September 16, 2021, 2:58 pm

অনলাইন / ইন্টারনেট বিষয়ক পরামর্শ : আমাদের পোস্ট, স্ট্যাটাস ও কমেন্টস যেন হয় ইসলামের খেদমত

হুসাইন আহমদ:ইন্টারনেট ব্যবহারকারী প্রায় প্রতিটি মানুষই এখন কম-বেশি ফেসবুক ব্যবহার করেন। বর্তমানে ফেসবুক পৃথিবীর অন্যতম আলোচিত বিষয়। ফেসবুক এ যুগের এক নতুন শক্তির নাম। এর মাধ্যমে কোনো দেশে বিপ্লব সাধিত হচ্ছে। কোথাওবা সরকারের গদি টালমাটাল হচ্ছে। আবার এর মাধ্যমে দুষ্কৃতিকারীরা মিথ্যা ছড়িয়ে দিচ্ছে। অশ্লীলতা ও নগ্নতাকে ব্যাপক করে তুলছে। তরুণ প্রজন্মের অনেকের কাছেই আজ ফেসবুক এক আফিমের মতো। পৃথিবী জুড়ে অসংখ্য তরুণ-তরুণী এর মাধ্যমে অবৈধ সম্পর্ক গড়ছে এবং মিথ্যার রাজত্ব কায়েম করছে।

তেমনি এর মাধ্যমে হাজারো মুসলিম ভাই-বোন নিজেদের কল্যাণকর চিন্তা ও জনহীতকর ধারণা অন্যদের মাঝে পৌছে দিচ্ছেন। বিশুদ্ধ আকীদা ও চিন্তা-চেতনার প্রসারও সহজ হয়েছে। যখন যে উপলক্ষ্য আসছে সে সম্পর্কে ইসলামের দিক-নির্দেশনা সহজেই ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব হচ্ছে। ইসলাম ও মানবতার শত্রæরা এতদিন ইন্টারনেটের এই ভার্চুয়াল দুনিয়ায় ইচ্ছে মত ইসলাম ও ইসলামের নবী এবং তাঁর আদর্শকে অসম্মান বা অপমান কিংবা তার বিরুদ্ধে বিবেকহীন অপপ্রচার চালিয়েছে। আজ তারা চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হচ্ছে। তাদের দাঁত ভাঙ্গা জবাব দেয়া যাচ্ছে। এই ফেসবুকের মাধ্যমে পৃথিবীর বিবেকবান মানুষের সামনে প্রকৃত সত্য তুলে ধরা যাচ্ছে।

বর্তমানে অনেক নেককার মুত্তাকি লোকদেরও ফেসবুকে দেখা যাচ্ছে । যারা নিজেদের মেধা ও যোগ্যাতার আলোকে প্রকৃত সত্যকে মানুষের সামনে তুলে ধরার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু জুকারবার্গের এ দুনিয়ায় পা রাখতেই অনেক দুরাচারী বা রুচিহীন লোকের উৎপাতে তাঁরা বিব্রতকর অবস্থায় পড়েন। অনেকে নিজের ওয়ালে অযথা অভব্য বাক্য লিখে কিংবা অশালীন ছবি পোস্ট করেন। যা তাদের কাছে ভালো লাগলেও অনেকের কাছে ন্যাক্কারজনক প্রতীয়মান হয়, সেদিকে তারা খেয়ালই করে না।

