লালমনিরহাট প্রতিনিধি :
লালমনিরহাটে চীফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং দীর্ঘদিনের বিচারক সংকটের কারণে বিচারপ্রার্থী মানুষের ভোগান্তি দিন দিন বাড়ছে। আদালতের একাধিক পদ শূন্য থাকায় মামলার শুনানি ও নিষ্পত্তিতে বিলম্ব হচ্ছে। ফলে ন্যায়বিচার পাওয়ার আশায় আদালতে আসা মানুষকে বারবার তারিখ নিয়ে ফিরে যেতে হচ্ছে।
আদালত সূত্রে জানা যায়,জুন ২০২৬ সাল পর্যন্ত লালমনিরহাট জেলার আদলতে ফৌজদারী ও দেওয়ানি মামলা রয়েছে ৩১ হাজার ৬৪৯টি।
জেলা জজ আদালত ভবন থাকলেও নেই চীফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত ভবন।
লালমনিরহাট চীফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের মামলা সংখ্যা ১১হাজার ৫৪৭টি,এর বিপরীথে ৯টি আদালত রয়েছে, ৯জন বিচারকের বিপরীতে ৬ জন বিচারিক পদ বর্তমানে শূন্য রয়েছে।আদালতের প্রকাশিত বিচারক তালিকায় অতিরিক্ত চীফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ০১জন, সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ০২জন এবং জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ০৩ জনের বিপরীতে কোনো বিচারকের নাম উল্লেখ নেই।০৬ জন বিচারকের অভাবে বিচার ব্যাবস্থার দীর্ঘসুত্রতা তৈরী হয়েছে এতে মানুষের ভোগান্তি বাড়িয়েছে।
কালিগঞ্জ উপজেলার চন্দ্রপুর ইউনিয়নের বিচার প্রার্থী নুর হোসেন এই প্রতিবেদক কে বলেন,জমি সংক্রান্ত মামলার শুনানির জন্য দূর-দূরান্ত থেকে তাকে আদালতে আসতে হয়,বিচারক স্বল্পতার কারনে মামলার শুনানি না হওয়ায় মামলা নিস্পত্তি হচ্ছেনা,দিনের পর দিন আদালত চত্বরে তিনি আসেন আর তারিখ নিয়ে বাড়ী ফিরে যান।এতে তার সময় এবং অর্থ দুটোরই অপচয় হচ্ছে।
পাটগ্রাম উপজেলার বুড়িমারী ইউনিয়নের বিচার প্রার্থী আদম আলী এই প্রতিবেদক কে জানান,
বুড়িমারী থেকে লালমনিরহাট আদালতের দুরত্ব ৯৫ কিলোমিটার,আদালতের সময় অনুযায়ী পৌছাতে
ভোরে ট্রেনে উঠে আসতে হয়,আদালতে এসে যদি বিচারকের অভাবে বিচার দীর্ঘায়িত হয় এতে অর্থ এবং সময় আমাদের দুটোই নষ্ট হয়। মামলার ধার্য্য তারিখে আদালতে এসে যদি শুনানি না হয়, তাহলে আবার কয়েক মাস অপেক্ষা করতে হয়। এতে বিচার পাওয়ার আশা ক্রমেই ক্ষীণ হয়ে যায়।
লালমনিরহাট জেলা বারের সদস্য এ্যাডভোকেট হাফিজুর রহমান বলেন,২০০৭ সালে বিচার বিভাগ আলাদা হলেও লালমনিরহাটে চীফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত ভবন না থাকায় বিচার কার্য পরিচালনায় বিচারকদের হিমসিম খেতে হচ্ছে,ছোট ঘিঞ্চি রুমে আদালত বসে,আইনজীবীদের বসার জায়গা থাকে না,আইনজীবী সহকারীদের প্রবেশ করার মত পরিবেশ নেই, ভিন্ন ভিন্ন মামলার আসামী হওয়া স্বত্বেও একসাথে এজলাসে রেখে শুনানি করতে হয়,মামলার আসামি বেশী হলে এজলাসের বাহিরে রেখেই হাজিরা দিতে হয়।নেই নারীদের বসার নিরাপদ জায়গা,বাথরুম,নামায, ব্রেষ্ট ফিডিং এমন জরুরী বিষয় গুলো নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
আইনজীবী সৈকত আহমেদের মতে,বিচারক সংকটের পাশাপাশি চীফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের জন্য আধুনিক ও স্বতন্ত্র ভবনের অভাবও বিচার কার্যক্রমে প্রভাব ফেলছে।
লালমনিরহাট জেলাআইনজীবী সমিতির সাধারন সম্পাদক অ্যাডভোকেট রফিকুল ইসলাম বলেন,
“চীফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত ভবন নির্মাণ করাসহ অতিরিক্ত বিচারক নিয়োগ দিলে মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তি করা সম্ভব হবে।
জেলার জনসংখ্যা ও মামলার সংখ্যা বৃদ্ধি পেলেও সেই অনুপাতে বিচারক ও অবকাঠামো বৃদ্ধি পায়নি। ফলে বিদ্যমান বিচারকদের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। এর প্রভাব পড়ছে বিচার কার্যক্রমের গতি ও মানের ওপর।প্রতিদিন নতুন মামলা যুক্ত হলেও পুরোনো মামলা নিষ্পত্তির হার আশানুরূপ নয়।এতে মামলার জট বাড়ছে এবং বিচারপ্রার্থীদের মধ্যে হতাশা তৈরি হচ্ছে।
এদিকে লালমনিরহাট বিচার বিভাগীয় ওয়েবসাইটে প্রকাশিত তথ্যমতে, সম্প্রতি বিভিন্ন আদালতে বিচারক বদলি ও পদায়নের বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে। তবে শূন্য পদগুলো দ্রুত পূরণ না হলে পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হবে না বলে মনে করছেন আইনজীবীরা।
সুশাসনের জন্য নাগরিক(সুজন)লালমনিরহাট জেলার সভাপতি আমিরুল হায়াত মুকুল বলেন,
আদালতে বিচারপ্রার্থীদের দুর্ভোগ কমাতে দ্রুত শূন্য পদে বিচারক নিয়োগ, চীফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের জন্য পৃথক ও আধুনিক ভবন নির্মাণ এবং বিচারিক অবকাঠামোর উন্নয়ন জরুরি, অন্যথায় মামলা জট ও বিচার বিলম্ব প্রকট আকার ধারণ করবে।
মামলার বিচারপ্রার্থীদের প্রত্যাশা, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করে বিচার বিভাগে জনবল সংকট নিরসন করবে এবং আদালতের অবকাঠামোগত উন্নয়নের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের ন্যায়বিচার প্রাপ্তি নিশ্চিত করবে।

