April 7, 2026, 1:11 pm

ট্রাম্পের যুদ্ধে কাবু না হয়ে উল্টো শক্তিশালী হতে পারে ইরান

প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প কোনো চুক্তি ছাড়াই ইরান যুদ্ধের ইতি টানলে এমন পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে, যেখানে মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা তেহরানের কব্জায় চলে যাবে।

তখন তেল-গ্যাস উৎপাদনকারী আরব দেশগুলোকে এমন পরিণতি সামলাতে হবে, যেটা তারা শুরুও করেনি, নিয়ন্ত্রণও করেনি।

ফলে সব কিছু মিলিয়ে ইরানের শাসক গোষ্ঠীর পতন ঘটার বদলে এই যুদ্ধ তাদের আরও শক্তিশালী করে তুলতে পারে বলে রয়টার্সের বিশ্লেষণ তুলে ধরা হয়েছে।

বুধবার জাতির উদ্দেশে ভাষণের আগে রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ‘খুব দ্রুতই’ ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শেষ করবে।

এর আগের দিন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ইঙ্গিত দেন, কোনো চুক্তি ছাড়াই তিনি যুদ্ধ গুটিয়ে নিতে পারেন।

বুধবার রাতে জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে আরো জোরালো হামলার ইঙ্গিত দেন।

তিনি বলেন, “ওয়াশিংটন খুবই অল্প সময়ের মধ্যে, খুবই অল্প সময়ের মধ্যে সব সামরিক লক্ষ্য অর্জন করার পথে রয়েছে।”

ট্রাম্প ইঙ্গিত দেন, আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রের শর্ত না মানলে যুদ্ধ আরও তীব্র হতে পারে এবং ইরানের জ্বালানি ও তেল অবকাঠামো হামলার নিশানা হতে পারে।

কিন্তু হামলা বা যুদ্ধ শেষে পরিস্থিতি কী দাঁড়াবে, সে বিষয়ে স্পষ্ট নিশ্চয়তা না পেলে আরব দেশগুলো ঝুঁকিতে পড়ে যাবে। যুদ্ধের পরিণতি যাই হোক, সেটা পড়বে তাদের ঘাড়েই।

দুবাইভিত্তিক বি’হুথ রিসার্চ সেন্টারের পরিচালক মোহাম্মদ বাহারুন বলেন, “মূল সমস্যা হবে দৃশ্যমান ফলাফল ছাড়া যুদ্ধ শেষ হলে। ট্রাম্প যুদ্ধ থামিয়ে দিতে পারেন, কিন্তু তার মানে এই নয় যে, ইরানও থেমে যাবে।”

তিনি বলেন, “উপসাগরীয় অঞ্চলে যতদিন মার্কিন ঘাঁটি থাকবে, ইরান হুমকি দিয়েই যাবে।”

আরব দেশগুলোর বড় উদ্বেগ হলো— চলমান যুদ্ধ শেষে ইরান অপরাজিত মনোভাব ও বাড়তি প্রভাব নিয়ে সামনে দাঁড়াতে পারে, যে প্রভাব দিয়ে তারা নৌপথ, জ্বালানি প্রবাহ ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাকে হুমকির মুখে ফেলতে পারবে। সেক্ষেত্রে অমীমাংসিত এই যুদ্ধের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত মাশুল গুনতে হবে আরব দেশগুলোকেই।

বাহারুন বলেন, উপসাগরীয় অঞ্চলে নৌ-চলাচলের স্বাধীনতা ব্যাহত হওয়াটাই উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্য বড় উদ্বেগের বিষয়।

তার ধারণা, ইরান আঞ্চলিক জলসীমাকে তুরুপের তাস বানাতে পারে এবং গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে নিজেদের নিয়ম চাপিয়ে দিতে পারে।

“এটি শুধু হরমুজের বিষয় নয়। ইরান বৈশ্বিক অর্থনীতির ‘প্রেসার পয়েন্টে’ হাত রেখেছে।”

তার মতে, জ্বালানি প্রবাহে বিঘ্ন ঘটিয়ে তেহরান স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে যে, ভবিষ্যতে কারো মাথায় ইরানে হামলা চালানোর কথা এলে দুবার চিন্তা করতে হবে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, মূলত এ শঙ্কার কারণেই আরব দেশগুলো যুদ্ধে জড়ানো থেকে বিরত থেকেছে।

উপসাগরীয় অঞ্চলের নেতারা বলছেন, তাদের প্রধান উদ্বেগ ছিল, যুদ্ধ যেন আরো বিপজ্জনক রূপ না নেয়; সুন্নি ও শিয়াদের মধ্যে যেন এমন সংঘাত না বাধে, যাতে মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্র পাল্টে যায়।

‘মৌলিক ভুল’

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ভুল হিসাব-নিকাশের কারণে। হামলা হলে ইরান কীভাবে সেটার জবাব দেবে, তা তারা ঠিকঠাক আঁচ করতে পারেনি।

যুদ্ধের শুরুতেই ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকে হত্যা করে মার্কিন ও ইসরায়েলি বাহিনী। তার স্থলাভিষিক্ত হন ছেলে মুজতাবা খামেনি।

রয়টার্স লিখেছে, খামেনিকে হত্যার যে ঘটনাকে ডনাল্ড ট্রাম্প ইরানের শাসনব্যবস্থার ‘মাথা কেটে ফেলা’ হিসেবে দেখছিলেন, সেটা ছিল ইরানের শাসকদের চোখে প্রতিরোধ ও প্রতিশোধের উপলক্ষ।

মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক বিশ্লেষক ফাওয়াজ গেরগেস বলেন, “এক আঘাতেই ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু ভূরাজনৈতিক সংঘাতকে ধর্মীয় ও সভ্যতাগত সংঘাতে রূপ দিয়েছেন। তারা খামেনিকে একজন বিতর্কিত শাসক থেকে শহীদে পরিণত করেছেন।”

বিশ্লেষকদের মতে, খামেনির হত্যাকাণ্ড ইরানে ধর্মতান্ত্রিক নেতৃত্বকে নতুন করে বৈধতা দিয়েছে। ফলে ইরানের প্রভাবশালী রেভল্যুশনারি গার্ড কোর অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইকে কৌশল হিসেবে নিয়েছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, ইরানের শীর্ষ নেতাদের সরিয়ে দিলে পুরো ব্যবস্থা ভেঙে পড়বে, এমন ধারণা ভুল ছিল। ইরানের যে সহ্যশক্তি কিংবা বহুস্তরীয় ক্ষমতার কাঠামো, সেটা ডনাল্ড ট্রাম্প অস্বীকার করেছেন।

আট বছরের ইরাক যুদ্ধ থেকে শুরু করে কয়েক দশকের মার্কিন নিষেধাজ্ঞা— সবকিছু মোকাবেলা করার অভিজ্ঞতাই ইরানের আছে।

এসব কারণে আত্মসমর্পণ না করে ইরান আরো কঠোর মনোভাব ও দৃঢ়চেতা হয়ে প্রতিপক্ষকে মোকাবেলা করছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।

মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের ইরান বিশ্লেষক অ্যালেক্স ভাতাঙ্কা বলেন, “খামেনি ছিলেন একজন ‘আয়াতুল্লাহ’। তাকে আপনি এভাবে হত্যা করতে পারেন না।

“কিন্তু ট্রাম্প এমন একজন মানুষ, যার কোনো লাগাম নেই। শিয়াদের দৃষ্টিতে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট সব নিয়ম ও প্রটোকল লঙ্ঘন করেছেন।”

ইরানের ‘তেল অস্ত্র’

সন্ত্রাসবাদ বিশেষজ্ঞ ম্যাগনুস র‌্যানস্টোর্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের নীতিনির্ধারকরা ইরানের আদর্শিক শক্তি সম্পর্কে অবগত ছিলেন না। তারা সম্ভবত ইরানের সহনশীলতাকে অবমূল্যায়ন করেছেন।

তার মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ধারণা ছিল, বিমান হামলা চালিয়ে ইরানের শীর্ষ ব্যক্তিদের হত্যা ও সামরিক সক্ষমতা ধ্বংস করে দিতে পারলে পরিস্থিতি তাদের নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে।

“কিন্তু ইরানের শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়ার বদলে আরও সংহত হয়েছে। কারণ চাপের মুখে পুনর্গঠিত হওয়ার প্রস্তুতি ইরানের আগে থেকেই নেওয়া ছিল।”

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তেহরানের প্রতিশোধ নেওয়ার যে সক্ষমতা, সেটাও ওয়াশিংটন অবমূল্যায়ন করেছে।

তাদের ভাষায়, তেহরানের আকাশযুদ্ধে জেতার প্রয়োজন নেই; বরং প্রতিপক্ষের ওপর যুদ্ধের খরচ চাপিয়ে দিলেই চলবে।

কয়েক দশক ধরে ইরান সামরিক শক্তির পেছনে যতটা মনোযোগ দিয়েছে, তার চেয়ে বেশি মনোযোগ দিয়েছে প্রতিপক্ষকে চাপে ফেলার কৌশলে। সেক্ষেত্রে জ্বালানি অবকাঠামো ও হরমুজ প্রণালিকে কৌশলের কেন্দ্রবিন্দু বানিয়েছে তারা।

জ্বালানি স্থাপনায় হামলা ও হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ করে দিয়ে ইরান তেলের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। বিশ্বজুড়ে মুদ্রাস্ফীতি বেড়ে গেছে এবং সব চাপ গিয়ে পড়ছে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের উপর।

বিশ্লেষকদের মতে, নিরাপত্তার নিশ্চয়তা ছাড়া যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটলে উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলো ঝুঁকির মুখে পড়বে। আর ভবিষ্যতে ইরানের প্রতিশোধ হয়ত শুধু এ অঞ্চলেই সীমাবদ্ধ থাকবে না।

তেহরানের হাতে যে নেটওয়ার্ক রয়েছে, সেটার মাধ্যমে তারা যুদ্ধক্ষেত্রের বাইরেও ইসরায়েল, যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের মিত্রদের স্বার্থকে নিশানা বানাতে পারে।

র‌্যানস্টোর্প বলেন, “তারা এখনো এটা শুরুই করেনি। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে শাস্তি দেওয়ার বিশাল সক্ষমতা তাদের আছে।”

তিনি ইরানকে গ্রিক পুরানের ‘হাইড্রার’ মতো হুমকি হিসেবে দেখেন, যার যার শুঁড় মধ্যপ্রাচ্যের বাইরেও দৃশ্যমান হয়ে উঠতে পারে।

বর্তমান প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র পিছু হটলে তেহরান যুদ্ধের ফলকে পরাজয় হিসেবে দেখবে না।

বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ গুটিয়ে নিলে ইরানে ধর্মতান্ত্রিক ব্যবস্থা টিকে যাবে; সেখানে শক্তির ভারসাম্যে নাটকীয় কোনো পরিবর্তন আসবে না এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে ইরানকে আগের চেয়ে শক্তিশালী হিসেবে দেখা হবে।

এই বিভাগের আরও খবর


ফেসবুকে আমরা