February 20, 2026, 10:59 pm

জনপ্রতিনিধিহীন স্থানীয় সরকার চলছে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে

ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনসহ দেশের ১১টি সিটি করপোরেশনে নেই কোনো জনপ্রতিনিধি। ৬১টি জেলা পরিষদ, ৪৯৫টি উপজেলা পরিষদ এবং ৩৩০টি পৌরসভাও চলছে জনপ্রতিনিধি ছাড়া, সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের খণ্ডকালীন দায়িত্বে। শুধু চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনে মেয়র রয়েছেন। তবে এখানেও নেই কোনো কাউন্সিলর। সব মিলিয়ে জনপ্রতিনিধিহীন অবস্থায় আছে দেশের স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো। ফলে কাক্সিক্ষত সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে মানুষ, পোহাতে হচ্ছে ভোগান্তি। এসব প্রতিষ্ঠানে দ্রুত নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি না দিলে কঠিন চ্যালেঞ্জে পড়তে পারে কেন্দ্রীয় সরকার। কারণ কেন্দ্রীয় সরকারের সিদ্ধান্তগুলো স্থানীয় পর্যায়ে বাস্তবায়ন হয়ে থাকে জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে; এমনটাই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা আরও বলছেন, এক্ষেত্রে নির্বাচনের আগে বেশকিছু মৌলিক সংস্কারও প্রয়োজন।

সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে স্থানীয় সরকারের প্রতিষ্ঠান পরিচালনার জন্য খণ্ডকালীন দায়িত্ব দিয়েছিল অন্তর্বর্তী সরকার। দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা নিজ দপ্তরের কাজের পাশাপাশি বাড়তি কাজ হিসেবে কিছু সময় স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোতে দিয়ে থাকেন। ফলে এসব প্রতিষ্ঠান থেকে যেসব সেবা পাওয়ার কথা, সেগুলো মিলছে না। উপরন্তু শহর-গ্রামের অধিকাংশ রাস্তা-ঘাট ভেঙে একাকার। দীর্ঘ ধরে নেই তেমন কোনো সংস্কারকাজ। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকার পতনের পর অনেক সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, জেলা পরিষদ, উপজেলা পরিষদের মেয়র-চেয়ারম্যান আত্মগোপনে চলে যান। তাদের কেউ কেউ দেশ ছেড়েও পালিয়ে যান। কেউবা জুলাই হত্যা মামলায় কারাগারে রয়েছেন। নেই কাউন্সিলর, মেম্বারও। কারণ তাদের অধিকাংশই ছিলেন ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিসের (বিআইআইএসএস) পরিচালক এবং সাবেক স্থানীয় সরকার নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সদস্য ড. মাহফুজ কবীর আমাদের সময়কে বলেন, নির্বাচন অবশ্যই দরকার। কারণ স্থানীয় সরকার কাঠামো গণতান্ত্রিক ফাংশন করছে না। অবশ্য নির্বাচনের আগে কিছু মৌলিক সংস্কারও দরকার। নয়তো স্থানীয় সরকার কাঠামোতে পরিবর্তন আসবে না, আগের ধারাই বজায় থাকবে। এ জন্য মৌলিক সংস্কারগুলো বাস্তবায়ন করেই নির্বাচন দেওয়া দরকার, যোগ করেন তিনি।

ড. মাহফুজ কবীর আরও বলেন, জনপ্রতিনিধি না থাকায় বর্তমানে অনেক সমস্যা হচ্ছে। যাদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, তারা এ কাজের পাশাপাশি নিজ মন্ত্রণালয়ের কাজেও ব্যস্ত থাকেন। তাই মানুষ সেবা পাচ্ছে না। এগুলো দূর করতে হলে নির্বাচন দরকার।

মাত্র দুদিন হলো নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করেছে। এ সরকারও চাইছে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির যে অভাবনীয় বিজয়Ñ সেটার রেশ থাকতে থাকতেই স্থানীয় সরকার নির্বাচন সম্পন্ন করতে। অতীতে দেখা গেছে, সরকারের জনপ্রিয়তায় ধস নামলে এর প্রভাব পড়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে। তাই সরকার চাইছে বুঝেশুনে পা বাড়াতে। এছাড়া বিএনপির বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মীÑ যারা সিটি করপোরেশন, পৌরসভার মেয়র হওয়ার জন্য দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন তারাও চান দ্রুত নির্বাচন হয়ে যাক।

স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরও বলেছেন, দ্রুততম সময়ের মধ্যে সরকার জেলা পরিষদ, উপজেলা পরিষদ ও পৌরসভা নির্বাচনের উদ্যোগ গ্রহণ করবে।

নির্বাচন কমিশনও (ইসি) স্থানীয় সরকার নির্বাচনের দিকে নজর দিয়েছে। ঈদুল ফিতরের পর স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের নির্বাচনের পরিকল্পনা নিয়ে আগাচ্ছে ইসি। তিনটি বড় সিটি করপোরেশন নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ইসির স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু হতে পারে। মেয়াদোত্তীর্ণ ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি ছাড়াও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন রয়েছে প্রথম ধাপে নির্বাচনের তালিকায়। পর্যায়ক্রমে দেশের অবশিষ্ট ৯টি সিটি করপোরেশনসহ জেলা পরিষদ, পৌরসভা ও উপজেলা পরিষদের নির্বাচন আয়োজনের কথা ভাবছে ইসি। এমনকি সরকারের সিদ্ধান্ত পেলে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন আয়োজনেও ইচ্ছুক ইসি।

স্থানীয় সরকার নির্বাচন বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার আবদুর রহমানেল মাছউদ বলেন, মেয়াদোত্তীর্ণ বড় সিটি করপোরেশন নির্বাচনগুলো সেরে ফেলার প্রস্তুতি নিচ্ছি আমরা। এরপর পর্যায়ক্রমে অন্য নির্বাচন আয়োজনেও হাত দেব।

এ বিষয়ে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ভুক্ত স্থানীয় সরকার বিভাগের চিঠি এখনও পায়নি ইসি। এরপরও চলছে তাদের আগাম প্রস্তুতি।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকার পতনের পর মেয়র, চেয়ারম্যান ও কাউন্সিলরদের পদত্যাগের প্রেক্ষাপটে অন্তর্বর্তী সরকার ১২টি সিটি করপোরেশন, ৩৩০ পৌরসভা, ৪৯৭ উপজেলা পরিষদ এবং ৬৪টি জেলা পরিষদের জনপ্রতিনিধিদের অপসারণ করে। বর্তমানে ইউনিয়ন পরিষদ ছাড়া এসব স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান প্রশাসকের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। তবে আদালতের আদেশে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন শাহাদাত হোসেন।

আইন অনুযায়ী, মেয়াদ শেষ হওয়ার পূর্ববর্তী ১৮০ দিনের মধ্যে সিটি করপোরেশনের নির্বাচন আয়োজনের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হয়েছিল ২০২০ সালের ২ জুন। সেই হিসাবে গত বছরের ১ জুন এই সিটির পাঁচ বছরের মেয়াদ পূর্ণ হয়েছে। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রথম সভা হয়েছিল ২০২০ সালের ৩ জুন। এই সিটির পাঁচ বছরের মেয়াদ শেষ হয়েছে ২০২৫ সালের ২ জুন। এ ছাড়া চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হয়েছিল ২০২১ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি। আইন অনুযায়ী, এই সিটির মেয়াদ শেষ হচ্ছে আগামী ২২ ফেব্রুয়ারি। এই তিন সিটিতে নির্বাচনের প্রস্তুতি সবচেয়ে জরুরি হয়ে পড়েছে বলে মনে করছে ইসি। ইসি সূত্র জানায়, চিঠি পাওয়ার পর কমিশন দ্রুত ভোটার তালিকা হালনাগাদ, নির্বাচনী এলাকার সীমানা নির্ধারণ, প্রার্থী যাচাই-বাছাই এবং নির্বাচনী কর্মকর্তা নিয়োগসহ প্রয়োজনীয় সব প্রস্তুতি গ্রহণ করবে। চট্টগ্রাম সিটির জন্য সময় খুবই সীমিত থাকায় সেখানে পৃৃথক জরুরি পরিকল্পনা নেওয়া হতে পারে।

দেশের স্থানীয় সরকার কাঠামো দুটি ভাগে বিভক্ত। পল্লী বা গ্রাম অঞ্চল ও শহর অঞ্চল। পল্লী বা গ্রাম এলাকায় তিনটি স্তর। জেলা পরিষদ, উপজেলা পরিষদ ও ইউনিয়ন পরিষদ। আর শহর এলাকা দুটি ভাগে বিভক্ত। সিটি করপোরেশন ও পৌরসভা।

এই বিভাগের আরও খবর


ফেসবুকে আমরা