নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করেই জামালপুরের বকশীগঞ্জ উপজেলায় প্রকাশ্যে বিক্রি হচ্ছে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম (এলপি) গ্যাসের সিলিন্ডার ও পেট্রোল। মুদি দোকান, ওষুধের দোকান, কম্পিউটারের দোকান, কাঁচামালের দোকানসহ নানা ধরনের দোকানে অবাধে পাওয়া যাচ্ছে এসব দাহ্য পদার্থ।
সরকার অনুমোদিত পেট্রোল পাম্প ছাড়া পেট্রোলসহ দাহ্য পদার্থ বিক্রির বিধান না থাকলেও তা উপেক্ষা করে বিভিন্ন এলাকায় মোড়ে মোড়ে বোতলে ভরা পেট্রোল ও এলপি গ্যাস সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে দেদারছে। এতে যে কোনো সময় বিস্ফোরণ বা অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।
অপরদিকে, সরকারি নির্ধারিত মূল্য লিটারপ্রতি ১১৭ টাকা হলেও খোলা বাজারে বোতলে ভরা পেট্রোল বিক্রি হচ্ছে ১৪০ থেকে ১৫০ টাকায়। একইভাবে এলপি গ্যাসের সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে ১৮০০ থেকে ১৯০০ টাকায়। ফলে ক্রেতারাও অতিরিক্ত দাম দিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
জানা গেছে, সিলিন্ডার গ্যাস ব্যবহারের জন্য বিস্ফোরক অধিদপ্তরের নির্দিষ্ট নীতিমালা রয়েছে। বিধিমোতাবেক সিলিন্ডার মজুদ ও বিক্রির ক্ষেত্রে বিস্ফোরক অধিদপ্তরের লাইসেন্স নেওয়া বাধ্যতামূলক। একইভাবে পেট্রোল বিক্রির ক্ষেত্রেও রয়েছে কঠোর বিধিনিষেধ। দাহ্য পদার্থ ও সিলিন্ডার মজুদ করার ক্ষেত্রে অগ্নিনির্বাপক যন্ত্রসহ প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকতে হয় এবং মজুদের স্থানের আশপাশে তাপ বা আগুনের উৎস রাখা যায় না।
কিন্তু এসব নিয়মের তোয়াক্কা না করেই বকশীগঞ্জ পৌর শহরের মধ্যবাজার, পুরোনো গোহাটি, বাসস্ট্যান্ড, মালিবাগ মোড়, কামারপট্টি মোড়, উপজেলা মোড়, মাস্টারবাড়ি বাজার, মৌলভীবাজার, টিকরকান্দি বাজার, ধুমালীপাড়া মোড় ও দক্ষিণ বাজারসহ বিভিন্ন এলাকায় অবাধে বিক্রি হচ্ছে এলপি গ্যাস ও পেট্রোল।
ওষুধের দোকান, কম্পিউটারের দোকান, মুদির দোকান, ক্রোকারিজের দোকান, ফলের দোকান, হোটেল, সেলুন, লাকড়ির দোকান, মোটরসাইকেল গ্যারেজ, কাঁচামালের দোকান, হার্ডওয়্যার দোকান, ফ্লেক্সিলোডের দোকান, মেশিনারি দোকান ও চা দোকানসহ বিভিন্ন ধরনের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে এসব পণ্য বিক্রি হচ্ছে। অনেক দোকানের সামনে এমনকি ফুটপাতেও সিলিন্ডার ফেলে রেখে তার ওপর পরিত্যক্ত বোতলে পেট্রোল সাজিয়ে রাখা হচ্ছে। অথচ অধিকাংশ ব্যবসায়ীরই এ সংক্রান্ত কোনো লাইসেন্স নেই।
পৌর এলাকার বাইরে উপজেলার মেরুরচর বাজার, খেওয়ারচর, নিলক্ষিয়া, জানকিপুর, পলাশতলা, লাউচাপড়া, কামালপুর মৃর্ধাপাড়া, দাসের হাট, জিন্না বাজার, সকাল বাজার, বাট্টাজোড়, সারমারা, নইমিয়ার বাজার, টুপকারচর, নতুন বাজার, শেখেরচর, রামরামপুর, মাদারেরচর, বালুঝুড়ি, নালার মোড়, খালেকের মোড় ও বিনোদেরচর বাজারসহ প্রায় প্রতিটি হাটবাজারেই বিক্রি হচ্ছে সিলিন্ডার গ্যাস ও পেট্রোল। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এগুলো খোলা জায়গায় রাখা হচ্ছে।
স্থানীয় সূত্র জানায়, প্রতিটি সড়কের পাশে বিভিন্ন দোকানের সামনে সিলিন্ডার গ্যাসের বোতল ও পানীয়ের পরিত্যক্ত বোতলে পেট্রোল-অকটেন সাজিয়ে রাখা হয়। এলপিজি বিক্রির ক্ষেত্রে যে নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন, তার কোনোটিই মানা হচ্ছে না। সেই সঙ্গে অধিকাংশ ব্যবসায়ীর নেই বৈধ লাইসেন্স।
জব্বারগঞ্জ বাজারের জ্বালানি তেল বিক্রেতা ইয়াকুব জানান, তার দোকানের ট্রেড লাইসেন্স রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে তিনি জ্বালানি তেল, পেট্রোল ও গ্যাস সিলিন্ডার বিক্রি করছেন। তবে এ বিষয়ে তদারকি করতে এখন পর্যন্ত কোনো কর্তৃপক্ষ তার দোকানে আসেনি বলে দাবি করেন তিনি।
বকশীগঞ্জ পৌর শহরের ফ্লেক্সিলোড ব্যবসায়ী আকরাম হোসেন বলেন, তার দোকানের ট্রেড লাইসেন্স আছে। তবে এলপি গ্যাস সিলিন্ডার বিক্রির জন্য আলাদা লাইসেন্স বা অনুমোদন লাগে—এ বিষয়ে তিনি কিছু জানতেন না।
বকশীগঞ্জ প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক মাসুদ উল হাসান বলেন, আইন থাকলেও তার প্রয়োগ নেই। এ কারণে লাইসেন্সবিহীনভাবে যত্রতত্র পেট্রোল ও গ্যাস সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে। এতে যে কোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। দ্রুত এ বিষয়ে প্রশাসনের কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
মানবাধিকার কর্মী মোয়াজ্জেম হোসেন হিলারী বলেন, উপজেলায় মাত্র একটি পেট্রোল পাম্প থাকলেও প্রায় তিন শতাধিক স্থানে পেট্রোল ও এলপি গ্যাস পাওয়া যায়। পেট্রোল পাম্প থেকেই খোলা বাজারে জ্বালানি তেল চলে যাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। তাই পাম্প মালিক ও এলপি গ্যাস ডিলারদেরও জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।
বকশীগঞ্জ ফায়ার সার্ভিসের ভারপ্রাপ্ত স্টেশন অফিসার আব্দুল কুদ্দুস বলেন, সড়কের ধারে এলপি গ্যাস সিলিন্ডার ও পেট্রোল সাজিয়ে বিক্রি করা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এতে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড বা প্রাণহানির মতো ঘটনা ঘটতে পারে। এলপি গ্যাস ও পেট্রোল বিক্রি করতে হলে পৌরসভা বা ইউনিয়ন পরিষদের ট্রেড লাইসেন্সের পাশাপাশি বিস্ফোরক ও জ্বালানি সংক্রান্ত অনুমোদন থাকতে হবে।
এ বিষয়ে বকশীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আবদুল হাই বলেন, দাহ্য পদার্থ ও গ্যাস সিলিন্ডার বিক্রির জন্য নির্দিষ্ট আইন রয়েছে। যত্রতত্র এসব বিক্রির কোনো সুযোগ নেই। ইতোমধ্যে অভিযান চালিয়ে সংশ্লিষ্টদের সতর্ক করা হয়েছে এবং এ ধরনের অভিযান অব্যাহত থাকবে। নির্দেশনা না মানলে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
মোহাম্মদ আসাদ-স্টাফ রিপোর্টার ।