ডেস্ক রিপোর্টার ।
স্থানীয় সরকার ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নিয়ে খোলামেলা বক্তব্য দিয়েছেন অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন। এক সাক্ষাৎকারে তিনি দাবি করেন, প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস–এর উপদেষ্টা পরিষদের একটি ‘কিচেন কেবিনেট’ ছিল, যার সদস্য তিনি ছিলেন না।
তিনি বলেন, ওই কেবিনেটে কী আলোচনা হতো তা তাকে জানানো হতো না। সদস্যরা ছিলেন ইউনূসের ঘনিষ্ঠজন। “দেশ তখন অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতির মধ্যে ছিল। কিন্তু কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আমাকে ডাকা হয়নি, পরামর্শও চাওয়া হয়নি। হয়তো তারা ধরে নিয়েছিল, আমি তাদের সঙ্গে একমত হব না,”—বলেন তিনি। তবে নির্বাচন পেছানো বা নির্বাচন আয়োজন নিয়ে তিনি স্পষ্ট কোনো মন্তব্য করেননি।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে দায়িত্ব ও অপসারণ
সাখাওয়াত জানান, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে তার প্রধান লক্ষ্য ছিল পুলিশকে পুনর্গঠন করা। তার ভাষ্য অনুযায়ী, সে সময় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ছিল নাজুক—অনেক থানা লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের শিকার হয়, পুলিশ সদস্যরা মাঠে নামতে অনীহা প্রকাশ করেন।
তিনি বলেন, “পুলিশের কিছু দাবি-দাওয়া ছিল। আলোচনার মাধ্যমে তাদের কাজে ফিরিয়ে আনা হয়। ট্রাফিক পুলিশও প্রথমে দায়িত্বে দাঁড়াতে চায়নি। পরে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে সক্ষম হই।”
তার দাবি, প্রায় ৪ হাজার রাইফেল লুট হয়েছিল, যার কিছু উদ্ধার করা গেলেও এখনো বিপুল পরিমাণ অস্ত্র উদ্ধার হয়নি। “হাজারের বেশি রাইফেল-পিস্তল এখনো লুট অবস্থায় আছে, যা বর্তমান সরকারের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি হতে পারে,”—বলেন তিনি।
কেন তাকে সরিয়ে দেওয়া হলো—এ প্রশ্নে তিনি বলেন, “আমি এমন কিছু কথা বলেছিলাম, যা তখন অনেকে সঠিক মনে করেননি। তবে এখন দেখছি, তার চেয়েও বেশি কিছু হচ্ছে।” তিনি আরও জানান, অল্প সময়ের মধ্যে দায়িত্ব ছাড়তে চাইলেও প্রধান উপদেষ্টা তাকে তা করতে দেননি, কারণ এতে ‘খারাপ বার্তা’ যেতে পারত।
৭.৬২ বুলেট ও রাইফেল প্রসঙ্গ
৭.৬২ ক্যালিবার চীনা টাইপ-৩৯ রাইফেল প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এটি অত্যন্ত মারাত্মক সমরাস্ত্র, যা সাধারণত পুলিশের ব্যবহারের জন্য নয়। তার ভাষ্য অনুযায়ী, কিছু ভিডিওতে সন্দেহজনক ব্যক্তিদের হাতে এই অস্ত্র দেখা গেছে।
তিনি বলেন, “এই রাইফেল পুলিশকে কখন ও কী কারণে দেওয়া হয়েছে, তা তদন্ত করা উচিত ছিল। কিন্তু আমাকে সে সুযোগ দেওয়া হয়নি।” কিছু ব্যক্তির চেহারা ও গঠন নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করে তিনি ‘বহিরাগত’ শব্দও ব্যবহার করেন।
নির্বাচন ও রাজনৈতিক প্রসঙ্গ
নির্বাচন নিয়ে সাখাওয়াত বলেন, “পৃথিবীর কোনো নির্বাচনই শতভাগ খাঁটি হয় না। আমাদের দেশেও তা হয় না।”
তিনি উল্লেখ করেন, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ৭৭টি আসন পেয়েছে, যা তার মতে “একটি বড় ঘটনা”। তিনি বলেন, ইউরোপ-আমেরিকাতেও নির্বাচনে সমস্যা হয়, আর বাংলাদেশে টানা তিন নির্বাচনে মানুষ ভোট দেওয়ার সুযোগই পায়নি।
চুক্তি ও আন্তর্জাতিক প্রভাব
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক চুক্তি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, অপ্রকাশিত কোনো চুক্তি হয়নি। বিডা, পিপিপি অথরিটি ও সংশ্লিষ্ট সংস্থার মাধ্যমেই চুক্তি সম্পন্ন হয় এবং সেখানে নন-ডিসক্লোজার ক্লজ থাকে।
আমেরিকান কোম্পানির শ্রমিক কল্যাণ তহবিলে ৪ শতাংশ অবদান নিয়ে জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে তার মতবিরোধ হয়েছিল বলে জানান তিনি। Chevron Corporation–এর মতো প্রতিষ্ঠানের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, উন্নত প্রযুক্তি বিশেষ করে অফশোর খাতে এখনো মূলত যুক্তরাষ্ট্রের কাছেই রয়েছে।
তিনি দাবি করেন, আলোচনার মাধ্যমে একটি প্রস্তাবিত হার ১ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১.৫ শতাংশে সমন্বয় করা হয়, যদিও সংশ্লিষ্ট কমিটির আপত্তি ছিল।
বিদেশি প্রভাব ও পররাষ্ট্রনীতি
অন্তর্বর্তী সরকারের ওপর বিদেশি প্রভাব ছিল কি না—এ প্রশ্নে সাখাওয়াত বলেন, “সর্বক্ষেত্রে নয়, তবে কিছু ক্ষেত্রে চাপ ছিল, বিশেষ করে ট্রেড নেগোসিয়েশনে।”
পররাষ্ট্রনীতি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আগের সরকারের নীতি ছিল ‘দিল্লি-কেন্দ্রিক’, যা সাধারণ মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য ছিল না। তার দাবি, বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ও সিদ্ধান্তেও দিল্লি-কেন্দ্রিক প্রভাব ছিল।
চ্যানেল ওয়ানের সঙ্গে সাক্ষাৎকারে দেওয়া এই বক্তব্যে সাবেক উপদেষ্টা একাধিক স্পর্শকাতর বিষয়ে নিজের অবস্থান তুলে ধরেন, যা রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে।