নিজস্ব প্রতিনিধি ।
নানা ধরনের আশঙ্কা, জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে শেষ পর্যন্ত শান্তিপূর্ণভাবেই অনুষ্ঠিত হয়েছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর অবস্থানের কারণে, বিশেষ করে সেনাবাহিনী মাঠ পর্যায়ে দায়িত্ব পালনে কঠোর থাকার কারণেই কোনো ধরনের সংঘাত-প্রাণহানি হয়নি। এমনকি যেখানে সংঘাতের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে, সেখানেই সেনাবাহিনী অবস্থান নিয়ে উত্তেজিত জনতাকে নিবৃত্ত করেছে। সেনাবাহিনী ছাড়াও নৌ ও বিমান বাহিনী, আনসার, কোস্ট গার্ড, পুলিশ, র্যাবসহ সব বাহিনীর সদস্যরা দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করেছেন। ভোটকেন্দ্রের বাইরে নির্বিঘ্নে ভোটারদের নিরাপত্তা ও সার্বিক পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সেনাবাহিনী, বিশেষ করে সশস্ত্রবাহিনীর সদস্যরা স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। সকাল সাড়ে ৭টা থেকে বিকাল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সশস্ত্র বাহিনীর নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তার কারণে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার মধ্যেই সুষ্ঠুভাবে ভোটগ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে। নির্বাচনের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সশস্ত্র বাহিনীর প্রশংসা করা হচ্ছে। ভোটের দিন সকাল সাড়ে ১০টায় সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজ কেন্দ্রে ভোট দেওয়ার পর ভোটারদের উদ্দেশে বলেন, ‘আপনারা নির্ভয়ে কেন্দ্রে গিয়ে ভোট দেন। আমি মনে করি যে আজকে আমাদের জাতির জীবনে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিন, আনন্দের দিন। আমরা গত দেড় বছর ধরে এ দিনটির অপেক্ষায় ছিলাম। এটা একটা সুষ্ঠু নির্বাচন। আজকে আলহামদুলিল্লাহ, সে নির্বাচন হচ্ছে।’ নির্বাচনের আগে সেনাপ্রধান সব পদাতিক ডিভিশনে মিটিং করে নির্বাচন নিয়ে নির্দেশনা দিয়েছেন। পাশাপাশি তিনি সব ইউনিট পরিদর্শন করে সেনা সদস্যদের দায়িত্ব পালনের ব্যাপারে সতর্ক করেছেন। ফলে সেনাবাহিনী নির্বাচনের দিন এবং আগে ও পরে মাঠে থেকে যে কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ করেছে। সেনাবাহিনী ছাড়াও বিমান বাহিনীর সদস্যরাও দায়িত্ব পালন করেছেন। রাজধানীর বিএএফ শাহীন কলেজ কেন্দ্রে ভোট দেওয়ার পর বিমানবাহিনীর প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খাঁন বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকার এবং নির্বাচন কমিশন অনেক কাজ করেছেন এই নির্বাচনের জন্য। এটা আমরা উত্সবমুখরভাবে করতে চেয়েছিলাম। আজকে অনেক বছর ধরে ভোট দিচ্ছি। অনেক বছর পর একটা সত্যি উত্সবমুখর ভোট দেখছি, যেটা হয়তো-বা আমি একদম ছোটবেলায় দেখেছিলাম। আমরা একটা সুন্দর নির্বাচনের আশা করছি।’ রাজধানীর বারিধারা স্কলার্স ইন্টারন্যাশনাল স্কুল অ্যান্ড কলেজ কেন্দ্রে ভোট দিয়ে নৌবাহিনী প্রধান অ্যাডমিরাল এম নাজমুল হাসান বলেন, ‘সকাল থেকেই আনন্দঘন পরিবেশে নির্বাচন শুরু হয়েছে। জনগণ তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগে সক্ষম হয়েছে। তবে বিভিন্ন স্থানে বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনার কথা জানতে পেরেছি। আমরা তাত্ক্ষণিকভাবে সেখানে ব্যবস্থা নিয়েছি। আমার বিশ্বাস সুন্দর একটি নির্বাচন জনগণকে উপহার দিতে পারব।’ নির্বাচনের আগে বুধবার রাত থেকেই সারা দেশের কেন্দ্রগুলোর বাইরে পাহারায় ছিল সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরা। ভোট শুরুর আগে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বিচ্ছিন্ন কয়েকটি ঘটনায় তাৎক্ষণিক সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপে সমাধান হয়। এছাড়াও মুন্সীগঞ্জসহ কয়েকটি স্থানে ককটেল ও কেন্দ্রে অবৈধভাবে প্রবেশ করে বিশৃঙ্খলা তৈরির চেষ্টা করার সময় সেনাবাহিনী তাত্ক্ষণিক গ্রেপ্তার করে। ফলে বড় ধরনের কোনো বিশৃঙ্খলা হয়নি। এবারের নির্বাচনী মাঠে শান্তিশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ভোটকেন্দ্রগুলোতে গড়ে তোলা হয়েছিল কয়েক স্তরের নিরাপত্তা বলয়। পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় টহল ও তল্লাশি চৌকি বসিয়েও দায়িত্ব পালন করছেন যৌথ বাহিনীর সদস্যরা। সার্বিক এই নিরাপত্তাব্যবস্থায় মোতায়েন করা হয় সশস্ত্র বাহিনী ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রায় ১০ লাখ সদস্য। পাশাপাশি এই সময়ে ভ্রাম্যমাণ আদালতসহ মাঠে বিশেষ দায়িত্ব পালন করছেন ১ হাজার ৫১ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট। তথ্যমতে, ভোটের মাঠে নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় বিশেষ দায়িত্ব পালন করছেন বিভিন্ন বাহিনী ও সংস্থার মোট প্রায় ১০ লাখ সদস্য।