীবন ঝুঁকির মুখে ফেলতে হয়।
যে দেশে মহাসড়ক হচ্ছে, মেট্রোরেল চলছে, পদ্মা সেতু দাঁড়িয়ে গেছে, ডিজিটাল সেবার বিস্তার ঘটেছে, সেই দেশে এখনও মানুষকে ভোররাত থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়। কখনও রোদে, কখনও বৃষ্টিতে, কখনও অসহনীয় গরমে। কেউ অসুস্থ হয়ে পড়ে, কেউ জ্ঞান হারায়, কেউ পদদলিত হয়, আবার কেউ প্রাণ হারায়।
প্রশ্ন হলো—এটি কি শুধু দারিদ্র্যের ছবি? না, এটি রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতার ছবি।
বাস্তবতা হচ্ছে, বাংলাদেশের দরিদ্র মানুষের সবচেয়ে বড় সমস্যা শুধু অর্থের অভাব নয়; তাদের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো সম্মানের অভাব। তারা সেবা পেতে গিয়ে অপমানিত হয়, অধিকার পেতে গিয়ে অপেক্ষা করে, প্রাপ্য সুবিধা পেতে গিয়ে প্রমাণ দিতে হয় যে তারা দরিদ্র। আর টিসিবির লাইন সেই অপমানের সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রতীকগুলোর একটি।
রাষ্ট্রের দায়িত্ব কেবল ভর্তুকি দেওয়া নয়। রাষ্ট্রের দায়িত্ব নাগরিকের মর্যাদা রক্ষা করা। রাষ্ট্রের দায়িত্ব নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। রাষ্ট্রের দায়িত্ব এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে একজন নাগরিক সাহায্য নিতে গিয়ে নিজেকে অসহায় মনে করবেন না।
আজকের বাংলাদেশে কোটি কোটি মানুষের তথ্য জাতীয় পরিচয়পত্রের মাধ্যমে ডিজিটাল ডাটাবেজে সংরক্ষিত। মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে মুহূর্তে টাকা লেনদেন হচ্ছে। পাসপোর্ট, কর, ভূমি উন্নয়ন কর, বিদ্যুৎ বিল—সবকিছু ক্রমশ ডিজিটাল হচ্ছে। অথচ টিসিবির মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ সেবায় এখনও বহু ক্ষেত্রে মানুষের উপস্থিতিকে লাইনের মাধ্যমে প্রমাণ করতে হয়।
এ যেন প্রযুক্তির যুগে দাঁড়িয়ে কেরোসিনের বাতি জ্বালিয়ে আধুনিকতার গল্প বলার মতো।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশ এই সমস্যার সমাধান অনেক আগেই করেছে। ভারত তাদের পাবলিক ডিস্ট্রিবিউশন সিস্টেমে আধারভিত্তিক পরিচয় যাচাই চালু করেছে। মিশর স্মার্ট কার্ড ব্যবহার করছে। ইন্দোনেশিয়া ই-ভাউচার ব্যবস্থা চালু করেছে। বিভিন্ন দেশে ডিজিটাল কিউ ম্যানেজমেন্ট ব্যবস্থার মাধ্যমে মানুষ নির্দিষ্ট সময় অনুযায়ী সেবা গ্রহণ করছে। ফলে ভিড় কমছে, অনিয়ম কমছে, সময় বাঁচছে এবং সবচেয়ে বড় কথা—মানুষের মর্যাদা রক্ষা হচ্ছে।
বাংলাদেশেও ফ্যামিলি কার্ড এবং ডিজিটাল সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। জাতীয় পর্যায়ে একটি সমন্বিত পরিবারভিত্তিক তথ্যভান্ডার গড়ে তোলার পরিকল্পনাও রয়েছে। এই উদ্যোগের মাধ্যমে ভবিষ্যতে ভর্তুকিপ্রাপ্ত খাদ্যপণ্য, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি এবং নগদ সহায়তা একই প্ল্যাটফর্মে আনার চিন্তাভাবনা করা হচ্ছে।
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে—এই উদ্যোগ বাস্তবে কত দ্রুত কার্যকর হবে?
যখন একজন শ্রমিক আজ লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন, তখন ২০৩০ সালের পরিকল্পনা দিয়ে তার ক্ষুধা মেটানো যাবে না। যখন একজন বিধবা নারী ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করছেন, তখন ভবিষ্যতের ডিজিটাল স্বপ্ন দিয়ে তার কষ্ট কমানো যাবে না। যখন একজন বৃদ্ধ মানুষ লাইনে দাঁড়িয়ে অসুস্থ হয়ে পড়ছেন, তখন উন্নয়নের পরিসংখ্যান তার কোনো কাজে আসে না।
সরকারকে বুঝতে হবে, টিসিবির লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলো কোনো সংখ্যা নয়। তারা কোনো পরিসংখ্যান নয়। তারা বাংলাদেশের নাগরিক।
তাদের জীবনও পদ্মা সেতুর মতো মূল্যবান।
তাদের নিরাপত্তাও একটি এক্সপ্রেসওয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ।
তাদের মর্যাদাও একটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের মতোই সম্মানের দাবিদার।
আজ টিসিবির সবচেয়ে বড় সংকট পণ্যের অভাব নয়; সবচেয়ে বড় সংকট ব্যবস্থাপনার অভাব।
একদিকে দেখা যায় চাহিদার তুলনায় বিক্রয়কেন্দ্র কম। অন্যদিকে সুবিধাভোগী তালিকা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। কোথাও পর্যাপ্ত তদারকি নেই। কোথাও নিরাপত্তা নেই। কোথাও অবকাঠামোগত ঝুঁকি রয়েছে। কোথাও আবার প্রকৃত দরিদ্র মানুষ বাদ পড়ে যায়।
এর ফল হচ্ছে দীর্ঘ লাইন, বিশৃঙ্খলা এবং জনভোগান্তি।
মিরপুরের দেয়ালধসের ঘটনা রাষ্ট্রকে একটি নির্মম বার্তা দিয়েছে—এখনও সময় আছে, ব্যবস্থা নিন। নইলে আগামী দিনে আরও বড় বিপর্যয় অপেক্ষা করছে।
এখন প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা।
এখন প্রয়োজন প্রশাসনিক সাহস।
এখন প্রয়োজন প্রযুক্তিনির্ভর সংস্কার।
টিসিবি সংস্কারে সরকারের সামনে অন্তত ১৫টি জরুরি করণীয় রয়েছে।
প্রথমত, জাতীয় পরিচয়পত্রভিত্তিক স্মার্ট ফ্যামিলি কার্ড চালু করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, শতভাগ ডিজিটাল নিবন্ধন ও ডাটাবেজ গড়ে তুলতে হবে।
তৃতীয়ত, এসএমএসভিত্তিক সময় নির্ধারণ ব্যবস্থা চালু করতে হবে।
চতুর্থত, ভার্চুয়াল কিউ বা ডিজিটাল সিরিয়াল ব্যবস্থা চালু করতে হবে।
পঞ্চমত, বায়োমেট্রিক যাচাই নিশ্চিত করতে হবে।
ষষ্ঠত, ওয়ার্ডভিত্তিক ও ইউনিয়নভিত্তিক বিক্রয়কেন্দ্র বাড়াতে হবে।
সপ্তমত, নারী, প্রবীণ ও প্রতিবন্ধীদের জন্য আলাদা সেবা ডেস্ক চালু করতে হবে।
অষ্টমত, প্রতিটি বিক্রয়কেন্দ্রে নিরাপত্তা ও জরুরি চিকিৎসা সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে।
নবমত, বিক্রয়কেন্দ্রের অবকাঠামোগত নিরাপত্তা যাচাই বাধ্যতামূলক করতে হবে।
দশমত, উপকারভোগী তালিকা নিয়মিত হালনাগাদ করতে হবে।
একাদশত, স্থানীয় পর্যায়ে নাগরিক তদারকি কমিটি গঠন করতে হবে।
দ্বাদশত, টিসিবির পণ্য মজুত ও বিতরণের তথ্য উন্মুক্ত করতে হবে।
ত্রয়োদশত, অনিয়মের বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা নীতি গ্রহণ করতে হবে।
চতুর্দশত, স্বাধীন অডিট ও সামাজিক নিরীক্ষা চালু করতে হবে।
পঞ্চদশত, ভর্তুকি ব্যবস্থাকে ধীরে ধীরে নগদ ও ডিজিটাল সহায়তার সঙ্গে সমন্বিত করতে হবে।
বাংলাদেশের ইতিহাসে বহু সংকট এসেছে, বহু চ্যালেঞ্জ এসেছে। কিন্তু প্রতিটি সংকটই আমাদের একটি শিক্ষা দিয়েছে। মিরপুরের এই মর্মান্তিক ঘটনাও একটি শিক্ষা দিয়ে গেছে।
প্রশ্ন হলো, আমরা কি সেই শিক্ষা গ্রহণ করব?
নাকি কয়েকদিন আলোচনা-সমালোচনার পর আবারও সবকিছু ভুলে যাব?
রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ের নীতিনির্ধারকদের মনে রাখা উচিত—দারিদ্র্য কোনো অপরাধ নয়। সাহায্য নেওয়া কোনো লজ্জার বিষয় নয়। লজ্জার বিষয় হলো এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে একজন মানুষ তার প্রাপ্য সুবিধা নিতে গিয়ে প্রাণ হারায়।
টিসিবির লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলো রাষ্ট্রের বোঝা নয়; তারাই এই রাষ্ট্রের ভিত্তি। তাদের ঘামে অর্থনীতি চলে। তাদের শ্রমে শহর বাঁচে। তাদের অবদানে উন্নয়নের চাকা ঘোরে।
অতএব, তাদের জন্য ভর্তুকি দেওয়া অনুগ্রহ নয়; এটি রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
আর সেই দায়িত্ব পালনের প্রথম শর্ত হলো—কোনো নাগরিক যেন আর কখনও টিসিবির লাইনে দাঁড়িয়ে মৃত্যুর মুখে না পড়েন।
মিরপুরের দেয়ালধসের নিচে চাপা পড়া মানুষগুলো যেন শেষ সতর্কবার্তা হয়ে থাকে।
আর কোনো মায়ের সন্তান, কোনো সন্তানের বাবা, কোনো পরিবারের উপার্জনক্ষম মানুষ যেন কয়েক কেজি চাল-ডালের জন্য প্রাণ না হারান।
রাষ্ট্র যদি সত্যিই জনকল্যাণে বিশ্বাস করে, তবে টিসিবির সংস্কার আর বিলাসিতা নয়—এটি এখন জাতীয় জরুরি প্রয়োজন।

লেখক: জেমস আব্দুর রহিম রানা
সিনিয়র গণমাধ্যমকর্মী, সাহিত্যিক ও কলামিস্ট।