ইসলামের সৌন্দর্য হলো নিরর্থক বিষয় পরিহার করা। অর্থাৎ যেসব কথা ও কাজে দুনিয়া বা আখেরাতের কোনো ফায়দা নেই তা পরিত্যাগ করা। যে স্ট্যাটাস দ্বারা আমার দুনিয়া আখেরাতের কোনো উপকার হয়না, তা পরিহার করা। অথচ কিছু দুরাচার মানুষ ফেসবুক দুনিয়ায় বাস করে, তাদের কাজ হচ্ছে কেউ একটা স্ট্যাটাস দিলেই তার নিচে কমেন্টস করা। যদি তার মতের সাথে মিলে তো ভাল, আর না হয় এমন ভাষায় কমেন্টস করে, যা দেখে লজ্জা হয়। এখানে আমাদের খেয়াল রাখা দরকার যে, আমার মতের সাথে না মিললেই তাকে খারাপ বলতে পারি না। খারাপ কোনো কমেন্টস করতে পারি না।
নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসালাম আমাদের এ শিক্ষাই দিয়েছেন। হাদীস শরীফে বর্ণিত, একদিন এক ইহুদী নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহ ওয়াসাল্লামকে বললো ‘আসসামু আলাইকা’ (আপনার মৃত্যু হউক)। আম্মাজান আয়েশা রাযি. ক্ষিপ্ত হয়ে বললেন, তোমার মৃত্যু হউক, তোমার উপর লানত। রাসুুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আয়েশা! তুমি কাজটি ঠিক করোনি। আল্লাহ তা‘আলা সব কাজেই দয়াকে পছন্দ করেন। হযরত আয়েশা রা. বললেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ! আপনি শুনেননি, সে কি বলেছে? হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আমি শুনেছি, আমিতো তাকে খারাপ বলতে পারিনা, আমি শুধু বলবো ‘আলাইকা’ তোমার উপরে তাই হউক, যা আমাকে বলেছ। এর বেশি কিছু আমি বলবো না।

এখান থেকে আমরা কি শিখতে পারলাম, কেউ আমাকে খারাপ বললেও আমি তাকে খারাপ বলবো না। এখনতো আমাদেরকে খারাপ বলতে হয়না, কথা ভালই বলেছে, কিন্তু আমার মতের সাথে মিলে নাই, তাই তার চৌদ্দগোষ্টি উদ্ধার করে কমেন্টস করি। কোনো ব্যক্তি বা দলের বিপরিতে বলেছে, তাই তার গায়ে লেগেছে। আমার দলীয় মতের বিরুদ্ধে কথা/স্ট্যাটাস! এটা সয্য করা হবেনা। এমন গালি দেই যা দেখে বখাটে লোকটাও লজ্জা পায়। ভালো মানুষ কখনো গালি দেয় না। দিতেই পারে না। কারো প্রতি রাগান্বিত হলেও সে খারাপ ভাষা ব্যবহার করে না। ভালো মানুষের রাগ প্রকাশের ভঙ্গিটাও হয় সুন্দর ও সংযত। পক্ষান্তরে মন্দ মানুষ যখন রাগান্বিত হয়, তখন সে ভদ্রতা ভুলে যায়। তার আসল রূপ বের হয়ে আসে। সে তখন গালি দিতে থাকে। সে প্রতিপক্ষকে পরাস্ত করতে চায়, কিন্তু নিজেই পরাস্ত হয়। কেননা, সবাই তাকে অভদ্র বলে চিনে ফেলে। তাকে অপছন্দ করতে শুরু করে।

গালি বর্তমান সমাজের এক মারাত্মক ব্যাধি। যদিও গালি দেয়া পাপের কাজ। গালিগালাজ করা কোনো সুস্থ মানসিকতার পরিচয় নয়। মুদ্রাদোষ বা অভ্যাসবশত: অনেকেই কথায় কথায় গালি দেয়, অনেকেই হাসি-তামাশা ও ঠাট্টাচ্ছলেও অন্যকে গালি দিয়ে বসে। এ সবের কোনোটিই ঠিক নয়। গালি সম্বন্ধে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, এমন দুই ব্যক্তি, যারা একে অপরকে গালি দেয়, গালির পাপ সে ব্যক্তির উপরই পতিত হবে, যে প্রথমে গালি দিয়েছে। যে পর্যন্ত না নির্যাতিত ব্যক্তি সীমা অতিক্রম করে। (অর্থাৎ সে পাল্টা গালি না দেয়)
নবি কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুমিন ও মনাফিকের পরিচয় দিয়ে বলেন- যার মধ্যে চারটি বিষয় পাওয়া যাবে, সে প্রকৃত মুনাফিক। আর যার মধ্যে কোনো একটা পাওয়া যাবে তার মধ্যে মুনাফিকের একটি আলামত পাওয়া গেল, যে পর্যন্ত না সে তা পরিত্যাগ করে। সে চারটি বিষয় হলো, তাকে বিশ্বাস করা হলে সে বিশ্বাস ভঙ্গ করে, কথা বলতে মিথ্যা বলে, অঙ্গিকার করলে তা ভঙ্গ করে এবং যখন বিবাদে উপনীত হয় তখন অন্যায় পথ অবলম্বন করে। (অর্থাৎ গালিগালাজ করে) [সহিহ বুখারি, হাদিস : ৩৪; সহিহ মুসলিম, হাদিস : ১০৬]

অন্য হাদীসে আছে, মুমিন কখনো দোষারোপকারী, অভিশাপকারী, অশ্লীল ও গালিগালাজকারী হয় না (হতে পারে না)। [জামে তিরমিজি, হাদীস : ২০৪৩]
এমনকি ইসলামের মাহাত্ম হলো- মক্কার কাফিররা নবিজীকে সীমাহীন কষ্ট দিয়েছিল, সাহাবায়ে কেরামকে কষ্ট দিয়েছিল, কিন্তু যখন আল্লাহ তা‘আলা মুমিনদের বিজয় দান করলেন তখন কাফিরদের থেকে বিন্দুমাত্রও প্রতিশোধ গ্রহণ করা হয়নি। তাদের জান-মাল, ইযযত-আব্রæর সম্পূর্ণ নিরাপত্তা দেয়া হয়েছিল। নবি কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের জন্য সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেছিলেন এবং মুমিনগণ আল্লাহর আদেশের অনুগত ছিলেন।
গালি দেয়ার ফলে দুনিয়া ও আখেরাতের কোনো উপকার হয় না বরং ক্ষতিই সাধিত হয় তাই আমাদের উচিত গালির অভ্যাস পরিত্যাগ করার। কেননা রাসুলুল্লাহ [সা.] বলেন, কোনো মুসলমানকে গালি দেয়া ফাসেকি। (বোখারি ও মুসলিম)।
আমাদের কিছু ভাই আছেন, যারা বুঝে না বুঝে একটা পোস্ট দেখলেই শেয়ার করে দেন। এটাও ঠিক না। যতক্ষণ পর্যন্ত আমি এ পোস্টের সত্যতার ব্যপারে নিশ্চিত না হবো ততক্ষণ পর্যন্ত এই পোস্ট শেয়ার দেয়া ঠিক হবে না। কেননা রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, কোন লোকের মিথ্যাবাদী হওয়ার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে, সে যা শুনে (সত্যতা যাচাই না করে) তা-ই বলে বেড়ায়। (মুসলিম)
পোস্টকৃত কথাগুলো অনেক সুন্দর বা আমার মনপুত হয়েছে তাই আমি শেয়ার দিয়ে দিলাম। পরে দেখা গেল, কথাগুলো মিথ্যা। আমি না জেনে মিথ্যাবাদী হয়ে গেলাম।
মোট কথা, ফেসবুকে কমেন্টস, পোস্ট/স্টেটাস বা কোনো শেয়ার দেয়ার সময় আমাদের সংযত হওয়া দরকার। নিজের মতের বিপরীত হলেও সে ব্যাপারে সুন্দর কোনো পরামর্শ দেয়া বা চুপ থাকা চাই। গালমন্দ বা খারাপ কমেন্টস না করা উচিৎ। আল্লাহ তা‘আলা আমাদের হেফাজত করুন। আমীন।

লেখক, আলিম, ধর্মীয় আলোচক

এই বিভাগের আরও খবর


ফেসবুকে আমরা